ইরানের বার্তায় উত্তপ্ত মধ্যপ্রাচ্য
উপসাগরীয় দেশগুলোতেও স্থল অভিযানের হুঁশিয়ারি ইরানের
- নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বে কোনো আপস নয়, সাফ জানালেন কাতারের আমির

হরমুজ প্রণালিতে আক্রান্ত বাণিজ্যিক জাহাজ। সৌদির বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী ক্ষেপণাস্ত্র হামলা। তার মধ্যেই এবার প্রতিবেশী দেশের সীমান্ত পেরিয়ে সেনা পাঠানোর ইঙ্গিত ইরানের। শর্ত একটাই। যুক্তরাষ্ট্র আবার হামলা চালালে যুদ্ধ আর ইরানের ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ থাকবে না। তেহরানের এমন বার্তার মধ্যে উপসাগরীয় দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কঠোর অবস্থান জানাল কাতার।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রকাশ্য ও গোপন আলোচনায় নতুন মার্কিন হামলার জবাবে সংঘাত ছড়িয়ে দেওয়ার সতর্কবার্তা দিয়েছেন ইরানি কর্মকর্তারা। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, কেউ কেউ প্রতিবেশী দেশে স্থল অভিযানের সম্ভাবনার ইঙ্গিতও দিয়েছেন। তবে কোন দেশ লক্ষ্যবস্তু হতে পারে, তা নির্দিষ্ট করা হয়নি। ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে স্থল অভিযান শুরুর ঘোষণাও দেয়নি।
তেহরানের সতর্কবার্তায় রয়েছে সৌদি আরবের তেলস্থাপনা, সংযুক্ত আরব আমিরাতের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এবং মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের ওপর আঘাতের আশঙ্কা। মধ্যস্থতাকারীদের কাছে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনার কথাও তুলেছেন ইরানি কর্মকর্তারা বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
রবিবার (১১ অক্টোবর) ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মহসেন রেজাই সংযুক্ত আরব আমিরাতের পাশাপাশি আঞ্চলিক তথ্যকেন্দ্র ও ইন্টারনেট সংযোগব্যবস্থায় হামলার হুঁশিয়ারি দেন। তবে এসবই নতুন যুদ্ধ শুরু হলে সম্ভাব্য পাল্টা পদক্ষেপের সতর্কতা, বাস্তবে শুরু হওয়া কোনো স্থল অভিযানের খবর নয়।
এই উত্তেজনার মধ্যেই মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) দ্য নিউ আরব জানিয়েছে, দোহায় শুরা কাউন্সিলের অধিবেশন উদ্বোধন করে কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি বলেছেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব ও স্থিতিশীলতার প্রশ্নে আপসের সুযোগ নেই। হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদ নৌচলাচল নিশ্চিত করতে সমন্বিত উদ্যোগ চান তিনি। বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন জ্বালানি, পানি ও বেসামরিক স্থাপনার সুরক্ষায়।
ইরানের আগের হামলায় কাতারের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘিত হয়েছে উল্লেখ করে আমির বলেছেন, ‘সংলাপ ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের প্রতি অঙ্গীকার মানে নিজেদের প্রতিরক্ষায় ছাড় দেওয়া নয়।’ তাঁর কথায়, ‘সার্বভৌমত্ব রক্ষার অধিকার যুদ্ধের বিস্তার ঠেকানোর সংকল্পের বিরোধী নয়।’ উত্তেজনা কমাতে আলোচনার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
হরমুজে অচলাবস্থা ও রাস লাফানের জ্বালানি স্থাপনায় ক্ষয়ক্ষতির কারণে কাতারের রপ্তানি ব্যাহত হয়েছে বলেও জানিয়েছেন কাতারের আমির। তিনি বলেছেন, আঞ্চলিক অস্থিরতার প্রভাব সীমান্তে আটকে থাকে না। উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো প্রয়োজন। কঠিন পরিস্থিতির জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠান ও নাগরিকদের প্রস্তুত থাকারও আহ্বান জানান তিনি।
সংঘাত বন্ধে যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করা ও নৌপথ খুলতে কাতারের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার কথাও তুলে ধরেছেন তিনি। বলেছেন, আঞ্চলিক শান্তির জন্য আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে।
অন্যদিকে যুদ্ধের প্রস্তুতি বাড়াচ্ছে ওয়াশিংটন। তৃতীয় বিমানবাহী রণতরির বহর ও আরও নৌসেনা মধ্যপ্রাচ্যের দিকে যাচ্ছে। অতিরিক্ত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মোতায়েনের কথাও ভাবছে পেন্টাগন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে হামলার পরিকল্পনা নেই। তবে পরমাণু স্থাপনায় সম্ভাব্য আঘাত নিয়ে আলোচনা করেছেন তিনি।
এদিকে, গত ৪ অক্টোবর ব্রিটেনের ফেয়ারফোর্ড বিমানঘাঁটি থেকে প্রায় এক ডজন মার্কিন বোমারু বিমান সরিয়েছে পেন্টাগন। কারণ, ইরানের বিপ্লবী গার্ডের সম্ভাব্য ড্রোন হামলা নিয়ে উদ্বেগ। সেপ্টেম্বরে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র মার্কিন যুদ্ধজাহাজের কাছাকাছি পৌঁছেছিল বলেও দাবি করা হয়েছে। সংঘাতের আশঙ্কা কেবল কথার লড়াইয়ে সীমিত নেই।
ইরানও বসে নেই। নাতাঞ্জ ও পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন পরমাণুকেন্দ্রের চারপাশে মাটির প্রতিরক্ষা বাঁধ তৈরি হয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎপাদন সক্ষমতা পুনর্গঠনের পাশাপাশি বেসামরিক মানুষকে সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। কর্মকর্তাদের দাবি, বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর ও বিদ্যুৎকেন্দ্র যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির প্রস্তুতি নিয়েছে।
সাম্প্রতিক হামলায় হরমুজের কাছে একাধিক জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ওমানের কাছে একটি আমিরাতি তেলবাহী জাহাজে আগুন ধরে দুই ভারতীয় নাবিক নিখোঁজ হয়েছেন। রিয়াদের বিমানবন্দরে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত হওয়ার খবরও এসেছে।
একদিকে সীমান্ত পেরোনোর হুঁশিয়ারি। অন্যদিকে সার্বভৌমত্বে ছাড় না দেওয়ার ঘোষণা। এর মাঝখানে হরমুজের নৌপথ, তেলের বাজার এবং লাখো মানুষের নিরাপত্তা। নতুন যুদ্ধ শুরু হবে কি না, তা এখনও অনিশ্চিত। তবে উপসাগরজুড়ে নতুন সংঘাতের আশঙ্কা ক্রমেই বাড়ছে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বারবার সেই বার্তাই দিচ্ছে।



