বাংলাদেশি সন্দেহে পশ্চিমবঙ্গের চার পরিযায়ী শ্রমিক আটক
- পুলিশকে হাইকোর্টের ধমক

সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমবঙ্গের পরিযায়ী শ্রমিকদের ঘিরে উঠেছে একের পর এক অভিযোগ। কখনও ‘বাংলাদেশি’, কখনও ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ তকমা দিয়ে তাদের হেনস্থার অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। কাজের খোঁজে ভিনরাজ্যে যাওয়া শ্রমিকের পরিচয় কি শুধু ভাষা দিয়ে বিচার করা যায়? নাগরিকত্ব যাচাইয়ের নামে তাঁদের অপমান, আটক কিংবা ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠানোর অধিকারই বা কে দিল? বিজেপি সরকারের আমলে ‘বাংলাদেশি’ চিহ্নিত করার তৎপরতা নিয়ে বিরোধী দল ও মানবাধিকার কর্মীরা বারবার প্রশ্ন তুলেছেন। ২০২৫ সালে মহারাষ্ট্রে এক বাংলাভাষী মুসলিম শ্রমিককে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ থেকে শুরু করে ওড়িশা, অসম, রাজস্থান- সহ একাধিক জায়গায় একই ধরনের ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রশ্ন উঠছে, ভারতেরই নাগরিকদের কি শুধুমাত্র বাংলা বলা, পশ্চিমবঙ্গের ঠিকানা কিংবা মুসলিম পরিচয়ের কারণে সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে?
আর এবার সেই বিতর্কের মধ্যেই ফের সামনে এল মুর্শিদাবাদের চার পরিযায়ী শ্রমিকের ঘটনা। মুর্শিদাবাদ থেকে কাজের সন্ধানে ছত্তিশগড়ে গিয়েছিলেন একদল পরিযায়ী শ্রমিক। সেখানে তাঁদের ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে আটক করে ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠানোর অভিযোগ ওঠে পুলিশের বিরুদ্ধে। ২৩ জনের মধ্যে ১৯ জন শেষ পর্যন্ত মুক্তি পেয়ে বাড়ি ফিরলেও এখনও বন্দি চার শ্রমিক। তাঁদের নাম এসআইআর প্রক্রিয়ায় ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে আবেদন বিচারাধীন থাকলেও কেন তাঁদের নাগরিকত্ব নিয়ে অন্য একটি রাজ্যের প্রশাসনিক দফতর সিদ্ধান্তের পথে যাচ্ছে, তা নিয়েই প্রশ্ন তুলল কলকাতা হাইকোর্ট।
সোমবার বিচারপতি কৃষ্ণ রাওয়ের এজলাসে এই মামলার শুনানি হয়। আদালতের প্রশ্ন, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা যখন আইনি পথে আপিল করেছেন এবং সেই আবেদন এখনও নিষ্পত্তি হয়নি। তারপরেও তাঁরা ভারতীয় নাগরিক নন বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে কেন? ট্রাইব্যুনাল পরে যদি তাঁদের ভারতীয় নাগরিক বলে স্বীকৃতি দেয়, তাহলে এতদিনের প্রশাসনিক পদক্ষেপের দায় কে নেবে
আদালত ধমকের সুরে পুলিশের কাছ জানতে চায়, এসআইআর সংক্রান্ত আপিল বিচারাধীন থাকা অবস্থায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীন বিদেশি নিবন্ধন সংক্রান্ত দফতর বা ছত্তিশগড়ের পুলিশ কীভাবে একই ব্যক্তিদের নাগরিকত্ব নিয়ে আলাদা সিদ্ধান্তে এগোতে পারে। নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলে আদালত। বিচারপতির পর্যবেক্ষণে, একই বিষয়ে একাধিক সরকারি সংস্থার এমন পরস্পর বিরোধী অবস্থান গ্রহণযোগ্য নয়। মামলার পরবর্তী শুনানি বুধবার অর্থাৎ ৮ অক্টোবর।
ঘটনার সূত্রপাত হয় গত ৪ সেপ্টেম্বর। মুর্শিদাবাদের সুতি, সামশেরগঞ্জ ও রঘুনাথগঞ্জ এলাকার ২৩ জন শ্রমিক কাজের জন্য ছত্তিশগড়ের বিলাসপুরে গিয়েছিলেন। অভিযোগ, তাঁদের থানায় ডেকে পরিচয়পত্র দেখানোর পরও ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে আটক করা হয়। পরে তাদের ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠানো হয়। পরিযায়ী শ্রমিকদের দাবি, তাঁরা ভোটার কার্ড, আধার সহ বিভিন্ন নথি দেখিয়েছিলেন।
কিন্তু পরবর্তীতে প্রশাসনিক তৎপরতায় ১৯ জন মুক্তি পেলেও লাল্টু সেখ, নাসিরুদ্দিন সেখ, সফিকুল ইসলাম ও সাবির সেখ এখনও আটকে রয়েছেন বলে মামলায় জানানো হয়েছে। তাদের পরিবারের বক্তব্য যে, এসআইআর-এ নাম বাদ যাওয়াই এখন মুক্তির পথে প্রধান বাধা। অথচ সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেই তাদের আবেদন বিচারাধীন রয়েছে।
এই ঘটনায় শুরু থেকেই সরব ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যসভার সাংসদ সামিরুল ইসলাম। তাঁর অভিযোগ, প্রয়োজনীয় নথি থাকা সত্ত্বেও বাংলায় কথা বলা বা মুর্শিদাবাদের বাসিন্দা হওয়ার কারণে পরিযায়ী শ্রমিকদের ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহের মুখে পড়তে হচ্ছে। প্রশাসনিক স্তরে সমাধান না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হতে হয়েছে বলেও জানান তিনি।



