মোজতবা খামেনির অনুপস্থিতি নিয়ে ইরান কি বেকায়দায়?

ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি ২০১৬ সালের ২ মার্চ তেহরানে একটি বৈঠকে অংশগ্রহণ করছেন। ছবি : রয়টার্স
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ফেব্রুয়ারির শেষদিনে প্রয়াত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার এক সপ্তাহ পর ইরানের শীর্ষ নেতা হিসেবে তার মেজো ছেলে মোজতবা খামেনির নাম ঘোষণা করা হয়। তবে তখন থেকেই তিনি দেশবাসী ও বিশ্ববাসীর কাছে এক রহস্য হয়ে আছেন।
খামেনির প্রধান জানাজা ও দাফন অনুষ্ঠানেও তার অনুপস্থিতি এতটাই প্রকট ছিল যে, সেখান থেকে কোনো লিখিত বার্তাও পাওয়া যায়নি। ফলে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের ৪৭ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে অস্থির এই সময়ে সাধারণ মানুষ ইরানের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কেবল অনুমানের ওপর ভরসা করছে।
শক্তিশালী রেভল্যুশনারি গার্ডসের (আইআরজিসি) সমর্থনে দায়িত্ব নিলেও উচ্চপদস্থ সূত্রগুলো বলছে, সেই হামলায় মোজতবা মুখমণ্ডলের বিকৃতিসহ গুরুতর আঘাত পেয়েছেন।
তারা বলছেন, তিনি পর্দার আড়াল থেকে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু জনসমক্ষে আসার মতো শারীরিক সক্ষমতা এখনও ফিরে পাননি। বিশেষ করে চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে উত্তেজনা শুরু হওয়ার পর তার ভূমিকা ও স্বাস্থ্য এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইস্পাহানের ৪৭ বছর বয়সী এক দোকানদার তাকি মনে করেন, ‘আমি বুঝি যে নিরাপত্তা দৃষ্টিকোণ থেকে তার জনসমক্ষে আসা উচিত নয়। কিন্তু দেশ এখন এক অত্যন্ত কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘শীর্ষ নেতাকে দেখা যাওয়া এখন সময়ের দাবি। এমনকি তিনি যদি আহতও হন, তবুও মানুষের দেখা উচিত যে একজন নেতা আছেন এবং তিনি দেশ চালাচ্ছেন।’
গত বৃহস্পতিবারের দাফন অনুষ্ঠানে খামেনির অন্য তিন পুত্রকে কফিনের পাশে প্রার্থনা করতে দেখা গেছে, যা ইরানি নেতৃত্বের পারিবারিক ঘনিষ্ঠতাকে আবারও সামনে এনেছে।
মোজতবা খামেনির তিন ভাই রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী না হলেও তারা উচ্চপদস্থ আলেম। তবে ইরানের ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম রুহুল্লাহ খোমেনির নাতি আলী খোমেনি শুক্রবার একটি শোকসভায় মোজতবার পক্ষে বক্তব্য দেবেন, যা ধর্মীয় ব্যবস্থায় ধারাবাহিকতা বজায় রাখার একটি কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গত ৮ মার্চ শীর্ষ ধর্মীয় পরিষদ মোজতবার নিয়োগের পর থেকে এখন পর্যন্ত তার কোনো নতুন ছবি বা ভয়েস রেকর্ডিং প্রকাশ করা হয়নি। ইরানের উচ্চপদস্থ সূত্রগুলো এর পেছনে স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার কারণকে দায়ী করেছে।
উল্লেখ্য, কূটনৈতিক প্রচেষ্টার আড়ালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনীর অঘোষিত হামলায় তার বাবা নিহত হওয়ার পর থেকে নিরাপত্তার ঝুঁকি এখন বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
সেন্ট অ্যান্ড্রুজ ইউনিভার্সিটির আধুনিক ইতিহাসের অধ্যাপক আলী আনসারির মত, যখন উত্তরসূরি নিজেই নেই, তখন কীভাবে একটি ক্যারিশম্যাটিক উত্তরাধিকার সম্ভব? তারা এখন এটি চালিয়ে নিতে পারলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি তাদের জন্য সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে। এটি টেকসই নয়।
তেহরানের ৫১ বছর বয়সী শিক্ষক মোহাম্মদরেজা বলেছেন, শীর্ষ নেতার অনুপস্থিতি এখন যুদ্ধের সমাপ্তির পর দেশজুড়ে অনিশ্চয়তা ও বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে, বিশেষ করে প্রয়াত নেতার দাফনের পর।
ইরানের শাসন ব্যবস্থায় শীর্ষ নেতার পদটি অন্য যে কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের চেয়ে আলাদা। দেশটির সরকারি আদর্শ অনুযায়ী, এই পদের অধিকারী ব্যক্তি পৃথিবীতে শিয়া ইসলামের দ্বাদশ ইমামের প্রতিনিধি হিসেবে স্বীকৃত। মোজতবা খামেনি এই বিশাল দায়িত্ব কীভাবে পালন করবেন তা এখনো অস্পষ্ট। কারণ তার দাদা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি ছিলেন বিপ্লবের এক অনন্য ক্যারিশম্যাটিক ব্যক্তিত্ব। অন্যদিকে তার বাবা আলী খামেনি ৩৭ বছরের শাসনামলে রেভল্যুশনারি গার্ডসের সহায়তায় প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
মোজতবা খামেনিরও বড় কোনো ধর্মীয় বা রাজনৈতিক পরিচিতি নেই। তিনি মূলত তার বাবার বিশাল কার্যালয় এবং দেশের বিভিন্ন নেটওয়ার্ক তদারকি করতেন এবং গার্ডসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন।
যদিও প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান গত মে মাসে বলেছিলেন যে নেতার অবস্থার উন্নতি হচ্ছে, তবুও দেশটির অর্থনীতি যখন নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত এবং অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ দানা বাঁধছে, তখন নতুন নেতা মোজতবা খামেনি এখনো বিশ্ববাসীর কাছে এক ‘গোপন সংকেত’ হিসেবেই রয়ে গেছেন।
সূত্র : রয়টার্স




