ভেপের আড়ালে মাদকের ছায়া, নতুন উদ্বেগ আমিরাতের
- ই-সিগারেট নাকি মাদকের গেটওয়ে? ভয়াবহ সতর্কবার্তা বিশেষজ্ঞদের

প্রতীকী ছবি
একটি ছোট ডিভাইস। হাতের তালুতে সহজেই ধরে রাখা যায়। দেখতে আধুনিক, ব্যবহারেও সহজ। অনেক তরুণের কাছে এটি কেবল ধূমপানের ‘নিরাপদ বিকল্প’। কিন্তু চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা বলছে, এই নিরীহ চেহারার ভেপ বা ই-সিগারেটের ভেতরেই লুকিয়ে থাকতে পারে মাদকের ভয়ংকর ফাঁদ।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে সাম্প্রতিক সময়ে ভেপের মাধ্যমে গাঁজার তেল, সাইকোঅ্যাকটিভ রাসায়নিক এবং অন্যান্য মাদক গ্রহণের প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। দেশটির স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিশোর-কিশোরীদের লক্ষ্য করে মাদক চক্র নতুন কৌশল গ্রহণ করেছে। প্রচলিত মাদকের বদলে এমন ডিভাইস ব্যবহার করা হচ্ছে, যা বাইরে থেকে সাধারণ ভ্যাপের মতোই দেখায়। ফলে পরিবার, শিক্ষক কিংবা অনেক ক্ষেত্রেই চিকিৎসকদের পক্ষে বিষয়টি দ্রুত শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
এই উদ্বেগের মধ্যেই মাদকবিরোধী কার্যক্রম আরও জোরদার করেছে আমিরাত সরকার। ‘ইউনাইটেড অ্যাজ ওয়ান টু ইরাডিকেট দ্য থ্রেট’ স্লোগানে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে বিশেষ অভিযান। জাতীয় মাদকবিরোধী কৌশল ২০২৪- ২০৩১ এর অংশ হিসেবে নেওয়া এই উদ্যোগের লক্ষ্য আগামী কয়েক বছরের মধ্যে মাদকের বিস্তার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা এবং তরুণ প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যার মূল জায়গা হলো ভেপ সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণা। অনেকেই মনে করেন, ই-সিগারেট সাধারণ সিগারেটের তুলনায় অনেক কম ক্ষতিকর। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। শারজাহর মেডকেয়ার হাসপাতালের পালমোনোলজিস্ট ডা. মোহাম্মদ হ্যারিস বললেন, ভেপকে নিরাপদ বিকল্প হিসেবে দেখার প্রবণতা বিভ্রান্তিকর। এতে থাকা নিকোটিন ও অন্যান্য রাসায়নিক দীর্ঘমেয়াদে ফুসফুসের গুরুতর ক্ষতি করতে পারে। বিশেষ করে কিশোর বয়সে নিকোটিনের সংস্পর্শ মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তার মতে, সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো মাদক মেশানো ভেপ। কারণ এসব ডিভাইস দেখতে সাধারণ ভেপের মতো হওয়ায় ব্যবহারকারীর আসল উদ্দেশ্য অনেক সময় ধরা পড়ে না। ফলে একজন কিশোর কখন পরীক্ষামূলক ব্যবহার থেকে আসক্তির দিকে চলে যাচ্ছে, তা পরিবার বুঝতেই পারে না।
রাস আল খাইমাহ হাসপাতালের পালমোনোলজিস্ট ডা. প্রভু প্রসাদের মতে, অনেক তরুণ এখনো বিশ্বাস করে ভেপ থেকে কেবল জলীয় বাষ্প বের হয়। অথচ বাস্তবে এটি এক ধরনের অ্যারোসল, যার মধ্যে থাকতে পারে নিকোটিন, রাসায়নিক ফ্লেভার, সূক্ষ্ম ধাতব কণা, সলভেন্ট এবং উত্তপ্ত হওয়ার ফলে তৈরি হওয়া বিষাক্ত উপাদান। এসব পদার্থ শুধু ফুসফুস নয়, মনোযোগ, আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞরা শুধু ডিভাইসের দিকে নজর দেওয়ার কথা বলছেন না। বরং আচরণগত পরিবর্তনকে গুরুত্ব দিতে বলছেন। হঠাৎ পড়াশোনায় অমনোযোগ, মেজাজের দ্রুত পরিবর্তন, পরিবার থেকে দূরে সরে যাওয়া, অস্বাভাবিক ক্লান্তি, চোখ লাল হয়ে থাকা, ঘন ঘন বাথরুমে যাওয়া কিংবা গোপনীয়তা বেড়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
দুবাইয়ের অ্যাস্টার সিডার্স হাসপাতালের পালমোনোলজিস্ট ডা. অশ্বিনী চাওহান জানান, বর্তমানে বাজারে থাকা অনেক ডিসপোজেবল ভেপে নিকোটিনের মাত্রা এত বেশি যে অল্প সময়ের মধ্যেই আসক্তি তৈরি হতে পারে। চিকিৎসকদের কাছে এখন ক্রমবর্ধমান সংখ্যায় এমন তরুণ রোগী আসছে, যারা দীর্ঘদিনের কাশি, শ্বাসকষ্ট, হাঁপানির প্রকোপ বৃদ্ধি কিংবা শারীরিক সক্ষমতা কমে যাওয়ার সমস্যায় ভুগছে। তিনি সতর্ক করে বললেন, ভ্যাপের মাধ্যমে গাঁজার তেল বা অন্যান্য সাইকোঅ্যাকটিভ পদার্থ গ্রহণ করলে তাৎক্ষণিকভাবে উদ্বেগ, আতঙ্ক, শ্বাসকষ্ট এবং বিচারক্ষমতা হ্রাসের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব আরও ভয়াবহ হতে পারে। মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, স্মৃতিশক্তি হ্রাস এবং দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসযন্ত্রের রোগের ঝুঁকিও বাড়ে।
প্রাইম হাসপাতালের প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. আদেল আল সিসি মনে করেন, তরুণদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা এখন সবচেয়ে জরুরি। তার মতে, ভয় দেখিয়ে নয়, বরং সচেতনতার মাধ্যমে কিশোরদের কাছে পৌঁছাতে হবে। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই কৌতূহল থেকে শুরু হওয়া অভ্যাস পরে নির্ভরতায় পরিণত হয়।
এদিকে আমিরাত সরকার শুধু আইন প্রয়োগেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। সীমান্তে নজরদারি, মাদক শনাক্তকরণ প্রযুক্তির উন্নয়ন, পুনর্বাসন কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং জনসচেতনতামূলক প্রচারণাও বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে স্কুল ও পরিবারের ভূমিকায়।
ভাষান্তর : রুবাইয়া জেসমিন




