ট্রাম্পের একগুঁয়েমি সিদ্ধান্তে মধ্যপ্রাচ্যে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের হাতছানি

ডোনাল্ড ট্রাম্প- রয়টার্স
‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ স্বাক্ষরের পর যখন মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তির স্বপ্ন দেখছিল গোটা বিশ্ব, ঠিক তখনই ট্রাম্প প্রশাসনের একগুঁয়েমি সিদ্ধান্তে সে আশা রূপ নিয়েছে চরম হতাশায়। চুক্তি ভেঙে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর সাম্প্রতিক সময়ের একতরফা হামলা এবং তেহরানের পাল্টা জবাবে এক বিপজ্জনক খাদের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে পারস্য উপসাগর।
গত ২৪ ঘণ্টার রক্তক্ষয়ী সংঘাতের চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, ট্রাম্পের ভুল হিসাব-নিকাশের খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ সামরিক ও বেসামরিক মানুষকে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এরই মধ্যে ইরানের বন্দর ও উপকূলীয় এলাকায় অবরোধ জোরালো করতে ২০টির বেশি যুদ্ধজাহাজ এবং শতাধিক যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছে। এই সামরিক প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ভোররাতে সিস্তান ও বালুচিস্তান প্রদেশের বামপুরে ইরানের আর্মি গ্রাউন্ড ফোর্সের একটি ঘাঁটিতে আকস্মিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী। ঘুমন্ত অবস্থায় চালানো এ হামলায় ৩৮৮তম ইরান শহর ব্রিগেডের সাতজন সেনা নিহত হন। সামরিক ঘাঁটির পাশাপাশি খুজেস্তান প্রদেশের হোভেইজেহর একটি শস্য সাইলো এবং আহভাজ ও আবাদানের বেশ কিছু বেসামরিক অবকাঠামোয়ও যুক্তরাষ্ট্রের বিমান আঘাত হেনেছে, যেখানে আরও চারজন বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে।
তবে ইরানও এই আগ্রাসন মুখ বুজে সহ্য করেনি। ‘অপারেশন নাসর ২’ এবং ‘থান্ডারস্টর্ম’ অভিযানের আওতায় মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলোতে তীব্র পাল্টা আঘাত হেনেছে ইরানি সশস্ত্র বাহিনী। কুয়েতে যুক্তরাষ্ট্রের প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার পাশাপাশি মিনা আবদুল্লাহয় অবস্থিত প্রধান যুক্তরাষ্ট্রের লজিস্টিকস সেন্টার ‘কেজেএল’ সম্পূর্ণ ধ্বংস করার দাবি করেছে তেহরান। একই সময়ে জর্ডানের কৌশলগত আল-আজরাক বিমানঘাঁটিতে দ্বিতীয় দফায় হামলা চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এফ-১৫ ও এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের হ্যাঙ্গার এবং বেশ কয়েকটি নজরদারি ড্রোন ধ্বংস করেছে ইরানের অ্যারোস্পেস ফোর্স। বাহরাইনে মোতায়েন যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহরের কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টারও এই পাল্টা হামলার শিকার হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিতিশীলতার একক দায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের একমুখী ও জেদি নীতিমালার ওপর বর্তায়। চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই ওয়াশিংটন সমঝোতা স্মারকের শর্তগুলো লঙ্ঘন করতে শুরু করে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী পণ্যবাহী জাহাজ থেকে মার্কিন বাহিনীর ২০ শতাংশ ‘নিরাপত্তা ফি’ আদায়ের ঘোষণা মার্কিন কূটনীতিকে আন্তর্জাতিক মহলে চরম হাস্যকর ও একাকী করে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও যেখানে আগে স্বীকার করেছিলেন, আন্তর্জাতিক জলপথে কোনো দেশেরই টোল আদায়ের আইনি অধিকার নেই, সেখানে ট্রাম্পের এই একতরফা সিদ্ধান্তকে পারস্য উপসাগরীয় আরব দেশগুলোও সমর্থন করেনি। সম্ভাব্য যুদ্ধের পরিণতির আশঙ্কায় কোনো মিত্র দেশই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপে অংশ নিতে রাজি হয়নি। এমনকি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদেও ওয়াশিংটন এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন।
যুক্তরাষ্ট্রের এই আগ্রাসন ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে উল্টো প্রভাব ফেলেছে। আমেরিকা ভেবেছিল সামরিক হামলার মাধ্যমে তারা ইরানের নেতৃত্বকে দুর্বল করবে; কিন্তু তা ইরানের জনগণকে আরও বেশি ঐক্যবদ্ধ করেছে। তেহরানের রাস্তায় সাধারণ মানুষের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যেমন তীব্র ক্ষোভ দেখা যাচ্ছে, তেমনি দেশটির ধর্মীয় ও নীতিনির্ধারণী মহলেও সুর কঠোর হচ্ছে। ইরানের ধর্মতত্ত্ব শিক্ষাকেন্দ্রের প্রধান আয়াতুল্লাহ আরাফি বর্তমান সংকটকে চূড়ান্ত উল্লেখ করে বলেছেন, দেশের প্রেসিডেন্টসহ অন্য শীর্ষ কর্মকর্তা, কূটনৈতিক বিভাগ এবং সেনা কমান্ডারদের এখন থেকে ধরে নিতে হবে, সব রকম চুক্তি কিংবা সমঝোতাপত্র শেষ হয়ে গেছে। তার মতে, ইরানকে এখন থেকে শুধু ‘জিহাদ ও ধৈর্যের পথ’ অবলম্বন করতে হবে।
ধর্মীয় নেতৃত্বের এই যুদ্ধংদেহী অবস্থানের পাশাপাশি দেশটির সামরিক বাহিনীও পাল্টা আঘাতের জন্য প্রস্তুত। ইরানের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র জেনারেল আকরামি নিয়া এক বিবৃতিতে বলেছেন, শত্রুরা কুৎসিত পরিকল্পনা করে ইসলামি শাসনব্যবস্থাকে ধ্বংস করতে চেয়েছিল; কিন্তু চত্বরগুলোতে জনগণের দৃঢ় প্রতিরোধ সে চক্রান্ত নিষ্ক্রিয় করে দিয়েছে। তিনি স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দেন, রক্তের বদলা নিতে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী প্রতিজ্ঞাবদ্ধ এবং শক্তি দেখিয়ে হরমুজ প্রণালি কখনোই উন্মুক্ত করা যাবে না। কূটনৈতিক ফ্রন্টেও ইরানের কর্মকর্তারা ট্রাম্পের আগ্রাসী মনোভাবকে পাত্তাই দিচ্ছেন না। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ট্রাম্পের ২০ শতাংশ টোল আদায়ের সিদ্ধান্তকে উপহাস করে বলেছেন, ‘২০ শতাংশ ফি অনেক বেশি। আমরা বরং ন্যায্য ফি রাখব।’
ইরান ও আমেরিকার এই সামরিক সংঘাত এখন বিশ্ব অর্থনীতিকে এক অন্ধকার পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস পরিবাহিত হয়। এই প্রণালি অবরুদ্ধকরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম এর মধ্যেই ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ব জুড়ে মূল্যস্ফীতি চরম আকার ধারণ করবে এবং তেল আমদানিনির্ভর উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতি বড় ধরনের মন্দার মুখে পড়বে।
সংকটের এই চরম মুহূর্তে পরিস্থিতি আরও নাজুক করে তুলেছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সর্বশেষ হুমকি। গতকাল বুধবার ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএতে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে আইআরজিসি স্পষ্ট ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, ‘আঞ্চলিক জ্বালানি রপ্তানির সুবিধা হয় সবাই পাবে, না হয় কেউই পাবে না।’ যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে ইরানের বন্দরের ওপর অবরোধ আরোপ এবং ইরানের পাল্টা হরমুজ প্রণালি বন্ধের প্রেক্ষাপটে আইআরজিসি সাফ জানিয়ে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সুবিধা দেয়— এমন সব জ্বালানি রপ্তানির করিডরও তারা বন্ধ করে দেবে।
ইরান যদি সত্যিই তাদের এই হুমকি বাস্তবায়ন করতে তার ইয়েমেনি মিত্র হুতিদের ব্যবহার করে লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার বাব-আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ করে দেয়, তবে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ২০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে। এটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে পুরোপুরি ধসিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
প্রভাবশালী সাময়িকী ‘ইকোনমিস্ট’-এর এক সাম্প্রতিক সময়ের প্রতিবেদনেও ট্রাম্পের এ কৌশলগত ব্যর্থতা স্পষ্ট করে তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের টানা সামরিক হামলা সত্ত্বেও ইরানের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা অক্ষুণ্ন রয়েছে এবং তারা হরমুজের ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। ট্রাম্পের হাতে সামরিক চাপ বা অর্থনৈতিক প্রলোভন— কোনোটিই এখন ইরানকে চুক্তি মানাতে বাধ্য করার মতো কার্যকর সমাধান দিতে পারছে না।
পরিশেষে বলা যায়, ইরান ও আমেরিকার মধ্যকার সংঘাতটি এখন আর সীমিত কোনো সীমান্তে আটকে নেই। ট্রাম্পের উগ্র ও একমুখী ভুল নীতির কারণে সমঝোতা ভেঙে যাওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের পারদ সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছেছে। ইরান যেখানে তার জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণকে দরকষাকষির মূল হাতিয়ার বানিয়েছে, সেখানে ট্রাম্প প্রশাসন সামরিক শক্তি ব্যবহার করে ওয়াশিংটনের ক্ষয়ে যাওয়া কর্তৃত্ব পুনরুদ্ধার করতে চাইছে। এই অবাস্তব জেদ যদি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বজায় রাখা হয় এবং ইরানের বিদ্যুৎ গ্রিড বা জ্বালানি খাতে নতুন কোনো হামলা চালানো হয়, তবে তা এই দুই দেশকে ছাড়িয়ে একটি ধ্বংসাত্মক বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মহামন্দা এবং তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে বিশ্বকে ধাবিত করবে। ট্রাম্পের কূটনৈতিক ভুলের এই খেসারত আজ বিশ্ববাসীকে এক চরম ট্র্যাজেডির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।




