সৌদি আরবে সেনা পাঠাচ্ছে ফ্রান্স
- মক্কা চুক্তির পরীক্ষা শুরু হুতি ঠেকাতে সহায়তার পথ খুঁজছে পাকিস্তান-তুরস্কও
- নিউ ইয়র্কে জরুরি সামরিক বৈঠক, বৃহত্তর মুসলিম নিরাপত্তা কাঠামোর প্রশ্ন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
লোহিতসাগরের তীরে ইয়ানবুতে এখন শুধু তেলের ট্যাংক আর পাইপলাইনের পাহারা নয়, পাহারা দেওয়া হচ্ছে বিকল্প জ্বালানি পথকে। হরমুজে অনিশ্চয়তা, বাব আল-মান্দেবে হুতিদের প্রভাব আর সৌদি শহরগুলোর দিকে ছুটে আসা ক্ষেপণাস্ত্র মিলিয়ে বন্দরটি হয়ে উঠেছে আঞ্চলিক যুদ্ধের নতুন স্নায়ুকেন্দ্র। সেই জায়গা রক্ষায় এবার সেনা পাঠাচ্ছে ফ্রান্স। সহায়তার পথ খুঁজছে পাকিস্তান-তুরস্কও।
গতকাল শুক্রবার এক প্রতিবেদনে আলজাজিরা জানিয়েছে, ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ বলেছেন, ইয়ানবুতে ‘সেনা, রাডার এবং প্রতিরক্ষাব্যবস্থা’ পাঠাবে প্যারিস। তার ভাষায়, উদ্দেশ্য ‘কোনো সংঘাতে নিজেদের জড়ানো নয়; বরং স্থাপনাটি রক্ষা করা।’ ইয়ানবুতে তেল সংরক্ষণ ও পরিশোধন স্থাপনা রয়েছে। পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন দিয়ে দিনে সর্বোচ্চ ৭০ লাখ ব্যারেল তেল এই বন্দরের দিকে নেওয়া যায়।
হুতিরা গত বৃহস্পতিবার ইয়ানবুতে সৌদির সবচেয়ে বড় তেলক্ষেত্র আরামকোর স্থাপনা এবং রিয়াদে একটি ‘সংবেদনশীল লক্ষ্যবস্তুতে’ হামলার দাবি করে। সৌদি জোট বলেছে, তায়েফ ও ইয়ানবুর দিকে ছোড়া ছয়টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির নিশ্চিত তথ্য নেই। হরমুজে চলাচল বিঘ্নিত থাকায় সৌদি আরব ইয়ানবুমুখী রপ্তানি পথের ওপর বেশি নির্ভর করছে। ফলে সেখানে হামলা এখন শুধু সৌদি নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়, বৈশ্বিক তেল সরবরাহেরও উদ্বেগ।
এর মধ্যেই নিউ ইয়র্কে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান, পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার এবং তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বৈঠক করেছেন। আরব নিউজের গতকালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আলোচনায় ছিল মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির সচিবালয়, কমিটি ও কর্মগোষ্ঠী গঠন এবং সেনাপ্রধানদের ‘জরুরি বৈঠক’ আয়োজন।
চুক্তির আলোচিত ধারা বলেছে, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। তিন মন্ত্রী মক্কা এবং সৌদি আরবের বেসামরিক ও অর্থনৈতিক স্থাপনায় হামলার ‘কঠোর নিন্দা’ জানিয়েছেন এবং জাতিসংঘ সনদের ৫১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সৌদির আত্মরক্ষার অধিকারের কথা বলেছেন। তবে কী ধরনের সামরিক বা কারিগরি সহায়তা দেওয়া হবে, তা এখনো ঘোষণা করা হয়নি।
মক্কা চুক্তি সই হয়েছিল ৭ আগস্ট। ৩১ আগস্ট ইস্তাম্বুলে কৌশলগত রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, সৌদি আরবে স্থায়ী সচিবালয় হবে এবং প্রথম তিন বছর পাকিস্তানের একজন মহাসচিব নেতৃত্ব দেবেন। যৌথ প্রশিক্ষণ, প্রতিরক্ষা শিল্প, প্রযুক্তি উন্নয়ন, যৌথ উৎপাদন এবং তিন দেশের বাহিনীর সমন্বয় বাড়ানোর কথাও রয়েছে। সরকারি বিবৃতিতে ‘সমষ্টিগত প্রতিরোধ’ শক্তিশালী করার পাশাপাশি ‘টেকসই শান্তি ও স্থিতিশীলতা’, উত্তেজনা প্রশমন এবং সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানকে সামনে রাখা হয়েছে।
এ জায়গাতেই চুক্তিটির ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে। বাংলাদেশেও আলোচনা হচ্ছে, কাঠামোটি ভবিষ্যতে তিন দেশের বাইরে গিয়ে আরও বিস্তৃত মুসলিম নিরাপত্তা জোটে রূপ নিতে পারে কি না। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান আগেই বলেছেন, চুক্তি বিস্তৃত হলে এটি মুসলিম বিশ্বের জন্য একটি ‘আত্মরক্ষার ব্যবস্থা’ হয়ে উঠতে পারে। ইরানকে ভবিষ্যৎ কাঠামোয় যুক্ত করার সম্ভাবনাও কিছু আঞ্চলিক বিশ্লেষণে আলোচিত হয়েছে, তবে সৌদি আরব, পাকিস্তান বা তুরস্ক কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত জানায়নি। ফলে বিষয়টি এখনো সম্ভাবনা ও বিশ্লেষণের পর্যায়ে।
এদিকে তীব্র হয়েছে ইয়েমেনের লড়াইও। হুতিরা মখা বন্দর ও লোহিতসাগরের কয়েকটি কৌশলগত এলাকায় অবস্থান শক্ত করেছে। জাতিসংঘের হিসাবে সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে ২ লাখ ৩০ হাজারের বেশি মানুষ নতুন করে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ইয়েমেনের ভাইস প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ আবদুল কাদের আল-আলিমি-বাওজের অভিযোগ, হুতিরা নৌচলাচলের নিরাপত্তাকে ‘ব্ল্যাকমেইলের হাতিয়ার’ বানিয়ে ‘পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতিকে জিম্মি করছে।’
তেলের বাজারেও চাপ স্পষ্ট। বৃহস্পতিবার ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেল ৩ শতাংশের বেশি বেড়ে একপর্যায়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৮ ডলার ছাড়ায়, গতকাল সকালে তা ১০৫ দশমিক ৭৭ ডলারে নামে। স্পার্টা কমোডিটিজের জুন গোহের সতর্কতা, ‘স্পষ্ট সমাধান না থাকায় বিশ্ব জুড়ে তেলের মজুদের ঘাটতি আরও বড় হচ্ছে।’
ইয়ানবুর আকাশে তাই এখন শুধু সৌদি প্রতিরক্ষার পরীক্ষা নয়, মিত্রতারও পরীক্ষা। ফরাসি সেনা ও রাডার তাৎক্ষণিক ঢাল তৈরি করবে, আর মক্কা চুক্তি দেখাবে কাগজে লেখা যৌথ প্রতিরক্ষা বাস্তব হামলার মুখে কতটা কার্যকর। সেই ফল রিয়াদ ছাড়িয়ে লোহিতসাগরের নৌপথ, তেলের বাজার এবং বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সমীকরণেও ছাপ ফেলবে।



