বিএনপি আমলেই কোণঠাসা বিএনপিপন্থী আমলারা
- সচিবসহ গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে এখনো আওয়ামী সুবিধাভোগী

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বিএনপি সরকারের ছয় মাস চলে গেছে। এর আগে দায়িত্ব পালন করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। দুই আমলেই প্রশাসন থেকে শেখ হাসিনার দলবাজ আমলাদের সরিয়ে দিতে ব্যাপক রদবদল, বাধ্যতামূলক অবসর ও ওএসডি করা হয়। কিন্তু এরপরও অন্তত সাতজন সচিবসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে নির্বিঘ্নে কাজ করে যাচ্ছেন কয়েকশ আওয়ামীপন্থী। বর্তমান সরকারের প্রভাবশালীদের ‘ম্যানেজ’ করে পদোন্নতিসহ বাগিয়ে নিয়েছেন এসব পদ।
অন্যদিকে বেশ অস্বস্তিতে রয়েছেন বিএনপি ঘরানার উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কর্মকর্তা। যারা গণঅভ্যুত্থানের আগপর্যন্ত ছিলেন নানাভাবে নির্যাতিত। এখনো একই অবস্থা। তাদের ভাষ্য, ‘বিএনপিপন্থী তকমা দিয়ে কোনো কারণ ছাড়াই বিভাগীয় মামলায় ফাঁসিয়ে দিয়েছিল ওই সময়ের সরকার। এসব মামলায় বিভিন্ন পর্যায়ে শাস্তিও হয়েছিল। এখন সেগুলোকেই সুকৌশলে ইস্যু বানিয়ে পদোন্নতিবঞ্চিত অথবা অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ পদের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে।’
‘আমরা ছাত্রজীবনে ছাত্রদলের নেতাকর্মী ছিলাম। এজন্য গত ১৫ বছর পদোন্নতিসহ গুরুত্বপূণ পদ পাইনি। এমনকি বছরের পর বছর থাকতে হয়েছে ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) হিসেবে। এখন বিএনপি সরকার ক্ষমতায়। এরপরও বঞ্চিত। আবার অনেকে ওএসডি। আমাদের দেখার কেউ নেই’— এমন আক্ষেপের কথা প্রায় অভিন্ন সুরে আগামীর সময়ের কাছে প্রকাশ করলেন অন্তত দুই ডজন বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা।
এ প্রসঙ্গে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘সরকারি চাকরিতে দল হিসেবে পদোন্নতি-পদায়ন পাওয়ার সুযোগ নেই। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে শতভাগ স্বচ্ছতা, দক্ষতা ও মেধার ভিত্তিতে পদোন্নতি হচ্ছে। আমরা প্রশাসন দলীয়করণ করতে চাই না। কোনো ফ্যাসিস্ট কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়নি। কেউ পদোন্নতি পেলে তা এসএসবির (সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড) কাছে তথ্য গোপন করেছে। এ ধরনের অভিযোগ পাওয়ামাত্রই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’ এক প্রশ্নে জবাবে তিনি বললেন, ‘কোনো যোগ্য কর্মকর্তা বঞ্চিত হয়ে থাকলে, তা সুনির্দিষ্টভাবে উপস্থাপন করতে হবে। সেক্ষেত্রে অবশ্যই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এর আগে গত ৭ জুলাই জাতীয় সংসদে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আবদুল বারী বলেছিলেন, ‘বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারকে দীর্ঘস্থায়ী করতে প্রশাসনের যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রকাশ্যে কাজ করেছেন, তাদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এরই মধ্যে বিভিন্ন তদন্ত সংস্থা তাদের খুঁজে বের করতে কাজ শুরু করেছে।’
অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তাদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের (বিএএসএ)’ মহাসচিব মো. বাবুল মিয়া। বিএনপিপন্থী হওয়ায় শেখ হাসিনার আমলে ১০ বছর ২ মাস ওএসডি ছিলেন। এই দীর্ঘ সময় পাননি পদোন্নতি। বিসিএস ১৫তম ব্যাচের এ কর্মকর্তা এখন পরিকল্পনা কমিশনের অতিরিক্ত সচিব। চব্বিশের ৫ আগস্টের পর পদোন্নতি পেয়ে অতিরিক্ত সচিব হলেও জায়গা হয়নি সচিবালয়ে। তাকে পরিকল্পনা কমিশনে বদলি করা হয় ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে। তার দুই ব্যাচ জুনিয়র ১৮তম ব্যাচের অন্তত ১০ জন কর্মকর্তা সচিব হলেও তার কপালে জোটেনি সচিবের চেয়ার।
বাবুল মিয়ার ব্যাচমেট আবুল হাছানাত হুমায়ুন কবীর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টারদা সূর্য সেন হল কমিটিতে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ক্রীড়া সম্পাদক ছিলেন। ১৯৯২ সালের ডাকসু নির্বাচনে ক্রীড়া সম্পাদক পদে দলের প্রার্থীও হন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ছিলেন খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি)। বিএনপি ক্ষমতায় আসার ১০ দিনের মাথায় তাকে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোতে (বিএমইটি) একই পদে বদলি করা হয়। সেখান থেকে আড়াই মাসের মাথায় তাকে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব পদে বদলি করা হয়। দেড় মাস পর তাকে ফের বদলি করা হয় ভূমি মন্ত্রণালয়ের ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের ডিজি পদে। সেখানে তিনি গত ১৬ জুলাই যোগ দেন। এখন সচিব হওয়ার স্বপ্ন ভুলে সচিবালয়ে পদায়নের তদবির করছেন।
বিসিএস ১৮তম ব্যাচের ১০ কর্মকর্তা সচিব হয়েছেন। কিন্তু এখনো ভাগ্য খোলেনি একই ব্যাচের একজন অতিরিক্ত সচিবের। যিনি ছাত্রজীবনে বুয়েট ছাত্রদলের সোহরাওয়ার্দী হল শাখার সমাজকল্যাণ সম্পাদক ছিলেন। এ ছাড়া বিসিএস ২০তম ব্যাচের একজন যুগ্ম সচিব ১৪ মাস ধরে ওএসডি আছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল ছাত্রদলের যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন। কলেজজীবনেও কলেজ ছাত্র সংসদের সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন ছাত্রদল মনোনীত হিসেবে। তার বড় ভাই ক্ষমতাসীন দল বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য। এ কারণে আওয়ামী লীগ আমলে ভালো পদায়ন পাননি। অন্তর্বর্তী ও বর্তমান বিএনপি সরকােরর আমলেও তিনি বঞ্চিত।
পুলিশ পরিদর্শক মনিরুল হক (ডাবলু) ছাত্রদল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসীন হল শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। বর্তমানে বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের (কনস্টেবল-পরিদর্শক) সাধারণ সম্পাদক। এর আগে ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের সদস্য ছিলেন। বিএনপির ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় নির্বাচন মনিটরিং উপকমিটির সদস্য ছিলেন। তার বাবা এবং দুই ভাই রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ পৌর বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতা। আওয়ামী লীগ আমলে ঢাকায় পদায়ন না পেলেও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কেরানীগঞ্জ, আশুলিয়া থানায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হন। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর সম্প্রতি তাকে নীলফামারীর পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত করা হয়েছে।
সম্প্রতি যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি হয়েছে বিসিএস ২৫তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের। সেখানে জায়গা হয়নি এই ব্যাচের এক কর্মকর্তার। যিনি বর্তমান সরকারের একজন প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব (পিএস)। দক্ষ ও অভিজ্ঞ এ কর্মকর্তা বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শেরেবাংলা হলের ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং হল ছাত্র সংসদের নির্বাচিত খাদ্য সম্পাদক ছিলেন। একইভাবে জায়গা হয়নি ওই ব্যাচের মেধাতালিকায় প্রথমদিকে থাকা স্থানীয় সরকার বিভাগের এক কর্মকর্তার। যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রদল সভাপতি ছিলেন।
এ ছাড়া যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও পদোন্নতির তালিকায় নাম ছিল না ভূমি মন্ত্রণালয়ের এক উপসচিবের। যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এফ রহমান হলের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। নিজ ব্যাচের অ্যাসোসিয়েশনেও সাংগঠনিক সম্পাদক তিনি। তার বিরুদ্ধে কোনো বিভাগীয় মামলাও নেই— দাবি করেছেন বঞ্চিত এই কর্মকর্তা। অথচ তারই ব্যাচের বঙ্গবন্ধু নিয়ে ‘যতদূর যাও পাখি দেখা হবে ফের, স্বাধীন ওই আকাশটা শেখ মুজিবের!’ কবিতার লেখক ইমতিয়াজ মাহমুদ জুয়েল পদোন্নতি পেয়েছেন বর্তমান সরকারের সময়।
পদোন্নতি বাগিয়ে নিয়েছেন বঙ্গবন্ধুর মাজারে ফুল দেওয়া মফিজুল ইসলাম, সৈয়দা নাহিদা হাবিবা ও বঙ্গবন্ধু আইন পরিষদের সহসভাপতি শারমীন আক্তার জাহান। তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নড়াইল ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ডিসি ছিলেন। বর্তমানে অর্থ বিভাগে আছেন।
এ ছাড়া আওয়ামী লীগ আমলের এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা রহমাতুল মুনিমের দীর্ঘদিনের পিএস নায়িরুজ্জামানও পদোন্নতি পেয়ে বর্তমানে নীলফামারীর ডিসির দায়িত্বে আছেন। আর সৌদি আরবের জেদ্দায় কমার্শিয়াল কাউন্সিলর পদে নিয়োগ পান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের নেত্রী ফ্লোরা বিলকিস জাহান। সেখানে থেকেই যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি পেয়ে এখনো বহাল।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ নেতা এস এম আবদুল্লাহ আল মামুন আওয়ামী লীগ আমলে সিঙ্গাপুরের কমার্শিয়াল কাউন্সিলর পদে নিয়োগ পান। তিনি সেখানে থেকেই পদোন্নতি বাগিয়ে নেন। বিটিআরসির সচিব ছিলেন ছাত্রলীগ নেতা নুরুল হাফিজ। বঙ্গবন্ধুর মাজারে ফুল দেওয়াসহ ওই সময় তার নানা ছবি ফেসবুকে ঘুরছে। তিনিও পদোন্নতি পেয়ে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক পদে আছেন।
শেখ হাসিনার স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলামের পিএস ও আওয়ামী আমলে বগুড়ার ডিসি নুরে আলম সিদ্দিকী। বিসিএস ১৮তম ব্যাচের এ কর্মকর্তা চব্বিশের ৫ আগস্টের পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় উপদেষ্টাকে ম্যানেজ করে এই পদে নিয়োগ পান। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এলাকায় তার গ্রামের বাড়ি হওয়ায় তিনি এখন আরও শক্ত অবস্থানে আছেন।
সাবেক প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ানের পিএস ছিলেন ২০তম ব্যাচের উম্মে রেহানা। এরপর ২০২৩ সালে যুগ্ম সচিব হিসেবে বিদ্যুৎ বিভাগে পদায়ন পান। এখনো সেখানে আছেন। বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলো নিয়ন্ত্রণ করছেন। পাশাপাশি তিনি ডিপিডিসির বোর্ড মেম্বারও।
আওয়ামী লীগ আমলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ছিলেন ২৫ ব্যাচের মোহাম্মদ সোলাইমান ও ৩০ ব্যাচের হাসান সাদী। তারা দুজনই এখন বিদ্যুৎ বিভাগে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সোলাইমান ১৮ দিনের জন্য চাঁপাইনবাবগঞ্জের ডিসি হন। অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে পরে তাকে প্রত্যাহার করা হয়। অন্যদিকে বুয়েট ছাত্রলীগ নেতা ও গোপালগঞ্জের হাসান সাদী এখনো পরিকল্পনা শাখার দায়িত্বে আছেন। বিসিএস ২৭ ব্যাচের কর্মকর্তা মুহাম্মদ আবদুল হাই মিলটন ছিলেন সাবেক স্বরাষ্ট্র সচিব ফরিদ উদ্দিন আহম্মেদ চৌধুরীর একান্ত সচিব (পিএস)। সেখান থেকেই তিনি পদায়ন নিয়ে চলে যান ওয়াশিংটন। সম্প্রতি তিনি দেশে ফিরেই ঢাকা ওয়াসার সচিব পদ বাগিয়ে নিয়েছেন।
এ ছাড়া শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের লেইস প্রকল্পের সহকারী প্রকল্প পরিচালক (প্রকিউরমেন্ট) বুলবুল আহমেদ, সহকারী প্রকল্প পরিচালক (প্রশাসন ও প্রশিক্ষণ) আজিজুল হক, প্রকল্প কর্মকর্তা (প্রশিক্ষণ) আলী আজগর চৌধুরী আওয়ামী লীগ আমলের সুবিধাভোগী কর্মকর্তা। বুলবুল আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ নেতা এবং আলী আজগর চৌধুরী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক ছিলেন।
আজিজুল হক সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের সুপারিশে প্রকল্পে চাকরি পান। ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট শিক্ষাভবনের গেটে ‘খুনি খালেদার বিচার চাই’ সংবলিত ব্যানার-প্ল্যাকার্ড নিয়ে মিছিল করেছেন— সেই ভিডিও ভাইরাল হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অথচ তারা এখনো বহাল তবিয়তে প্রকল্পে কর্মরত।








