ইরানে ফের মার্কিন হামলা, শিশুসহ এক দম্পতি নিহত
- ১৩ দিন পর ইরানে আবারও হামলা
- জর্ডানের ঘাঁটিতে হামলার জবাব বলছে যুক্তরাষ্ট্র
- কেশম দ্বীপে হামলায় আবাসিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত
- হরমুজ সংলগ্ন কিশ দ্বীপে বিস্ফোরণ
- মধ্যাঞ্চলের ফার্স দ্বীপে হামলা
- তেল শিল্পের কেন্দ্রস্থল খুজেস্তানে তিন অঞ্চলে হামলা

ছবি: রয়টার্স
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীর ওপর ‘আকস্মিক হামলার চেষ্টা’র জবাবে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে হামলা শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। এতে এক দম্পতি ও তাদের শিশু সন্তান নিহত হয়েছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানিয়েছে, মঙ্গলবার জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটি এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ লক্ষ্য করে ইরানের হামলার জবাবে এই অভিযান চালানো হচ্ছে। তাদের ভাষায়, এটি ‘শক্তিশালী জবাব’।
ইরানি কর্মকর্তাদের মতে, দক্ষিণাঞ্চলীয় হরমুজ প্রণালির একদম কাছে কেশম দ্বীপের একটি আবাসিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে বাস করা এক দম্পতি ও তাদের শিশু সন্তান নিহত হয়েছে।
কর্তৃপক্ষ আরও জানিয়েছে, দ্বীপটিতে বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিয়েছে এবং কর্মকর্তারা বিদ্যুৎ পুনরুদ্ধারের জন্য কাজ করছেন।
হামলায় আহত দুজনকে হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে এবং ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজ চলছে।
এই সাম্প্রতিক হামলাগুলোর ধরন যুক্তরাষ্ট্রের চালানো ১৩ দিনের সামরিক অভিযানের মতোই, যেখানে হামলাগুলো ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে, বিশেষ করে পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালীর উপকূলবর্তী এলাকাগুলোতে কেন্দ্রীভূত ছিল।
বুশেহর প্রদেশ ও কিশ দ্বীপেও আঘাত হানা হয়েছে। তবে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে সেখানে যাত্রীবাহী বা গাড়ি ফেরির সময়সূচি কিংবা বন্দরের কার্যক্রমে কোনো বিঘ্ন ঘটেনি।
বন্দর আব্বাসে বিস্ফোরণের খবরটি পরে কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট করে জানায়, শোনা শব্দগুলো খোদ শহরের ওপর হামলার নয়, বরং কেশম দ্বীপে হামলার প্রতিধ্বনি ছিল।
এছাড়া ফার্স প্রদেশ হলো ইরানের একমাত্র অ-উপকূলীয় প্রদেশ যা হামলার শিকার হয়েছে, যেখানে কাজারুন শহরকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। ফার্স ইরানের মধ্যাঞ্চলে অবস্থিত।
এরপর খুজেস্তান প্রদেশে অন্তত তিনটি স্থানে হামলা চালানো হয়। এই অঞ্চলটিকে ইরানের তেল শিল্পের কেন্দ্রস্থল হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এর এক দিন আগেই সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়। প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে ইরাকে ইরান-সমর্থিত প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর ওপর যৌথ হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব।
ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করার সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, যুদ্ধ মাত্র কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হবে। কিন্তু পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও সংঘাতের শেষের কোনো ইঙ্গিত নেই।
সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস এক মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে জানিয়েছে, বুধবার ট্রাম্প সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সেখানে সৌদি আরব উত্তেজনা কমানোর আগ্রহের কথা জানিয়েছে। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে হোয়াইট হাউসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে বিবিসি।
কয়েক দিনের তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতির পর মধ্যপ্রাচ্যে আবারও সংঘাত তীব্র হয়ে উঠেছে।
কূটনৈতিক সমাধানের আশায় কয়েক দিন ধরে উভয় পক্ষ হামলা বন্ধ রেখেছিল। ট্রাম্প সেই আলোচনাকে ‘খুবই বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনা’ বলে উল্লেখ করলেও তেহরান কোনো আলোচনা চলার কথা অস্বীকার করেছে।
বুধবার হামলার ঘোষণা দেওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘এবার আঘাত করার পালা আমাদের। আমরা তাদের ওপর খুব কঠোরভাবে আঘাত হানব।’
তিনি আরও বলেছেন, ‘তারা জানে আঘাত কঠিন হয়ে আসছে। তারা আমাদের এটি না করতে অনুরোধ করেছে।’
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, ‘আমেরিকান শিশু হত্যাকারী বাহিনীর আগ্রাসনের জবাবে’ জর্ডানে একটি মার্কিন বিমানঘাঁটি ও একটি কমান্ড সেন্টার লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে।
আইআরজিসি আরও দাবি করেছে, সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে ‘অনিরাপদ ও অবৈধ পথে’ চলাচল করায় হরমুজ প্রণালিতে তিনটি তেলবাহী জাহাজে তাদের নৌবাহিনী হামলা চালিয়েছে।
গত শুক্রবার টানা ১৩ রাতের বোমা হামলা স্থগিত করেছিলেন ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছিল, তারা ইরানের অস্ত্র ও সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। এতে বহু মানুষ নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
মঙ্গলবার সেন্টকম জানিয়েছিল, গত ৭২ ঘণ্টায় আইআরজিসির নির্দেশনায় ৩০টির বেশি ড্রোন হামলার জবাবে ইরাকের পূর্বাঞ্চলে ‘একাধিক সন্ত্রাসী রসদ ও অস্ত্রের স্থাপনায়’ যৌথ হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব।
ইরান-সমর্থিত শিয়া মিলিশিয়াপ্রধান ইরাকের আধাসামরিক বাহিনী পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস (পিএমএফ) জানিয়েছে, ওই হামলায় তাদের অন্তত ২০ সদস্য নিহত হয়েছেন।
ইরাকের প্রেসিডেন্সি পিএমএফের ঘাঁটিতে বোমা হামলার নিন্দা জানিয়ে একে ‘অগ্রহণযোগ্য হামলা’ এবং ‘ইরাকের সার্বভৌমত্বের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন’ বলে অভিহিত করেছে।
তবে ট্রাম্প ফক্স নিউজকে বলেছেন, এই হামলা ‘ইরাক সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করেই’ চালানো হয়েছে।
সুন্নি মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী দেশ সৌদি আরব এবং বিশ্বের বৃহত্তম শিয়া মুসলিম রাষ্ট্র ইরান কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তার নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জড়িয়ে আছে।
সূত্র : বিবিসি







