এতিমখানার ৪৬ টন চাল বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ

সরকারি বরাদ্দ পায়নি সাড়ে পাঁচানী হোসাইনীয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানা। ছবি: আগামীর সময়
চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলায় এতিমখানার জন্য সরকারি বরাদ্দের ৪৬ টন চাল বিতরণে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, ৪৬টি এতিমখানার জন্য বরাদ্দ দেওয়া চালের মধ্যে ২৫ টনেরও বেশি পৌঁছায়নি প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে। এক টনের পরিবর্তে মাত্র ৫০০ থেকে ৬০০ কেজি চাল পেয়েছে বলে দাবি করেছে বহু প্রতিষ্ঠান। কোথাও কোথাও চালের পরিবর্তে নগদ অর্থ দেওয়া হয়েছে, যা সরকারি নীতিমালার পরিপন্থী।
সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এতিমখানা পরিদর্শনে একাধিক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলরা অভিযোগ করেন, সরকারি বরাদ্দ অনুযায়ী এক টন চাল পাওয়ার কথা থাকলেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কম চাল পেয়েছেন তারা।
কলাকান্দি ইউনিয়নের নেদায়ে ইসলাম আশিকে মানযুর (রা.) নুরানী হাফিজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানা কর্তৃপক্ষ জানায়, এক টন চালের বাজারমূল্য ৫০ হাজার টাকার বেশি হলেও তাদের চাল না দিয়ে দেওয়া হয়েছে মাত্র ১৫ হাজার টাকা। একই ধরনের অভিযোগ করেছেন বিনন্দপুর মদিনাতুল উলুম মাদ্রাসা ও এতিমখানা, সাতবাড়িয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানা এবং সুজাতপুর দরবেশ বাড়ি মাদ্রাসা ও এতিমখানার কর্তৃপক্ষ। তাদের দাবি, চালের পরিবর্তে দেওয়া হয়েছে ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকা।
এ ছাড়া জিন নুরাইন ইসলামিয়া মাদ্রাসা, পশ্চিম ইসলামাবাদ মাদ্রাসা, ষাটনল আরাবিয়াতুল উম্মাহ মহিলা মাদ্রাসা, ষাটনল হাফেজ আব্দুল লতিফ দাখিল মাদ্রাসা, দারুল উলুম কাসেমিয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসা, দশানী আল আমিন আকরামিয়া মাদ্রাসা, সাড়ে পাঁচানী হোসাইনীয়া মাদ্রাসা, মোহনপুর আল হেরা মহিলা মাদ্রাসা, মুদাফফর রহমানিয়া ইসলামিয়া মাদ্রাসা, মাথাভাঙ্গা মিলারচর মাদ্রাসা এবং পাঁচআনী আমিয়া আরাবিয়া কাসেমুল উলুম মাদ্রাসাসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের অভিযোগ, এক টনের পরিবর্তে মাত্র ৫০০ থেকে ৬০০ কেজি চাল পেয়েছেন তারা।
অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, উপজেলার কয়েকটি স্থানে শুধু ডিজিটাল সাইনবোর্ড টাঙিয়ে এতিমখানার অস্তিত্ব দেখানো হলেও সেখানে এতিম শিশুদের বসবাস বা শিক্ষা কার্যক্রমের কোনো বাস্তব চিহ্ন পাওয়া যায়নি। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানও এক টন করে সরকারি চালের বরাদ্দপ্রাপ্ত তালিকায় রয়েছে। এতে বরাদ্দ প্রক্রিয়া ও উপকারভোগী যাচাই নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এতিমদের জন্য বরাদ্দ চাল আত্মসাতের অভিযোগে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, সমাজসেবী ও বিভিন্ন মহলে দেখা দিয়েছে ক্ষোভ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয় ব্যক্তির দাবি, স্থানীয় সংসদ সদস্যের ঘনিষ্ঠ কোনো প্রতিনিধি বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মাধ্যমে এমন অনিয়ম হয়ে থাকতে পারে। তাদের অভিযোগ, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস, প্রকৌশল অফিসসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এসব বিষয়ে দ্রুত তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানান তারা।
সাড়ে পাঁচানী হোসাইনীয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানার সভাপতি এবং উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি নুরুল আমিন মাস্টার বলেন, ‘সরকারি বরাদ্দ অনুযায়ী এক টন চাল পাওয়ার কথা থাকলেও আমরা মাত্র ৬০০ কেজি চাল পেয়েছি। এতিমদের প্রাপ্য চাল আত্মসাৎ অত্যন্ত ন্যক্কারজনক। বিভিন্ন জায়গায় জানিয়েও কোনো প্রতিকার পাইনি।’
উপজেলা বিএনপির সভাপতি বশির আহমেদ খান বলেন, ‘এতিমদের চাল আত্মসাতের অভিযোগ অত্যন্ত দুঃখজনক। এ ধরনের ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। বিষয়টি ইউএনওর সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করব।’
অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা ওসমান গনি বলেন, খাদ্যগুদাম থেকে কখনো তিনি নিজে, আবার কখনো দপ্তরের কর্মীদের মাধ্যমে এতিমখানার প্রতিনিধিদের কাছে চাল বিতরণ করা হয়েছে। তবে চাল কম পাওয়ার বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ পাননি।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) এমদাদুল হক বলেন, তালিকাভুক্ত প্রতিটি এতিমখানার নামে এক টন করে চালের ডিও ইস্যু করা হয়েছে এবং এ-সংক্রান্ত সব কাগজপত্র তাদের কাছে রয়েছে। তার ভাষ্য, বরাদ্দ দেওয়ার পর বাইরে কেউ অনিয়ম করে থাকলে সে বিষয়ে তাদের জানা নেই।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদা কুলসুম মনি বলেন, ‘এতিমখানাগুলোকে চাল দেওয়ার কথা, টাকা দেওয়ার কোনো বিধান নেই। চাল কম দেওয়ারও সুযোগ নেই। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
স্থানীয়দের দাবি, এতিমদের জন্য সরকারি খাদ্য সহায়তার মতো মানবিক কর্মসূচিতে অনিয়মের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে নিতে হবে কঠোর ব্যবস্থা। পাশাপাশি প্রকৃত এতিমখানাগুলো যাতে তাদের প্রাপ্য সরকারি সহায়তা সম্পূর্ণভাবে পায়, সেটিও নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তারা।




