সরকার বিলুপ্তি
হামাসের ‘ত্যাগ’ কি গাজায় স্থায়ী শান্তি আনবে

টেকনোক্র্যাট প্রশাসনের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করতে তারা প্রস্তুত হামাস- রয়টার্স
গাজায় নিজেদের সরকার বিলুপ্ত ঘোষণা করেছে হামাস। এর মধ্য দিয়ে ২০০৭ সাল থেকে চলা তাদের গাজা শাসনের বেসামরিক ধাপের অবসান ঘটল। এখন একটি ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট প্রশাসনের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করতে তারা প্রস্তুত বলেও জানিয়েছে।
হামাস কেন এই সিদ্ধান্ত নিল?
হামাসের এই সিদ্ধান্ত মূলত একটি কৌশলগত ও রাজনৈতিক পদক্ষেপ। দীর্ঘ যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক চাপ এবং গাজার ভয়াবহ মানবিক সংকটের কারণে তারা বেসামরিক প্রশাসনের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে শান্তি পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত পূরণ করতে চেয়েছে। এর মাধ্যমে তারা আন্তর্জাতিক সহায়তা ও পুনর্গঠনের পথ সহজ করতে, ইসরায়েলের ওপর কূটনৈতিক চাপ বাড়াতে এবং প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে সরে এসে নিজেদের রাজনৈতিক ও সামরিক অবস্থান আলাদা রাখতে চাইছে।
অর্থাৎ, এটি হামাসের আদর্শগত পরিবর্তনের চেয়ে শান্তি প্রক্রিয়ায় নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার একটি বাস্তববাদী কৌশল বলেই বেশি মনে করা হচ্ছে।
গাজা শান্তি পরিকল্পনা
গাজা শান্তি পরিকল্পনা ২০ দফায় বিভক্ত। পরিকল্পনা আনুযায়ী এরই মধ্যে যুদ্ধবিরতি হয়েছে হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে। একে অন্যের মধ্যে বন্দি ও জিম্মি বিনিময়ও করেছে তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী গাজায় মানবিক সহায়তা বৃদ্ধির প্রস্তাব ছিল, যা আংশিকভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
এখন যে গুরুত্বপূর্ণ ধাপটি ছিল তা হলো হামাসের সরকার বিলুপ্ত করা। আজ হামাস মূলত এই লিখিত ধাপটিই সম্পন্ন করল। যা গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে আরও এক ধাপ অগ্রগতি।
এর পর কী?
শান্তি পরিকল্পনা অনুযায়ী পরবর্তী ধাপে গাজার শাসনভার একটি ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট প্রশাসনের হাতে তুলে দিতে হবে হামাসকে। যা এরই মধ্যে করতে সম্মত হয়েছে হামাস। যদিও আপাতত মন্ত্রণালয়গুলো এবং তাদের নিয়োগ দেওয়া কর্মকর্তারা দায়িত্বে বহাল থাকবেন বলেও জানিয়েছে তারা।
এর পরবর্তী ধাপটিই হলো সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল। হামাসের নিরস্ত্রীকরণ।
এর আগে হামাস একাধিকবার এখনই তাদের অস্ত্র সমর্পণ করবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে। নিরস্ত্রকরণের দাবি প্রত্যাখ্যান করে সংগঠনটি জানিয়েছিল, তাদের সামরিক সক্ষমতা বা অস্ত্রের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নির্ধারিত হবে অন্য ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে।
আজ সরকার বিলুপ্ত করেও হামাস বলেছে গাজার নিরাপত্তা ও পুলিশের দায়িত্ব তারা তাদের কাঁধেই রাখবে। এতে প্রায় নিশ্চিত, হামাসের নিরস্ত্রীকরণ এখনো অনেক দূরের পথ।
ইসরায়েল আগেই জানিয়েছে, হামাস পুরোপুরি নিরস্ত্র না হলে গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে না।
তাই যদি নিরস্ত্রীকরণের বিষয়ে গ্রহণযোগ্য সমঝোতা না হয়, তাহলে প্রশাসন বদলালেও থেমে যেতে পারে শান্তিপ্রক্রিয়া।
হামাসের ভবিষ্যৎ
হামাসের ভবিষ্যৎ এখন মূলত শান্তি পরিকল্পনার বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করছে। তারা গাজার প্রশাসনিক সরকার থেকে সরে দাঁড়ালেও রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে টিকে থাকতে পারে। ভবিষ্যতে নির্বাচনের মাধ্যমে আবার রাজনীতিতে অংশ নিতে পারে। আবার যদি নিরস্ত্রীকরণে সমঝোতা না হয়, তাহলে তারা একটি সশস্ত্র আন্দোলন হিসেবেই থেকে যেতে পারে, যদিও সরাসরি গাজার শাসন পরিচালনা করবে না।
অন্যদিকে, ফিলিস্তিনি জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হলে এবং নতুন রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে উঠলে হামাস সেই কাঠামোর অংশ হওয়ার সুযোগও পেতে পারে। সবচেয়ে ইতিবাচক সম্ভাবনা হলো, যদি তারা ধাপে ধাপে অস্ত্র ত্যাগে সম্মত হয় এবং শান্তিচুক্তির সব শর্ত বাস্তবায়িত হয়, তাহলে ভবিষ্যতে হামাস একটি সামরিক-রাজনৈতিক আন্দোলন থেকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক দলে রূপ নিতে পারে।
তবে এখন পর্যন্ত এ ধরনের কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা বা নিশ্চিত ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি, তাই তাদের ভবিষ্যৎ এখনো অনেকটাই পরবর্তী আলোচনা ও বাস্তব পদক্ষেপের ওপর নির্ভরশীল।
ঝুলছে গাজার ভাগ্য
গাজা শান্তি পরিকল্পনার ২০ দফার মধ্যে তুলনামূলকভাবে সহজ রাজনৈতিক ধাপগুলোয় অগ্রগতি হয়েছে। এখন শুরু হচ্ছে সবচেয়ে কঠিন নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ধাপগুলো।
এ ধরনের শান্তিপ্রক্রিয়া অত্যন্ত ভঙ্গুর। হামাসের আজকের ঘোষণার রাজনৈতিক গুরুত্ব আছে, কিন্তু এর সাফল্য নির্ভর করবে ঘোষণার পর বাস্তবে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয় তার ওপর।
এই পর্যায়ে ব্যর্থতা হলে পুরো শান্তিপ্রক্রিয়া আবার থমকে যেতে পারে, আর সফল হলে গাজার যুদ্ধ-পরবর্তী শাসন ও পুনর্গঠনের জন্য একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি হতে পারে।
হামাসের সরকার ভেঙে দেওয়ার ঘোষণা একটি কৌশলগত রাজনৈতিক পদক্ষেপ। যার মাধ্যমে হয়তো গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা প্রাণ পেতে পারে। তবে এর সফলতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে একটি প্রশ্নের ওপর— হামাস কি শুধু সরকার ছাড়বে, নাকি অস্ত্র ও নিরাপত্তা কাঠামো নিয়েও সমঝোতায় যাবে?






