১৯৩৮ সালে তেলের সন্ধান, সত্তরের দশকে পেট্রোডলারের জোয়ার
মরুর বুকে একটা কূপ, বদলে গেল সৌদির ভাগ্য!
- হজের আয় ও সীমিত অর্থনীতির দেশ থেকে বিশ্বের অন্যতম তেলসমৃদ্ধ রাষ্ট্র হয়ে ওঠার ইতিহাস

সৌদি আরবের বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সৌদ
‘দাঁড়াও, প্রিয়জন আর ফেলে আসা বসতির স্মৃতিতে কেঁদে নিই।’ প্রাচীন আরবের কবি ইমরুল কায়েসের বিখ্যাত কবিতার সূচনাপঙ্ক্তির ভাবানুবাদ এটি। মরুর বুকে হারিয়ে যাওয়া বসতির স্মৃতি। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আরবের মরু ছিল কাফেলা, উট, খেজুরবাগান আর অনিশ্চিত জীবিকার ঠিকানা। অথচ একদিন সেই বালুর অনেক নিচ থেকে উঠে এল এমন সম্পদ, যা পাল্টে দিল একটি দেশের অর্থনীতি। যে মরুভূমিতে পানির সন্ধানই ছিল কঠিন, সেখানে এক কূপ থেকে প্রবাহিত হলো তেল। ১৯৩৮ সালের সেই আবিষ্কার থেকেই সৌদি আরবের ভাগ্যবদলের সূচনা। কিন্তু কূপের মুখ খুলতেই কি রাতারাতি ধনী হয়ে গিয়েছিল দেশটি? ইতিহাস বলছে, আসল গল্প আরও দীর্ঘ।
সৌদি আরামকোর ঐতিহাসিক নথি, অর্থনীতিবিদদের গবেষণা, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল এবং সৌদি সরকারের সর্বশেষ পরিসংখ্যান মিলিয়ে দেখা যায়, তেলের সন্ধান ছিল শুরু। সম্পদের পাহাড় গড়ে ওঠে উৎপাদন, বৈশ্বিক দামবৃদ্ধি, মুনাফার ভাগ আদায়, রাষ্ট্রীয় মালিকানা এবং পেট্রোডলার বিনিয়োগের কয়েক দশকের ধারাবাহিকতায়।
তেলের আগে কেমন ছিল দেশটি
সৌদি আরবের বর্তমান রাষ্ট্রীয় পরিচয়ও তখন নতুন। ১৯০২ সালে রিয়াদ পুনর্দখলের পর দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সামরিক অভিযানে আরব উপদ্বীপের বিস্তীর্ণ অঞ্চল এক শাসনের অধীনে আনেন আবদুল আজিজ ইবনে সৌদ। ২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৩২ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় সৌদি আরব রাজতন্ত্র। রাজধানী রিয়াদ। পবিত্র মক্কা-মদিনা ঘিরে হিজাজ অঞ্চলের অর্থনীতি এবং মধ্যভাগের নাজদের জীবন ছিল বেশ আলাদা।
তখন রাষ্ট্রের আয়ের বড় উৎস হজযাত্রীদের যাতায়াত, শুল্ক ও বাণিজ্য। খেজুরচাষ, মরূদ্যানের কৃষি, পশুপালন, উপকূলের মুক্তা আহরণ ও ছোট ব্যবসাও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। জনসংখ্যার একাংশ যাযাবর বেদুইন। বাকিরা শহর, গ্রাম ও মরূদ্যানে স্থায়ীভাবে বসবাস করতেন। সবাই বেদুইন ছিলেন না। পর্যাপ্ত সড়ক, হাসপাতাল, বিদ্যালয় কিংবা সরকারি অবকাঠামো ছিল না। মহামন্দায় হজযাত্রী কমে যাওয়ায় রাজকোষ আরও চাপে পড়ে।
হিজাজের বন্দরনগর জেদ্দায় বাণিজ্য চলত। মক্কা-মদিনার হজ মৌসুমে দোকান, পরিবহন ও থাকার ব্যবস্থা ঘিরে আয় হতো। কিন্তু বছরের অন্য সময় সেই প্রবাহ সমান থাকত না। নাজদের পশুপালক ও মরূদ্যানের কৃষকের জীবন ছিল অন্য রকম। উপসাগরের উপকূলে মাছধরা এবং মুক্তা আহরণের জীবিকা। ফলে ‘তেলের আগে সৌদিতে কিছুই ছিল না’, এমন বক্তব্য ভুল। তবে দেশটির অর্থনৈতিক সামর্থ্য যে সীমিত ছিল, তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই।
অর্থনীতিবিদ আবদুল আজিজ আল-দুখাইলের ২০১৩ সালের গবেষণা অনুযায়ী, ১৯৩৮ সালে সৌদি সরকারের আয় ছিল প্রায় আড়াই কোটি রিয়াল। যার অর্ধেক এসেছিল আমদানি শুল্ক থেকে। বাকি বড় অংশ হজযাত্রীদের ঘিরে। তেল থেকে রাজস্ব তখনও নগণ্য। দেশটি স্বল্প আয়ের অর্থনীতি ছিল। কিন্তু বিশ্বের দরিদ্রতম দেশের তালিকায় কত নম্বরে ছিল, তার নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক ক্রমতালিকা নেই।
মরুর মাটিতে সাত নম্বর কূপ
বাহরাইনে ১৯৩২ সালে তেলের সন্ধান পাওয়ায় প্রতিবেশী সৌদি ভূখণ্ডেও নতুন আশা জাগে। অবশ্য তার আগেই তেল অনুসন্ধানের চেষ্টা হয়েছিল। ১৯২৩ সালে ব্রিটিশ ব্যবসায়ী ফ্র্যাঙ্ক হোমসের প্রতিনিধিত্ব করা একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অনুসন্ধান চুক্তি করেন আবদুল আজিজ। কিন্তু তাতে বাণিজ্যিক সাফল্য আসেনি।
নতুন সুযোগ আসে ১৯৩৩ সালে। ওই বছরের ২৯ মে বাদশাহ আবদুল আজিজের শাসনামলে মার্কিন প্রতিষ্ঠান স্ট্যান্ডার্ড অয়েল অব ক্যালিফোর্নিয়ার সঙ্গে তেল অনুসন্ধান চুক্তি হয়। সরকারের পক্ষে স্বাক্ষর করেন অর্থমন্ত্রী আবদুল্লাহ আল-সুলাইমান। মার্কিন প্রতিষ্ঠানের পক্ষে লয়েড হ্যামিল্টন। চুক্তিতে সৌদি সরকারকে ঋণ, বার্ষিক অর্থ এবং তেল আবিষ্কারের পর রয়্যালটি দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। অনুসন্ধানের দায়িত্ব পায় মার্কিন প্রতিষ্ঠানটি। ভূতত্ত্ববিদেরা পৌঁছান পূর্বাঞ্চলের ধাহরানে।
১৯৩৫ সালে দাম্মামে প্রথম কূপ খনন শুরু হয়। একের পর এক কূপে কাঙ্ক্ষিত ফল মিলছিল না। ১৯৩৬ সালের ডিসেম্বরে সাত নম্বর গভীর কূপটির খনন শুরু হয়। সেটিও প্রথমে হতাশ করেছিল। কিন্তু প্রধান ভূতত্ত্ববিদ ম্যাক্স স্টেইনেকে আরও গভীরে খননের পরামর্শ দেন।
অবশেষে এল সেই ঐতিহাসিক দিন। ৪ মার্চ ১৯৩৮। প্রায় এক হাজার ৪৪০ মিটার গভীরতা থেকে দৈনিক এক হাজার ৫৮৫ ব্যারেল তেল উঠল। তিন দিনের মধ্যে উৎপাদন দ্বিগুণের বেশি হলো। যে কূপ বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা ছিল, সেটিই পরবর্তী সময়ে পরিচিত হলো ‘সমৃদ্ধির কূপ’ নামে।
তবে আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গেই ধনী হয়ে যায়নি সৌদি আরব। খনি, পাইপলাইন, বন্দর, পরিশোধনাগার, দক্ষ শ্রমশক্তি ও আন্তর্জাতিক ক্রেতা তৈরি করতে সময় লেগেছে।
১৯৩৮ সালের সেপ্টেম্বরে সীমিত পরিসরে বাহরাইনের একটি পরিশোধনাগারে তেল পাঠানো শুরু হয়। এরপর ১ মে ১৯৩৯ সালে রাস তানুরা থেকে প্রথম বড় তেলবাহী জাহাজে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করা হয়। বাদশাহ আবদুল আজিজ নিজে তেল ভরার কপাট খুলে দেন। সেই জাহাজের নাম ছিল ‘ডি জি স্কোফিল্ড’।
কূপ থেকে বিশ্ববাজারে
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ উৎপাদনের বিস্তার কিছুটা বিলম্বিত করলেও যুদ্ধশেষে বিশ্বে জ্বালানির চাহিদা দ্রুত বাড়ে। ১৯৪৪ সালে মার্কিন অনুসন্ধান প্রতিষ্ঠানটির নাম হয় অ্যারাবিয়ান আমেরিকান অয়েল কোম্পানি, সংক্ষেপে আরামকো। ১৯৪৯ সালে দৈনিক উৎপাদন পৌঁছায় পাঁচ লাখ ব্যারেলে।
১৯৫০ সালে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত দীর্ঘ আন্তঃআরব পাইপলাইন চালু হয়। সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চল থেকে লেবাননের সাইদা বন্দরে তেল পৌঁছানোর ব্যবস্থা তৈরি হয়। এতে ইউরোপে রপ্তানির সময় ও পরিবহনব্যয় কমে।
একই সময়ে নতুন তেলক্ষেত্রের সন্ধান মেলে। বিশাল ঘাওয়ার তেলক্ষেত্রের উন্নয়ন এবং ১৯৫১ সালে সাফানিয়া সামুদ্রিক তেলক্ষেত্র আবিষ্কার উৎপাদনের সম্ভাবনা বহুগুণ বাড়ায়। তেল উত্তোলনের সঙ্গে গড়ে ওঠে প্রযুক্তিনির্ভর কর্মক্ষেত্র। প্রশিক্ষণ পেতে থাকেন সৌদি কর্মীরা। দেশীয় সরবরাহব্যবস্থা ও ব্যবসারও প্রসার ঘটে।
তেল শুধু রাজকোষ নয়, কূটনীতিও বদলাতে থাকে। ১৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৫ সালে সুয়েজ খালের গ্রেট বিটার লেকে মার্কিন যুদ্ধজাহাজে প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বাদশাহ আবদুল আজিজ। পরবর্তী কয়েক দশকে জ্বালানি, নিরাপত্তা ও বিনিয়োগ ঘিরে দুই দেশের সম্পর্ক গভীর হয়।
তবে তখনও তেলের বিপুল আয়ের বড় অংশ বিদেশি কোম্পানির হাতে ছিল। পরিবর্তন আসে ১৯৫০ সালে। আরামকোর সঙ্গে মুনাফা সমান ভাগাভাগির বন্দোবস্ত করে সৌদি সরকার। আগের তুলনায় রাজস্ব পাওয়ার ধরন বদলে যায়। তেলক্ষেত্রে বিদেশি কোম্পানির প্রভাবের মধ্যেই ১৯৬০ সালে বাগদাদে ইরান, ইরাক, কুয়েত ও ভেনেজুয়েলার সঙ্গে সৌদি আরব প্রতিষ্ঠা করে তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর সংস্থা ওপেক। উদ্দেশ্য তেলের বাজারে উৎপাদক দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষা ও দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়ানো।
সত্তরের দশকে পেট্রোডলারের জোয়ার
১৯৭৩ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিতে বিরাট ধাক্কা দেয়। ইসরায়েলকে মার্কিন সহায়তার প্রতিবাদে সৌদিসহ আরব তেল উৎপাদক দেশগুলো কয়েকটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা এবং উৎপাদন হ্রাসের ব্যবস্থা নেয়। তেলের সরবরাহসংকট ও উৎপাদক দেশগুলোর মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্তে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম প্রায় চার গুণ হয়। ব্যারেলপ্রতি প্রায় তিন ডলারের তেল ১৯৭৪ সালের শুরুতে পৌঁছায় সাড়ে ১১ ডলারের ওপরে। সৌদি আয়ে আসে অভাবনীয় উল্লম্ফন।
এখানেই আসে পেট্রোডলার। তেল বিক্রি করে রপ্তানিকারক দেশগুলোর অর্জিত ডলারকে বলা হয় পেট্রোডলার। সৌদি সরকার সেই বিপুল আয়ের অংশ খরচ করে সড়ক, বিমানবন্দর, হাসপাতাল, বিদ্যালয়, বিদ্যুৎ ও নগর গড়তে। অন্য অংশ জমা হয় বৈদেশিক সম্পদ ও বিনিয়োগে।
১৯৭৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ অর্থনৈতিক সহযোগিতা কাঠামো গড়ে ওঠে। এর উদ্দেশ্যের মধ্যে ছিল সৌদি শিল্পায়ন এবং তেলের ডলার আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থায় পুনর্বিনিয়োগ।
তবে জনপ্রিয় একটি দাবি ভুল। ১৯৭৪ সালে সৌদি আরব পঞ্চাশ বছরের জন্য কেবল ডলারে তেল বিক্রির বাধ্যতামূলক চুক্তি করেছিল, এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। পেট্রোডলার মানে কেবল কোনো গোপন চুক্তি নয়। তেল রপ্তানির আয়, মুদ্রা, সঞ্চয় ও বিনিয়োগের বৃহত্তর প্রবাহ। সৌদির সম্পদ বাড়ানোর মূল চালিকা ছিল উৎপাদন ও দাম। ডলারের পুনর্বিনিয়োগ সেই সম্পদ সংরক্ষণ ও অর্থনৈতিক প্রভাব বাড়াতে সাহায্য করে।
তেলের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে
আরেকটি বাঁক আসে আরামকোর মালিকানায়। ১৯৭৩ সালে সৌদি সরকার প্রতিষ্ঠানটির ২৫ শতাংশ অংশীদারত্ব নেয়। ১৯৭৪ সালে তা হয় ৬০ শতাংশ। অবশেষে ১৯৮০ সালে পূর্ণ মালিকানা অর্জিত হয়। তবে বর্তমান নামে রাষ্ট্রীয় সৌদি আরামকো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৮৮ সালে।
১৯৭০ সালে শুরু হওয়া পঞ্চবার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলো তেলের অর্থকে অবকাঠামো ও সরকারি সেবায় রূপ দিতে সাহায্য করে। মরুর জনপদে পাকা রাস্তা, আধুনিক বন্দর, বড় হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পশহর গড়ে ওঠে। সেই নির্মাণযজ্ঞে বাংলাদেশসহ নানা দেশের অভিবাসী শ্রমিকেরও বড় ভূমিকা রয়েছে।
নতুন অর্থনীতির সঙ্গে সমাজও পাল্টেছে। যে দেশে একসময় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ সীমিত ছিল, সেখানে সরকারি বিনিয়োগে সেবা বিস্তৃত হয়। শহরমুখী জনসংখ্যা বাড়ে। বিদেশ থেকে প্রকৌশলী, চিকিৎসক, নির্মাণশ্রমিক ও গৃহকর্মীরা আসেন।
কিন্তু তেলের সমৃদ্ধির সুফল সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছেছে, এমন দাবি করার সুযোগ নেই। অভিবাসী শ্রমিকের অধিকার, আবাসনের ব্যয়, কাজের নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক সুযোগের বৈষম্য নিয়ে প্রশ্ন থেকেছে। তেলের সম্পদ মানেই প্রতিটি নাগরিক বা কর্মীর সমান ধনসম্পদ নয়।
আজও তেলের ওপর কতটা নির্ভরশীল
তেলের দাম সব সময় চড়েনি। আশির দশকের দরপতন, ২০১৪ সালের মূল্যহ্রাস এবং ২০২০ সালের মহামারিতে চাহিদা কমে যাওয়া সৌদি অর্থনীতির দুর্বলতা দেখিয়েছে।
এ কারণেই ২৫ এপ্রিল ২০১৬ সালে তৎকালীন উপযুবরাজ (বর্তমান যুবরাজ) মোহাম্মদ বিন সালমানের উদ্যোগে ঘোষণা করা হয় ‘রূপকল্প ২০৩০’। লক্ষ্য পর্যটন, শিল্প, প্রযুক্তি, খনি, বিনোদন ও বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়িয়ে তেলনির্ভরতা কমানো। ২০১৯ সালে আরামকোর শেয়ার প্রথম বাজারে ছাড়াও এই কৌশলের অংশ।
গত ১৭ আগস্ট প্রকাশিত ২০২৫ সালের হিসাবে সৌদি রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ তহবিল জানিয়েছে, তাদের পরিচালনাধীন সম্পদের পরিমাণ ৯০ হাজার কোটি ডলারের বেশি। তবে রয়টার্সের হিসাবে, আগের বছরের তুলনায় সেই সম্পদের মূল্য কিছুটা কমেছে। বিশাল প্রকল্পের ব্যয়, বিনিয়োগের মুনাফা ও দীর্ঘমেয়াদি লাভ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
২৯ জুলাই আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের প্রকাশিত মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে সৌদি অর্থনীতি বেড়েছে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। তেলবহির্ভূত অর্থনীতি বেড়েছে ৪ দশমিক ২ শতাংশ। তবে তেল খাত এখনও মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ২২ শতাংশ এবং সরকারি রাজস্বের অর্ধেকের বেশি জোগান দেয়। রপ্তানিতেও তেল ও তেলজাত পণ্যের আধিপত্য রয়েছে।
একই হিসাবে, ২০২৫ সালে বাজেটঘাটতি ছিল মোট দেশজ উৎপাদনের ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। অর্থনীতির আকার বাড়লেও ব্যয় এবং তেলের আয়ের ওঠানামা রাজকোষে চাপ তৈরি করেছে। সাম্প্রতিক সংস্কারে নারীদের কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ বেড়েছে। কিন্তু বিশাল বিনিয়োগ প্রকল্পগুলো কত নতুন কর্মসংস্থান ও স্থায়ী উৎপাদনশীলতা গড়বে, সেটিই এখন বড় পরীক্ষা।
এর মধ্যে নতুন বিপদ হয়ে এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত শুরুর পর ব্যাহত হয়েছে উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল পরিবহন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সৌদি জ্বালানি অবকাঠামোও।
গত ১৫ অক্টোবর রয়টার্স জানিয়েছে, সংঘাতের প্রভাবে সৌদির তেল উৎপাদন একপর্যায়ে দৈনিক এক কোটি ব্যারেলের বেশি থেকে ৭০ লাখ ব্যারেলের নিচে নেমেছিল। সেপ্টেম্বরে তা কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়ে প্রায় ৮০ লাখ ব্যারেলে পৌঁছায়। কিন্তু রপ্তানিপথের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ কাটেনি।
একই দিন রয়টার্সের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সংশোধিত পূর্বাভাস তুলে ধরা হয়। তাতে ২০২৬ সালে সৌদি অর্থনীতি ৩ দশমিক ৩ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে। অথচ জুলাইয়ে একই সংস্থা ১ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল। যুদ্ধের অভিঘাতেই পাল্টেছে সেই হিসাব।
এই সংকট নতুন করে দেখিয়ে দিয়েছে, তেল যেমন সৌদি আরবের শক্তি, তেমনি তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতাও বড় ঝুঁকি। তেলের দাম, উৎপাদন কিংবা রপ্তানিপথে সংকট দেখা দিলেই অর্থনীতিতে তার গভীর প্রভাব পড়ে।
কারণ তেল থেকে পাওয়া টাকা খরচ করাও এক জিনিস। আর সেই টাকা দিয়ে তেলের বাইরে স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্পূর্ণ অন্য লড়াই।
এক কূপের ইতিহাস, আগামী দিনের প্রশ্ন
১৯৮২ সালে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায় দাম্মামের সাত নম্বর কূপে। তত দিনে তার বুক থেকে উঠে এসেছে তিন কোটি ২০ লাখ ব্যারেলের বেশি তেল। কিন্তু কূপটি বন্ধ হলেও তার খুলে দেওয়া ইতিহাসের দরজা আর বন্ধ হয়নি। বালুর নিচে লুকিয়ে থাকা সম্পদ সৌদি আরবকে দিয়েছে নতুন নগর, নতুন অর্থনীতি, বিশ্বরাজনীতিতে নতুন গুরুত্ব। যে দেশ একসময় হজযাত্রী, মরূদ্যানের কৃষি আর সীমিত বাণিজ্যের আয়ে দিন কাটাত, সেই দেশ আজ বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী তেল উৎপাদক।
অথচ ইতিহাসের পরিহাস এখানেই। যে তেল একদিন সৌদি আরবকে অনিশ্চয়তা থেকে সমৃদ্ধির পথে নিয়ে গিয়েছিল, সেই তেলের ওপর নির্ভরতাই আজ নতুন অনিশ্চয়তার কারণ। যুদ্ধের অভিঘাত, বিশ্ববাজারের ওঠানামা আর বদলে যাওয়া জ্বালানি অর্থনীতি মনে করিয়ে দিচ্ছে, মাটির নিচের সম্পদ অশেষ নয়। সেই সম্পদ থেকে পাওয়া নিরাপত্তাও চিরস্থায়ী নয়।
কবি ইমরুল কায়েস মরুর বুকে থেমেছিলেন হারানো বসতির স্মৃতিতে। আজ সৌদি আরব দাঁড়িয়ে তার বদলে যাওয়া মরুভূমির সামনে। পেছনে সাত নম্বর কূপের বিস্ময়। সামনে তেলের বাইরে নতুন ভবিষ্যৎ গড়ার কঠিন পরীক্ষা।
সেই মরু আজ আর আগের মতো নেই। তাঁবুর জায়গায় উঠেছে অট্টালিকা। কাফেলার পথ ধরে ছুটছে মহাসড়ক। বালুর নিচের তেল এনে দিয়েছে বিপুল ঐশ্বর্য। কিন্তু সম্পদের প্রাচুর্য আর সমৃদ্ধির স্থায়িত্ব কি এক কথা?
১৯৩৮ সালে সৌদি আরব খুঁজে পেয়েছিল তার ভাগ্য বদলানোর সম্পদ। প্রায় নয় দশক পর প্রশ্ন একটাই। তেলের নিচে যে ভবিষ্যৎ লুকিয়ে ছিল, তা তো খুঁজে পাওয়া গেছে। কিন্তু তেল ফুরিয়ে গেলে, কিংবা পৃথিবী তার প্রয়োজন কমিয়ে দিলে, সৌদি আরবের পরবর্তী ভবিষ্যৎ লুকিয়ে থাকবে কোথায়?



