চুক্তি হলেও হরমুজে জাহাজ চলাচল শুরু হচ্ছে না যেসব কারণে

ফাইল ছবি
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে তেহরান স্থানীয় সময় মঙ্গলবার যুদ্ধ বন্ধের সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানের বন্দরে আর মার্কিন নৌ অবরোধ নেই এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হয়েছে।
চুক্তির প্রায় ৪৮ ঘণ্টা পার হলেও স্বাভাবিক হয়নি হরমুজে জাহাজ চলাচল। সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, মাত্র তিনটি তেলবাহী ট্যাংকার এ গুরুত্বপূর্ণ জলপথ ছেড়ে গেছে।
মঙ্গলবার মেরিনট্রাফিকের তথ্যে দেখা যায়, উপসাগরীয় অঞ্চলে ২৫০টির বেশি তেলবাহী ট্যাংকার ও ৩৩০টির বেশি পণ্যবাহী জাহাজ আটকা পড়ে আছে।
মেরিনট্রাফিকের তথ্যমতে, প্রায় ৭৫ শতাংশ ট্যাংকারই স্থির দাঁড়িয়ে আছে। কৃত্রিম উপগ্রহের ছবিতে দেখা যায়, এসব জাহাজের অনেকগুলোই সৌদি আরব, ইরাক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রধান প্রধান তেল রপ্তানি টার্মিনালের কাছে জড়ো হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংঘাত শুরুর আগের মতো জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার পথে বড় কিছু বাধা রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো নিরাপত্তা, মাইন ও টোল।
নিরাপত্তা ঝুঁকি
চুক্তি হলেও হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা সংকট এখনো দূর হয়নি। আরও ব্যাপকভাবে বললে, কেউই প্রথম জাহাজটি নিয়ে বের হওয়ার ঝুঁকি নিতে চাইছে না।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ইওএস রিস্ক গ্রুপের মার্টিন কেলি বিবিসিকে বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চালিয়ে নিতে অবশ্যই সুরক্ষার গ্যারান্টি দরকার।
ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে ইরান হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ করে। এর পর থেকে দেশটির অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ প্রণালিটি পার হওয়ার চেষ্টা করলেই তারা গুলি ছুড়েছে।
এদিকে গত ১৩ এপ্রিল ইরানের বন্দরগুলোয় নৌ অবরোধ আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। ওই অঞ্চলে দায়িত্বে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের তথ্যমতে, এর পর থেকে তারা নির্দেশ অমান্যকারী নয়টি জাহাজকে অচল করে দিয়েছে। এমনকি এর মধ্যে কয়েকটি জাহাজের ইঞ্জিন রুমে হেলফায়ার ক্ষেপণাস্ত্রও নিক্ষেপ করেছে।
যদিও চুক্তির ঘোষণার পর জাহাজের ক্যাপ্টেন, মালিক ও বিমা কর্তৃপক্ষ তাদের জাহাজকে আরব সাগরের দিকে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তারা উপসাগরীয় এলাকায় নিজেদের জাহাজের অবস্থান ঠিক করে নিচ্ছে।
মার্টিন কেলি মনে করেন, ‘পুরো চিত্রটা আসলে কেমন দাঁড়ায়, তা দেখতে আমাদের আরও দু-এক দিন, সম্ভবত শুক্রবার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।’
মাইনের হুমকি
ইরানের উপকূল এবং দ্বীপগুলোয় ‘বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক মাইন’ স্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়া ভাসমান মাইনও আছে।
ইরানের আধা সরকারি ফারস নিউজ এজেন্সির তথ্যমতে, এর পর থেকেই সাগরে সন্দেহজনক ‘ভাসমান’ বস্তুর বিষয়ে সতর্কতা জারি করে আসছে বহুজাতিক জয়েন্ট মেরিটাইম ইনফরমেশন সেন্টার এবং ওমানের মেরিটাইম সিকিউরিটি সেন্টার।
এ ছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও একটি সিনেট কমিটিকে জানিয়েছেন, ইরান ‘হরমুজ প্রণালির বিশাল অংশে মাইন পুঁতে রেখেছে’।
আন্তর্জাতিক সমুদ্র চলাচল সংস্থার (আইএমও) মহাসচিব আর্সেনিও ডোমিনগুয়েজ বলেছেন, জাহাজ চলাচল যুদ্ধের আগের অবস্থায় ফেরাতে হলে এসব মাইন অপসারণ করাই হবে প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রণালিটি মাইনমুক্ত করার কাজ বেশ ধীরগতির হবে। এতে ৩০ দিন থেকে শুরু করে ছয় মাস পর্যন্ত লাগতে পারে।
ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব ইনডিপেনডেন্ট ট্যাংকার ওনার্সের ফিলিপ বেলচার বলেছেন, ‘আমরা আসলে কিছুই জানি না। এই ধোঁয়াশা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়।’
টোল বা শুল্ক-সংক্রান্ত জটিলতা
যুদ্ধের আগে ঐতিহাসিকভাবেই এই জলপথ দিয়ে কোনো টোল বা ফি ছাড়া অবাধে জাহাজ চলাচল করত। কিন্তু যুদ্ধের কারণে তেহরান এটির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেয়।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প রোববার যখন ইরানের সঙ্গে চুক্তির ঘোষণা দেন সে সময় তিনি বলেন, প্রণালিটি ‘টোল ফ্রি’ বা বিনা মাশুলে খুলে দেওয়া হবে। তবে ইরানের বার্তা সংস্থা ফারসের প্রতিবেদন বলছে ভিন্ন কথা।
ইরানের ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন চুক্তি অনুযায়ী, শেষ পর্যন্ত ওমানের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রণালিটি ইরানই পরিচালনা করবে। জলপথটি পার হওয়ার জন্য জাহাজগুলোর ওপর সম্ভাব্য ‘সার্ভিস ফি’ও বসানো হতে পারে। তবে ঠিক কী ধরনের সেবার জন্য এই ফি নেওয়া হবে, তা স্পষ্ট নয়।
সমুদ্র আইনবিষয়ক জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী, দেশগুলো তাদের জলসীমায় জাহাজের নিরাপদ চলাচলের সুযোগ দিতে বাধ্য। তবে যুক্তরাষ্ট্র বা ইরান কেউই এই সনদে স্বাক্ষর করেনি। বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান হলো, হরমুজ প্রণালি দিয়ে অবাধে জাহাজ চলাচলের সুযোগটি প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইনেরই অংশ।
অবশ্য পানামা ও সুয়েজ খালের মতো মানুষের তৈরি কিছু জলপথে নির্দিষ্ট সেবার জন্য টোল বা ফি নেওয়া হয়।
এবার যুদ্ধ চলার সময় ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। এর অংশ হিসেবে তারা ‘পার্সিয়ান গালফ স্ট্রেইট অথরিটি’ বা পারস্য উপসাগরীয় প্রণালি কর্তৃপক্ষ গঠন করে। ইরান বলেছিল, এই কর্তৃপক্ষ জাহাজ চলাচলে ‘নিরাপদ পারাপারের অনুমতিপত্র’ ইস্যু করবে।
তবে প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ইরানের এসব চেষ্টা বারবার প্রত্যাখ্যান করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের উপসাগরীয় মিত্ররা।
সূত্র: বিবিসি




