ইরান-যুক্তরাষ্ট্র পাল্টাপাল্টি হামলা : পঞ্চম দিনে বারুদের স্তূপে মধ্যপ্রাচ্য

মার্কিন হামলায় ধসে যাওয়া একটি হাসপাতালের পাশে একজন ইরানি নারী। ছবি : সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত (৭ এপ্রিল) একতরফা যুদ্ধবিরতির পর থেকেই একের পর এক নিয়ম লঙ্ঘন করে আসছে ওয়াশিংটন । গত কয়েকদিনের ধারাবাহিক হামলা-পাল্টা হামলার মধ্য দিয়ে সেই যুদ্ধবিরতি এখন পুরোপুরি ভেস্তে গেছে এবং পারস্য উপসাগরে আবারও সরাসরি মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান।
গতকাল গভীর রাতে ইরানের মূল ভূখণ্ড ও কৌশলগত দ্বীপগুলো লক্ষ্য করে তীব্র বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। ওয়াশিংটনের দাবি, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালানোর ইরানি সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দিতেই টানা পঞ্চম দিনের মতো এই জোরদার অভিযান চালানো হয়েছে।
তবে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীও বসে নেই; মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ও আত্মঘাতী ড্রোন দিয়ে নজিরবিহীন পাল্টা আঘাত হেনেছে তারা। দুই পরাশক্তির এই মরণপণ লড়াইয়ে গোটা মধ্যপ্রাচ্য এখন এক অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়েছে।
বুধবার রাতের এই মার্কিন হামলার ভয়াবহতা ছিল ব্যাপক। ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দর আব্বাস, চাবাহার, সিরিক, কেশম এবং দক্ষিণ-পশ্চিমের আহওয়াজ শহরে দফায় দফায় যুদ্ধবিমান থেকে বোমাবর্ষণ করা হয়। হামলার তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, বৃহস্পতিবার ভোরে রাজধানী তেহরানের আকাশেও বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং বিকট বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে চারপাশ।
ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক মার্কিন হামলায় এ পর্যন্ত ২৬০ জনেরও বেশি সাধারণ নাগরিক আহত হয়েছেন। সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে আহওয়াজে, যেখানে শিশুদের ক্যানসার চিকিৎসায় নিয়োজিত ‘বাকায়ি হাসপাতাল’-এর ঠিক পাশেই মার্কিন বোমা আঘাত হানে। বিস্ফোরণের প্রচণ্ড শব্দে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে চিকিৎসাধীন শিশুরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হাসপাতালটি সাময়িকভাবে বন্ধ করে রোগীদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে বাধ্য হন কর্তৃপক্ষ।
মার্কিন সেন্টকম এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, তাদের যুদ্ধবিমানগুলো ইরানের কমান্ড সেন্টার, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি এবং উপকূলীয় নজরদারি কেন্দ্রগুলো সফলভাবে ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে। এর আগে কৌশলগত দ্বীপ ‘গ্রেটার তুনব’-এ বড় ধরনের আঘাত হানে মার্কিন বাহিনী।
মার্কিন এই সর্বাত্মক আগ্রাসনের জবাবে পাল্টা প্রত্যাঘাত শুরু করেছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এবং নিয়মিত সেনাবাহিনী। সম্মিলিত এই পাল্টা অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছে ‘অপারেশন নাসর (বিজয়)-২’ এবং ‘অপারেশন সায়েকাহ (বজ্রপাত)’।
ইরানের ছোড়া ঝাঁকে ঝাঁকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র কুয়েতের ‘আলী আল-সালেম’ বিমানঘাঁটিতে আঘাত হেনেছে, যার ফলে সেখানে থাকা মার্কিন বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ‘সি-র্যাম’ রাডার ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে।
একই সঙ্গে জর্ডানের কৌশলগত ‘আল-আজরাক’ বিমানঘাঁটিতে মার্কিন যোগাযোগ ব্যবস্থা ও জ্বালানি ডিপো লক্ষ্য করে সফল ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরানি বাহিনী, যদিও জর্ডান দাবি করেছে তারা বেশ কয়েকটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে। এর পাশাপাশি ইরানের আকাশসীমায় অনুপ্রবেশের সময় বন্দর আব্বাসের আকাশে আমেরিকার একটি ‘লুকাস’ ড্রোন এবং আন্দিমেশক শহরের আকাশে অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে একটি মার্কিন ‘এমকিউ-৯’ ড্রোন সফলভাবে ভূপাতিত করার দাবি করেছে আইআরজিসি।
যুদ্ধক্ষেত্রের এই উত্তাপ সরাসরি গিয়ে লেগেছে কূটনৈতিক টেবিলে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ওয়াশিংটনের সাথে আলোচনার সমস্ত সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে স্পষ্ট জানিয়েছেন, সার্বভৌমত্বে আঘাতের প্রতিটি ঘটনার দাঁতভাঙা জবাব মাঠেই দেওয়া হবে।
একই সুরে আইআরজিসি-র মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন মোহেব্বি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, কুয়েত ও জর্ডানের মার্কিন ঘাঁটিতে এই আঘাত কেবল প্রথম ধাপ, যেখানে মার্কিন আক্রমণাত্মক অবকাঠামো ধ্বংস করা হচ্ছে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে শিগগিরই এর চেয়েও ভয়াবহ পরবর্তী ধাপের অভিযান শুরু করবে তেহরান। দুই পক্ষের এমন অনমনীয় অবস্থানের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।




