যেভাবে দানব ফ্রান্সকে বামন বানাল স্পেন

সংগৃহীত ছবি
ফ্রান্সের খেলায় একটা সুবাস থাকে। পারফিউমের মতই হৃদয়কাড়ে সেটা। সেই সুবাস বোতল থেকেই বের হতে দিল না স্পেন। দানব হয়ে ওঠা ফ্রান্সকে বামনই বানিয়ে দিল তারা। মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এমবাপ্পে, ওলিসে বা দেম্বেলেদের বোতলবন্দী করল তারা। তাতে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ট্রফি জয়ের সেই সোনালি স্বপ্ন এখন আরও একটু কাছে স্পেনের।
ম্যাচের প্রথম থেকে শেষ মিনিট পর্যন্ত স্প্যানিশরা তাদের নিজেদের খেলার ধরন বজায় রেখেছিল। ফরাসিদের গতিময় ও সহজাত ফুটবলকে রুখে দেওয়ার ‘প্রতিষেধক’ হিসেবে লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করে এবং দারুণ পজিশনাল ফুটবল খেলে। তারা শান্ত মাথায় বল দখলে রেখে প্রতিপক্ষের চাপ সামাল দেয় এবং বল ছাড়াও দেম্বেলে, ওলিসে এবং এমবাপ্পের আক্রমণগুলোকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়।
গোলরক্ষক উনাই সিমন বরাবর ফ্রান্স তাদের প্রথম অন-টার্গেট শটটি নিতে পেরেছিল কেবল দ্বিতীয় অর্ধেকের ইনজুরি টাইমে (যোগ করা সময়ে)। এটিই মূলত এই স্পেনের আসল রূপ, যারা লামিন ইয়ামালের করা ভবিষ্যদ্বাণী মিলিয়ে দিয়ে ২০২৪ ইউরো এবং ২০২৫ নেশনস লিগের মতো টানা তৃতীয় টুর্নামেন্টের সেমিফাইনালে ফরাসিদের বিদায় করার কীর্তি দেখাল।
ম্যাচের কয়েক ঘণ্টা আগে স্পেনের একাদশে পেদ্রির থাকা না থাকা নিয়ে স্পেনের একটি দৈনিক লিখেছিল,‘ পেদ্রি, এক রাষ্ট্রীয় ইস্যু।’ আসলেই কি তাই? অতীতের রাউল গঞ্জালেসকে দলে রাখা বা না রাখার মতো বিতর্ককে ছাপিয়ে না গেলেও, পেদ্রির মত মাঝমাঠের কারিগরের শুরুর একাদশে থাকা না থাকা নিয়ে বেশ গরম আলোচনাই চলছিল। কোচ দে লা ফুয়েন্তে শেষ পর্যন্ত পেদ্রিকে বেঞ্চে রেখে ফাবিয়ানকে শুরুর একাদশে নামান।
এটি ছিল এমন এক সিদ্ধান্ত যা ম্যাচের ফলাফলের ওপর নির্ভর করছিল। স্পেন জিতলে এটি চিরদিনের জন্য আড়ালে চলে যাবে, কিন্তু স্পেন হারলে...পুরো দায়টাই হত কোচের।
ফ্রান্স অবশ্য মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচের মতো শুরু থেকেই হাই-প্রেস করে খেলছিল না, বরং তারা স্পেনের আক্রমণ সামলানোর অপেক্ষায় ছিল। মাঠের প্রতিটি পাসে পারস্পরিক সমীহ ছিল স্পষ্ট। আর এই দ্বৈরথের মাঝেই ম্যাচের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে, ডি-বক্সের ঠিক বাইরে ওলমোকে ফাউল করে বসেন রাবিও। মিলানের এই মিডফিল্ডারকে কড়া ট্যাকলের জন্য রেফারি হলুদ কার্ড দেখান।
এরপর পর্তুগালের বিপক্ষে লুকা মদ্রিচের করা ভুলের মতোই এক শিশুতোষ ভুল করে বসেন দিনিয়ে, যা স্পেনকে পেনাল্টি এনে দেয়। অ্যাস্টন ভিলার এই ডিফেন্ডার মূলত লামিন ইয়ামালের চতুরতায় বোকা বনে যান। একটি বলের নিয়ন্ত্রণ নিতে গিয়ে ইয়ামাল সেকেন্ডের দশ ভাগের এক ভাগ সময় আগে তার সামনে চলে আসেন। দিনিয়ে তা খেয়াল না করেই লাথি মেরে বসেন, যার জন্য ভিএআর দেখারও কোনো প্রয়োজন ছিল না।
ডালাসের মাঠের এই ফাউলটি মতিঝিলের কোনো গ্যাস স্টেশনের কর্মীও খালি চোখে স্পষ্ট দেখতে পেতেন! পেনাল্টি থেকে ওয়ারবাসাল গোল করে দলকে এগিয়ে নেন।
এরপর থেকে স্পেন বেশ রক্ষণাত্মক ও হিসেবী ফুটবল খেলতে শুরু করে, কারণ তারা এমবাপ্পে এবং তার দলের গতি ও প্রতিভা সম্পর্কে ভালোভাবেই সচেতন ছিল। এমনকি ম্যাচের ৩৮ মিনিটে ব্যবধান ২-০ করার দারুণ সুযোগও পেয়েছিল তারা, যা মানসিকভাবে প্রতিপক্ষকে গুঁড়িয়ে দিতে পারত। আক্রমণটি ছিল পুরোপুরি স্প্যানিশ ঘরানার ‘তকিতাকা’ ফুটবলের প্রতিচ্ছবি: ইয়ামাল ও ওলমোর মধ্যে ওয়ান-টু পাসের পর ফাবিয়ানের দিকে বল বাড়িয়ে দেওয়া, যা উপামেকানো প্রতিহত না করলে নিশ্চিত গোল হতে পারত।
বিরতির পর স্প্যানিশ কোচ দে লা ফুয়েন্তে তাড়াহুড়ো না করে তিব্বতি ভিক্ষুদের মতো ধৈর্য ধরেন। তিনি বিশ্বাস রেখেছিলেন যে, সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে স্পেনের সেই শৈল্পিক ও নান্দনিক ফুটবল মাঠে ফুটে উঠবেই। আর ঠিক তা-ই হলো, যার সূত্রধর ছিলেন বার্সেলোনা তারকা ওলমো। পোরোর কাছ থেকে বল পেয়ে ওলমো ফাউলের শিকার হওয়ার আগেই আবার পোরোর দিকে বল বাড়িয়ে দেন। আর রাইট-ব্যাক পোরো বলটি রিসিভ করে ডিফেন্ডার হিসেবে নয়, বরং স্বয়ং মেসির মতো নিখুঁত ফিনিশিংয়ে বল জালে জড়িয়ে দেন।
এরপর স্পেন শুধু ব্যবধান ধরে রাখতেই ব্যস্ত ছিল না; বরং তারা ম্যাচটি পুরোপুরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে তৃতীয় গোলটি করতে মরিয়া হয়ে ওঠে। ৬১ মিনিটে ইয়ামালের এক অনবদ্য ড্রিবলিংয়ের পর মনে হয়েছিল ব্যবধান ৩-০ হতে চলেছে, কিন্তু মিলিমিটারের ব্যবধানে সেটি অফসাইড হয়। শেষ পর্যন্ত স্পেন ম্যাচটা জিতে ২-০তে।
ইতিহাসে নিজেদের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ফাইনালে ওঠার পথে ফরাসিদের টানা তৃতীয়বারের মতো কোনো টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় করে দেয় স্প্যানিশরা।
ফ্রান্সের দুর্বলতম জায়গাটি ছিল তাদের লেফট-ব্যাক পজিশনটি। ডিফেন্ডার দিনিয়ে সেই পেনাল্টির সময় যেমন অপ্রস্তুত ছিলেন, তেমনি পেদ্রো পোরোর গোলের সময়েও ছিলেন পুরোপুরি অসচেতন। আর সেই পেনাল্টি থেকেই ওয়ারসাবাল টুর্নামেন্টে নিজের পঞ্চম গোলটি করেন।
পোরোর করা দ্বিতীয় গোলটির ক্ষেত্রে খলনায়ক বনে যান উপামেকানো। পুরো বিশ্বকাপে চমৎকার খেলতে থাকা বায়ার্ন মিউনিখের এই ডিফেন্ডার দানি ওলমোকে মার্কিং করা ছেড়ে দিয়ে সবকিছু ভেস্তে দেন। ওলমো ফুটবলীয় বুদ্ধিমত্তা খাটিয়ে পাস বাড়িয়ে দেন পোরোর দিকে, যা থেকে গোলটি আসে।
ফ্রান্সকে শিরোপার প্রধান দাবিদার ভাবার পেছনে যুক্তি ছিল তাদের দলে এককভাবে ম্যাচ জেতানোর মতো অনেক খেলোয়াড় রয়েছেন; কিন্তু স্পেন ফাইনালে উঠেছে তাদের দুর্দান্ত দলীয় রসায়নের ওপর ভর করে। পেদ্রির জায়গায় খেলতে নামা ফাবিয়ান রুইস মধ্যমাঠ নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন। কুকুরেয়া ফ্রান্সের পছন্দের আক্রমণভাগকে বোতলবন্দী করে রাখেন।
এই স্প্যানিশ দলটির মূল কারিগর রুইসের সঙ্গে মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণ করা রদ্রি কিংবা পেনাল্টি আদায় করা ইয়ামাল নন; তাদের মূল নায়ক আসলে কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে। তিনিই ‘বিশ্বের সেরা দলটিকে’ স্পেনের সামনে নিয়মিত হার মানতে বাধ্য করা এক দলে পরিণত করেছেন।




