ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সৌদি আরবের অবস্থান কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

১৯৭৪ সালের পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় ইসলামিক শীর্ষ সম্মেলনে লাহোরের বাদশাহী মসজিদে ফিলিস্তিনের নেতা ইয়াসির আরাফাতস্ফ মুসলিম বিশ্বের নেতাদের সঙ্গে সৌদি আরবের বাদশাহ ফয়সাল। ফাইল ছবি / সংগৃহীত
ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার প্রায় আট দশক পরও স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নটি আরব-ইসরায়েল সংঘাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও অমীমাংসিত ইস্যু হয়ে রয়েছে। এ নিয়ে একাধিক যুদ্ধ হয়েছে, শান্তিচুক্তি হয়েছে এবং নানা কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই মৌলিক রাজনৈতিক প্রশ্নের সমাধান এখনো হয়নি।
বর্তমানে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং ইসরায়েলের সঙ্গে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার নেতৃত্ব দিচ্ছে সৌদি আরব। ২০২৪ সালে ‘গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর দ্য ইমপ্লিমেন্টেশন অব দ্য টু-স্টেট সল্যুশন’ গঠনের সহ-উদ্যোক্তা হওয়ার মাধ্যমে রিয়াদ এ অবস্থান স্পষ্ট করেছে। বর্তমানে ইতালির রোমে এ জোটের বৈঠক চলছে।
বাদশাহ সালমান ও যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান সৌদি আরবের পূর্ববর্তী শাসকদের নীতিরই ধারাবাহিকতা অনুসরণ করছেন। অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে দেশটি এ বিষয়ে একই অবস্থান ধরে রেখেছে। সৌদি আরবের কাছে প্রশ্ন কখনোই ছিল না যে, ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তি সম্ভব কি না; বরং এমন রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হয়েছে কি না, যাতে সেই শান্তি হবে সর্বজনগ্রাহ্য, বৈধ এবং স্থায়ী।
এই নীতির ভিত্তিতে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা—দুটি একই শান্তি চুক্তির সমান্তরাল অংশ। একটির আগে অন্যটি বাস্তবায়নের বিষয় নয়।
এই কৌশলগত নীতির সূচনা হয়েছিল বাদশাহ ফয়সালের আমলে। তিনি ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে সৌদি জাতীয় নিরাপত্তা নীতির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তী শাসকরা সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে কূটনৈতিক কৌশল বদলালেও মূল নীতিতে কোনো পরিবর্তন আনেননি।
১৯৮১ সালে বাদশাহ ফাহাদের নামে প্রস্তাবিত ‘ফাহাদ পরিকল্পনা’ ছিল এই নীতির প্রথম আনুষ্ঠানিক রূপ। এতে অধিকৃত আরব ভূখণ্ড থেকে ইসরায়েলের প্রত্যাহার এবং ফিলিস্তিনিদের জাতীয় অধিকার স্বীকৃতির আহ্বান জানানো হয়।
দুই দশক পর তৎকালীন যুবরাজ এবং পরে বাদশাহ আবদুল্লাহ ২০০২ সালের ‘আরব শান্তি উদ্যোগ’-এর মাধ্যমে একই কৌশলকে আরও বিস্তৃত করেন। এতে ১৯৬৭ সালে অধিকৃত ভূখণ্ড থেকে ইসরায়েলের সরে যাওয়া এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিনিময়ে আরব বিশ্বের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ শান্তি ও স্বাভাবিক সম্পর্কের প্রস্তাব দেওয়া হয়।
ফলে বর্তমান সৌদি নেতৃত্ব কোনো নতুন নীতি নির্ধারণ করছেন না; বরং দীর্ঘদিনের একটি প্রতিষ্ঠিত কৌশলগত নীতির উত্তরাধিকার বহন করছেন। তাদের মূল দায়িত্ব হলো, বর্তমান কূটনৈতিক বাস্তবতা সেই ঐতিহাসিক শর্ত পূরণের জন্য যথেষ্ট হয়েছে কি না, তা নির্ধারণ করা।
সৌদি আরবের জন্য ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের প্রতি সমর্থন শুধু পররাষ্ট্রনীতির বিষয় নয়। এটি দেশটির রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বৈধতার অন্যতম ভিত্তি। দুই পবিত্র মসজিদের খাদেম হিসেবে বাদশাহর ভূমিকা এবং আরব ও মুসলিম বিশ্বে সৌদি আরবের ঐতিহাসিক অবস্থান এই নীতিকে আরও দৃঢ় করেছে।
কেন সৌদি আরবকে ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি অসম্পূর্ণ
২০২০ সালের ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’-এর পর সৌদি আরবের এই ধারাবাহিক অবস্থানের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ওই চুক্তির মাধ্যমে ইসরায়েলের সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে। পরে মরক্কো ও সুদানও এতে যোগ দেয়। এর ফলে প্রমাণিত হয়, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় অগ্রগতি ছাড়াও আরব-ইসরায়েল সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে পারে। তবে এই চুক্তি ফিলিস্তিন প্রশ্নের সমাধান করতে পারেনি এবং বৃহত্তর শান্তি প্রক্রিয়াও সম্পূর্ণ করতে পারেনি।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একের পর এক প্রশাসন সৌদি আরবের অংশগ্রহণকে এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুপস্থিত উপাদান হিসেবে দেখেছে। রিয়াদকে ছাড়াও আব্রাহাম অ্যাকর্ডস বিস্তৃত হতে পারে, কিন্তু সৌদি আরবের অংশগ্রহণ ছাড়া এটি পূর্ণ কৌশলগত গুরুত্ব অর্জন করতে পারে না।
ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন আবারও সৌদি আরব-ইসরায়েল সম্পর্ক স্বাভাবিক করাকে মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক কূটনীতির কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। তবে ৭ অক্টোবরের পর সৃষ্ট নতুন বাস্তবতায় এই উদ্যোগকে মূল্যায়ন করতে হবে।
গাজা যুদ্ধ পুরো কূটনৈতিক পরিবেশ বদলে দিয়েছে। পরবর্তী যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ এবং ‘বোর্ড অব পিস’ গঠন সংঘাতের অবসান, গাজাকে স্থিতিশীল করা এবং পুনর্গঠনের একটি কাঠামো তৈরি করেছে। তবে এগুলোর উদ্দেশ্য রাজনৈতিক সমাধানের বিকল্প হওয়া নয়; বরং এমন পরিবেশ সৃষ্টি করা, যাতে রাজনৈতিক সমাধান সম্ভব হয়।
কিন্তু সৌদি আরবের কাছে মূল রাজনৈতিক শর্ত অপরিবর্তিত রয়েছে—স্বাধীন ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের বাস্তব এবং অপরিবর্তনীয় প্রতিষ্ঠা।
এই অবস্থানের ভিত্তি রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক—তিনটি ক্ষেত্রেই সমানভাবে দৃঢ়। সৌদি বাদশাহ শুধু রাষ্ট্রপ্রধান নন; তিনি দুই পবিত্র মসজিদের খাদেমও। ফলে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়ার মতো সিদ্ধান্তের জন্য রাজনৈতিক অনুমোদনের পাশাপাশি বিস্তৃত ধর্মীয় বৈধতাও প্রয়োজন। ভবিষ্যতে আলোচনার প্রতিশ্রুতির ওপর এমন বৈধতা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না; এর জন্য স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য।
সৌদি সিদ্ধান্ত বদলে দিতে পারে আরব ও মুসলিম বিশ্বের কূটনীতি
সৌদি আরবের অবস্থানকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে দেশটির অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় প্রভাব। আরব বিশ্বের মোট অর্থনৈতিক উৎপাদনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই সৌদি আরবের। মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র জি–২০ সদস্য দেশ হিসেবে এটি বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি শক্তি এবং অপরিশোধিত তেলের সবচেয়ে বড় রপ্তানিকারক। একই সঙ্গে অঞ্চলটির প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি হিসেবেও বিবেচিত হয়। ধর্মীয় মর্যাদার সঙ্গে এই অর্থনৈতিক প্রভাব যুক্ত হওয়ায় সৌদি আরবের যেকোনো সিদ্ধান্তের প্রভাব দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গণ্ডি ছাড়িয়ে পুরো আরব ও মুসলিম বিশ্বে পড়ে।
এ কারণে সৌদি আরব যদি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভিত্তিতে ইসরায়েলের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছায়, তাহলে তার প্রভাব শুধু দেশটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। লেবানন, সিরিয়া, ইরাক ও আলজেরিয়ার মতো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আরব দেশ এখনো ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়নি। এসব দেশের সিদ্ধান্ত স্বাধীন হলেও, ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভিত্তিতে সৌদি-ইসরায়েল সমঝোতা হলে তাদের রাজনৈতিক পরিবেশও উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে যেতে পারে।
লেবাননের উদাহরণ এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশটিকে ইসরায়েলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক স্থাপনে উৎসাহিত করছে যুক্তরাষ্ট্র, যাতে সীমান্ত পরিস্থিতি স্থিতিশীল করা যায়। তবে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকে ভিত্তি করে সৌদি সমর্থিত কোনো সমঝোতা হলে, এমন সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক মূল্য বর্তমান পরিস্থিতির তুলনায় অনেক ভিন্ন হবে।
একই বাস্তবতা মুসলিম বিশ্বের আরও অনেক দেশের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মতো প্রভাবশালী দেশগুলো ফিলিস্তিন প্রশ্নের সমাধান না হওয়ায় এখনো ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়নি। যদি দুই পবিত্র মসজিদের খাদেমের নেতৃত্বাধীন সৌদি আরব ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়, তাহলে এসব দেশের ওপরও নিজেদের অবস্থান পুনর্বিবেচনার চাপ তৈরি হতে পারে। এতে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়ার পথে বিদ্যমান প্রধান রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বাধাগুলো অনেকটাই দূর হবে।
এ কারণেই আব্রাহাম চুক্তির সঙ্গে সৌদি আরবের সম্ভাব্য অংশগ্রহণের মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। এটি শুধু আরেকটি আরব দেশের স্বীকৃতি নয়; বরং এমন একটি পদক্ষেপ, যা আরব ও মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় ভারসাম্যে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে বর্তমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত সেই পর্যায়ে পৌঁছাবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। এ ক্ষেত্রে ইসরায়েল, ফিলিস্তিন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আঞ্চলিক কয়েকটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে বাদশাহ সালমান ও যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ওপর।
লেখক: সিনিয়র ফেলো, কিংস কলেজ লন্ডন
আলজাজিরা থেকে অনূদিত, ভাষান্তর : মাহমুদুল হাসান রিফাত




