সিলিকন চিপে অমরত্বের সন্ধান

ডিজিটাল অমরত্বের কনসেপ্টে আমাজন ওয়েবে ‘আপলোড’ নামে একটি সিরিজ দর্শকের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করে
আবে হায়াত পান করে মানুষের অমর হওয়ার বাসনা আর নেই। বিজ্ঞানীরা ডিজিটাল ব্রহ্মাণ্ডে সন্ধান করছেন অন্য কিছু। লিখেছেন ইমরানুর রহমান
‘মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে’— কবির এই আকাঙ্ক্ষা সর্বমানবেরও। প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ অমরত্বের সন্ধান করেছে আর জীবন-সুধার জ্ঞান পেতে জীবনপাত করেছেন আলকেমিস্টরা। তবে বিজ্ঞানীরা এখন অমৃতের খোঁজ করছেন কম্পিউটারের সিলিকন চিপে। একে বলা হচ্ছে ‘ডিজিটাল অমরত্ব’ (ডিজিটাল ইম্মর্টালিটি)। যদি মানুষের পুরো মস্তিষ্ক, তার স্মৃতি, আবেগ এবং ব্যক্তিত্বকে একটি কম্পিউটারে হুবহু কপি বা আপলোড করে দেওয়া যায়, তবে শরীর ধ্বংস হয়ে গেলেও মানুষটি বেঁচে থাকবে ডিজিটাল ব্রহ্মাণ্ডে। কল্পবিজ্ঞানের এ রোমাঞ্চকর ধারণাটি আজ আর শুধু সিনেমার পর্দায় সীমাবদ্ধ নেই, বিজ্ঞানের গবেষণাগারে এটি নিয়ে শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
মস্তিষ্ক আপলোড করার এ বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়াটিকে বলা হয় ‘হোল ব্রেন ইমুলেশন’ বা ‘মাইন্ড আপলোডিং’। এর মূল ভিত্তি হলো নিউরোসায়েন্স এবং কম্পিউটার বিজ্ঞানের এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন। মানুষের মস্তিষ্ক মূলত একটি জৈবিক কম্পিউটার। এতে রয়েছে প্রায় ৮ হাজার ৬০০ কোটি নিউরন। এই নিউরনগুলো একে অপরের সঙ্গে ট্রিলিয়ন সংখ্যক সংযোগ বা ‘সিন্যাপস’-এর মাধ্যমে যুক্ত। এ বিশাল এবং জটিল নেটওয়ার্কটিকে বলা হয় ‘কানেকটোম’। বিজ্ঞানের ভাষায়, আপনার ব্যক্তিত্ব, শৈশবের স্মৃতি, আপনার প্রিয় মানুষের মুখ— সবকিছুই আসলে এ কানেকটোমের ভেতরে বৈদ্যুতিক ও রাসায়নিক সংকেত হিসেবে সংরক্ষিত আছে।
মানুষের একটিমাত্র মস্তিষ্কের পুরো ডেটা সংরক্ষণ করতে প্রায় ১ জেনাবাইট স্টোরেজের প্রয়োজন হতে পারে
ডিজিটাল অমরত্ব অর্জনের প্রথম ধাপ এই কানেকটোমের একটি নিখুঁত ত্রিমাত্রিক মানচিত্র বা ম্যাপ তৈরি করা। বিজ্ঞানীরা অত্যন্ত শক্তিশালী ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ ব্যবহার করে মানুষের মস্তিষ্কের প্রতিটি নিউরন এবং সিন্যাপসের গঠন স্ক্যান করার প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন। দ্বিতীয় ধাপটি হলো, সেই সংগৃহীত তথ্যকে কম্পিউটারের কোডে (জিরো ও ওয়ান) রূপান্তর করা। যদি কোনো কৃত্রিম নিউরাল নেটওয়ার্ক মানুষের এই জৈবিক নিউরাল নেটওয়ার্ককে হুবহু অনুকরণ বা ইমুলেট করতে পারে, তবেই তাত্ত্বিকভাবে একটি মানব মস্তিষ্ক ডিজিটাল মাধ্যমে পুনর্জন্ম লাভ করবে।
বাস্তব পৃথিবীতে এ প্রযুক্তি কতদূর এগিয়েছে? বিজ্ঞানীরা এরই মধ্যে ‘সি. এলিগানস’ নামক এক ধরনের ক্ষুদ্র কৃমির কানেকটোম সম্পূর্ণভাবে ম্যাপ করতে পেরেছেন। এ কৃমির মাত্র ৩০২টি নিউরন রয়েছে। বিজ্ঞানীরা সেই নিউরনের ডিজিটাল ম্যাপটি একটি রোবটের সফটওয়্যারে আপলোড করেছিলেন। অবাক করার মতো বিষয় হলো, কোনো অতিরিক্ত প্রোগ্রামিং ছাড়াই রোবটটি একটি আসল কৃমির মতো আচরণ করতে শুরু করে— খাবারের খোঁজ করা এবং বাধা পেলে পিছিয়ে আসা। মানুষের ক্ষেত্রে এ চেষ্টা আরও বড় পরিসরে চলছে। ‘হিউম্যান ব্রেন প্রজেক্ট’ এবং নিউরালিংকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের মস্তিষ্কের সঙ্গে কম্পিউটারের সরাসরি সংযোগ বা ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেস (বিসিআই) তৈরিতে কাজ করছে, যা মাইন্ড আপলোডিংয়ের প্রাথমিক ভিত্তি।
তবে একটি কৃমির ৩০২টি নিউরনের ম্যাপ তৈরি করা আর মানুষের ৮৬ বিলিয়ন নিউরনের জটিলতা সমাধান করার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত রয়েছে। মানুষের মস্তিষ্ককে ডিজিটাল মাধ্যমে রূপান্তর করার ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীদের সামনে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
প্রথমত, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা। মানুষের একটিমাত্র মস্তিষ্কের পুরো ডেটা সংরক্ষণ করতে প্রায় ১ জেনাবাইট স্টোরেজের প্রয়োজন হতে পারে, যা বর্তমান বিশ্বের মোট ইন্টারনেট ডেটার একটি বড় অংশের সমান। এত বিপুল পরিমাণ ডেটা প্রসেস এবং রান করার মতো সুপারকম্পিউটার বা কোয়ান্টাম কম্পিউটার এখনো তৈরি হয়নি।
দ্বিতীয়ত, চেতনা বা কনশাসনেসের রহস্য। নিউরনের অবস্থান ম্যাপ করা গেলেও, মানুষের ‘চেতনা’ বা ‘আমি’ সত্তাটি কীভাবে তৈরি হয়, তা বিজ্ঞান আজও পুরোপুরি উদ্ঘাটন করতে পারেনি। কম্পিউটারে স্মৃতি আপলোড করা হয়তো সম্ভব, কিন্তু সেই কম্পিউটারটি কি আসলেই মানুষের মতো অনুভব করবে, নাকি সে শুধু একটি অবচেতন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হিসেবে মানুষের স্মৃতির পুনরাবৃত্তি করবে?
তৃতীয় এবং সবচেয়ে বড় বিতর্কটি হলো দার্শনিক ও নৈতিক সংকট। ধরা যাক, আপনার মস্তিষ্কের একটি নিখুঁত ডিজিটাল কপি কম্পিউটারে তৈরি করা হলো। কিন্তু মূল আপনি তো তখনো আপনার জৈবিক শরীরে বেঁচে আছেন। তাহলে আসল ‘আপনি’ কে? কম্পিউটারের সেই সত্তাটি কি আপনার অমর রূপ, নাকি সেটি শুধু আপনার একটি ডিজিটাল যমজ? আবার যদি জৈবিক শরীর মৃত্যুর পর শুধু ডিজিটাল রূপটি বেঁচে থাকে, তবে তার আইনি অধিকার কী হবে? সে কি সম্পত্তির মালিক হতে পারবে? ডিজিটাল দুনিয়ায় তার কি কোনো মানবিক অধিকার থাকবে?
এসব প্রশ্ন ও চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও, ডিজিটাল অমরত্বের সম্ভাবনাকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। প্রযুক্তি যেভাবে জ্যামিতিক হারে অগ্রসর হচ্ছে, তাতে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, দুই-চার দশকের মধ্যে মানবজাতি মাইন্ড আপলোডিংয়ের প্রথম সফল পরীক্ষাটি দেখতে পারে।
ডিজিটাল অমরত্বের মাধ্যমে মানুষ শারীরিক সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে মহাকাশের দূর-দূরান্তে আলোর গতিতে ডেটা হিসেবে ভ্রমণ করতে পারবে, যেখানে মহাজাগতিক বিকিরণ বা অক্সিজেনের অভাব বাধা হবে না। পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী, দার্শনিক বা শিল্পীদের জ্ঞান ও মেধা চিরকালের জন্য সংরক্ষিত থাকবে মানবকল্যাণে। প্রকৃতির তৈরি মৃত্যুর নিয়মকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মানুষ যেদিন নিজের মনকে ক্লাউডে আপলোড করতে পারবে, সেদিন থেকে মানবসভ্যতার এক নতুন অধ্যায় শুরু হবে। জৈবিক বিবর্তনের চ্যাপ্টার শেষ করে মানুষ তখন প্রবেশ করবে সম্পূর্ণ ডিজিটাল বিবর্তনের যুগে।




