গাজায় তিন বছর পর ৪০ শিশুসহ ১১২ জনের মরদেহ উদ্ধারের পর গণদাফন

ছবি: রয়টার্স
২০২৩ সালে ইসরায়েলি হামলায় নিহত ১১২ জনের মরদেহ তিন বছর পর উদ্ধার করে মঙ্গলবার মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহে গণদাফন করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ৪০টি শিশু রয়েছে।
ইসরায়েলের অব্যাহত হামলার কারণে এতদিন মরদেহগুলো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর হামলা কমলেও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ফলে ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে থাকা মরদেহ উদ্ধারের সুযোগ পেয়েছেন উদ্ধারকর্মীরা।
মঙ্গলবার দেইর আল-বালাহে শতাধিক কফিন নিয়ে জড়ো হন শত শত মানুষ। ফিলিস্তিনি পতাকায় মোড়ানো কফিনগুলো সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়। নিহতদের জন্য প্রার্থনা শেষে ধ্বংসস্তূপে ঘেরা সড়ক ও ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবনের পাশ দিয়ে মরদেহগুলো নিয়ে যাওয়া হয় কাছের একটি কবরস্থানে।
২০২৩ সালের ২২ নভেম্বর গাজা সিটির একটি আবাসিক ভবনে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান হামলা চালালে তিন শতাধিক মানুষ নিহত হন। হামলার পর ঘটনাস্থলে থাকা লোকজন খালি হাতে ও সাধারণ সরঞ্জাম দিয়ে জ্বলন্ত ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে প্রায় ৪০ জনের মরদেহ উদ্ধার করতে পেরেছিলেন।
গত শনিবার গাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা বাহিনী ধসে পড়া ওই ভবনের ধ্বংসস্তূপ খুঁড়ে আরও ১১২ জনের মরদেহের দেহাবশেষ উদ্ধার করে। নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুও ছিল। সংস্থাটি জানিয়েছে, হামলার পরও ১৫৭ জন নিখোঁজ রয়েছেন।
অক্টোবরে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি গাজায় ইসরায়েলি হামলা পুরোপুরি বন্ধ করতে না পারলেও উদ্ধারকর্মীদের ধ্বংসস্তূপে তল্লাশি চালানোর সুযোগ দিয়েছে। পুরো উপত্যকাজুড়ে এখনও হাজারো মানুষের দেহাবশেষ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নথি বিভাগের প্রধান জাহের আল-ওয়াহেইদি অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেছেন, স্বজনদের হিসাবে অন্তত ৭ হাজার ৪০০ মানুষ এখনও ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছেন। প্রকৃত সংখ্যা আরও কয়েক হাজার বেশি হতে পারে। কারণ, অনেক হামলায় পুরো পরিবারই নিহত হয়েছে। ফলে তাদের নিখোঁজ হিসেবে জানানোর মতো কেউ বেঁচে নেই।
জাতিসংঘের একটি কমিশন, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গাজায় গণহত্যার অভিযোগ তুলেছে। জুনে জাতিসংঘের একটি কমিশনও জানিয়েছে, গাজায় ইসরায়েল গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে এবং দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী ‘ইচ্ছাকৃতভাবে ফিলিস্তিনি শিশুদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে হত্যা করেছে’।
গত সপ্তাহান্তেও ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ২৬ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। গাজায় যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ কার্যকরের লক্ষ্যে একটি চুক্তির ঘোষণা আসার পরও এসব হামলা চালানো হয়। এর কয়েক দিন আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন চুক্তিটিকে ‘ঐতিহাসিক সমঝোতা’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। ওই চুক্তির লক্ষ্য হামাসের নিরস্ত্রীকরণ এবং গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের পথ তৈরি করা।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় গাজায় ৭৩ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর নিহত হয়েছেন ১ হাজার ২৫০ জনের বেশি।
ওই দিন হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষ নিহত এবং ২৫১ জন জিম্মি হন। যুদ্ধবিরতির পর থেকে ইসরায়েলের পাঁচ সেনাও নিহত হয়েছেন।
চুক্তির দ্বিতীয় ধাপ নিয়ে যুদ্ধবিরতি আলোচনা কার্যত থমকে আছে। হামাসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা বলেছেন, গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার করা হলে তবেই তারা নিরস্ত্রীকরণে রাজি হবে। অন্যদিকে ইসরায়েল গত সপ্তাহের চুক্তি নিয়ে ‘গুরুতর নিরাপত্তা উদ্বেগের’ কথা জানিয়েছে।
গাজার বেশির ভাগ এলাকা এখনও ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। উপত্যকার প্রায় ২০ লাখ মানুষের অধিকাংশই বাস্তুচ্যুত হয়ে অস্বাস্থ্যকর ও অতিরিক্ত ঘনবসতিপূর্ণ তাঁবুর শহরে মানবিক সংকটের মধ্যে বসবাস করছেন।
সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান






