নীরব সরকার
১৬ দিনের অনশনে সোনম ওয়াংচুনের ওজন কমল ৮.২ কেজি

সোনম ওয়াংচুক
দিল্লির যন্তর মন্তরে চলা ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) আন্দোলন যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই বাড়ছে উদ্বেগ। আন্দোলনের মুখ হয়ে ওঠা শিক্ষাবিদ ও পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুকের শারীরিক অবস্থার অবনতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। আন্দোলনকারীদের দাবি, অনশনের ১৬ দিনে ওয়াংচুকের ওজন কমেছে ৮.২ কেজি। রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নেমেছে ৬৭ এমজি/ডিএল-এ। এই পরিস্থিতিতে ভারত সরকারের নীরবতা নিয়ে বিরোধী দল এবং আন্দোলনকারীরা সরব।
সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে সোমবার বলেছেন, এটাকে অহংকারের লড়াইয়ে পরিণত করবেন না। এখানে মানুষের জীবন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তার দাবি, আন্দোলনকারীরা শুধু জবাবদিহি চাইছেন এবং পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করছেন।
যন্তর মন্তরে শুরু হওয়া এই আন্দোলনের সূত্রপাত ২০ জুন। নিটসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অনিয়ম এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় বহু ছাত্রছাত্রীর ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেই অভিযোগকে সামনে রেখেই কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ, পরীক্ষাব্যবস্থায় স্বচ্ছতা এবং আত্মহত্যা করা ছাত্রছাত্রীদের পরিবারের জন্য ১ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণের দাবি তুলেছে সিজেপি। ২৮ জুন আন্দোলনে যোগ দেন সোনম ওয়াংচুক এবং সেদিন থেকেই তিনি অনির্দিষ্টকালের অনশন শুরু করেন।
রবিবার অনশনের ১৫তম দিনে ওয়াংচুকের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সিজেপি জানায় তার রক্তচাপ নেমে এসেছে ১০৪/৬৬ এমএম এইচজি-এ এবং ওজন কমেছে ৭.৮ কেজি। সেই দিনই অভিজিৎ দীপকে সামাজিক মাধ্যমে প্রশ্ন তোলেন, সরকার কবে জাগবে? একদিন পর অর্থাৎ সোমবার নতুন স্বাস্থ্য বুলেটিনে জানানো হয়, ওয়াংচুকের মোট ওজন কমে ৮.২ কেজি হয়েছে। রক্তচাপ ছিল ১০৭/৭০ এমএম এইচজি-এ। আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, শারীরিক অবস্থার অবনতি সত্ত্বেও ওয়াংচুক তার অবস্থানে অনড় রয়েছেন।
এদিকে মহারাষ্ট্রের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী উদ্ধব ঠাকরে দাবি করেছেন, কয়েক দিন আগে তিনি ফোন করে সোনম ওয়াংচুককে অনশন প্রত্যাহারের অনুরোধ জানিয়েছিলেন। কিন্তু ওয়াংচুক নাকি তাকে জবাবে বলেছেন, আমার কিছু হলেও চলবে, কিন্তু দেশের ভালো হওয়া উচিত। সোমবার মুম্বইয়ে সাংবাদিক বৈঠকে উদ্ধব বললেন, এটি কোনো দলের নয়, দেশের তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যতের প্রশ্ন। তার অভিযোগ, ছাত্রদের সমস্যা ও পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগের তুলনায় রাজনৈতিক ভাঙাভাঙির রাজনীতিতে বেশি মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে। তিনি ২০ জুলাইয়ের কর্মসূচিতে সব রাজনৈতিক দল ও সাংসদদের অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান।
উদ্ধবের আরও দাবি, অনশন ১৬ দিনে পৌঁছলেও কেন্দ্রের পক্ষ থেকে কোনো ইতিবাচক উদ্যোগ দেখা যায়নি। ধর্মেন্দ্র প্রধানের পরিবর্তে অন্য কাউকে শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ করা হলে তাতে আপত্তির কিছু নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আন্দোলনের পাশে দাঁড়িয়েছে একাধিক রাজনৈতিক দল। সোমবার যন্তর মন্তরে যান আপ নেত্রী ও দিল্লির প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অতীশি। সিজেপির দাবি, তিনি আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য পরীক্ষাব্যবস্থার পক্ষে মত দেন এবং আন্দোলনকারীদের দাবিকে সমর্থন করেন।
সিপিআই(এম)-এর সাংসদ অমরা রাম এবং দলের অন্যান্য নেতাও আন্দোলনস্থলে উপস্থিত হয়ে সমর্থন জানান। এর আগে সমাজবাদী পার্টির সাংসদ পুষ্পেন্দ্র সরোজ, সিপিআই(এম)-এর নেত্রী কে কে শৈলজাসহ আরও কয়েকজন নেতা আন্দোলনকারীদের পাশে দাঁড়ান। শৈলজার দাবি, পরীক্ষায় জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। তার অভিযোগ, বারবার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটলেও তার যথাযথ ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। তিনি আন্দোলনকারীদের দাবির প্রতি সমর্থন জানান। এ ছাড়া আরও অসংখ্য বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতা, অভিনেতা, লেখক, শিল্পী এরই মধ্যে যন্তর মন্তরে গিয়ে তাদের পাশে থাকার বার্তা দিয়েছেন।
অন্যদিকে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলেও আন্দোলনের বার্তা ছড়িয়ে দিতে সক্রিয় রয়েছেন ওয়াংচুক। শনিবার প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেছেন, তাকে ‘আধুনিক গান্ধী’ বা নায়ক হিসেবে না দেখে সাধারণ নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করা হোক।
ওয়াংচুকের কথায়, অন্যের মধ্যে নায়ক খুঁজবেন না। নিজের জীবনের নায়ক নিজেই হোন। নাগরিক হিসেবে নিজের দায়িত্ব পালন করুন। একই সঙ্গে তিনি ২০ জুলাই সংসদ অভিযানে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান।
এখন আন্দোলনের পরবর্তী বড় কর্মসূচি ২০ জুলাই। সেদিনই সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা। সিজেপি এরই মধ্যে ২০ জুলাই যন্তর মন্তর থেকে সংসদ পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ মিছিলের ঘোষণা করেছে।
এদিকে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত এআইএসএর সদস্য নেহা, মনীশ, দীপক কুমার বর্মা ও আমিনও পৃথক মঞ্চে অনির্দিষ্টকালের অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের শারীরিক অবস্থারও অবনতি হয়েছে বলে সংগঠনের দাবি। যন্তর মন্তরের আন্দোলন যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর চাপ বাড়ছে। একদিকে অনশনকারীদের শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ, অন্যদিকে পরীক্ষাব্যবস্থায় জবাবদিহির দাবি - এই দুইয়ের মাঝে এখন সবার নজর ২০ জুলাইয়ের দিকে। সরকার আলোচনায় বসবে, নাকি আন্দোলন আরও তীব্র হবে- সেই উত্তরই খুঁজছে রাজনৈতিক মহল ও আন্দোলনকারীরা।




