মুক্তিযুদ্ধের চিত্র ধারণ করা ভারতীয় আলোকচিত্রী রঘু রাই আর নেই

রঘু রাই। ফাইল ছবি
ভারতের অন্যতম খ্যাতিমান আলোকচিত্রী রঘু রাই আজ রবিবার নয়াদিল্লির একটি বেসরকারি হাসপাতালে মারা গেছেন। তার বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। রঘু রাইয়ের ছেলে নিতিন রাই সংবাদ সংস্থাকে জানিয়েছেন, তার বাবা গত দুই বছর ধরে মরণব্যাধি ক্যান্সারের সাথে লড়াই করছিলেন।
১৯৪২ সালে ব্রিটিশ ভারতের পাঞ্জাবের ঝাং এলাকায় (বর্তমানে যা পাকিস্তানে) জন্ম নিয়েছিলেন এই কিংবদন্তি। ১৯৬২ সালে বড় ভাই এস পলের হাত ধরে প্রথম ক্যামেরা হাতে তুলে নেন। সেই শুরু, এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। আশির দশকে যখন তিনি পুরোদমে কাজ শুরু করেন, তখন তার ছবি কথা বলতে শুরু করে।
১৯৬৫ সালে দিল্লির ‘দ্য স্টেটসম্যান’ পত্রিকায় যোগ দিয়ে পেশাদার ক্যারিয়ার শুরু করেন রঘু রাই। ১৯৬৮ সালের কথা, বিশ্বখ্যাত ব্যান্ড ‘দ্য বিটলস’ যখন ঋষিকেশে মহর্ষি মহেশ যোগীর আশ্রমে এসেছিল, রঘু রাই তখন সেখানে পৌঁছে গিয়েছিলেন তাদের ফ্রেমবন্দি করতে।
দীর্ঘ ছয় দশকের বেশি সময়জুড়ে তার ক্যামেরা শুধু ছবি তোলেনি, বরং নথিবদ্ধ করেছে সময়, ইতিহাস ও মানুষের যন্ত্রণাকে। রঘু রাই ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় শরণার্থী শিবির, সীমান্ত এলাকা এবং যুদ্ধের মানবিক বাস্তবতা ধারণ করেন ক্যামেরায়। এমনকি মুক্তিযুদ্ধকালে জীবনের ঝুকি নিয়ে তিনি বাংলাদেশে প্রবেশ করে এবং প্রত্যক্ষ যুদ্ধের দৃশ্য, চূড়ান্ত বিজয়ের পর বিজয়ী মুক্তিযোদ্ধাদের দেশে ফেরা ও পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের দৃশ্য তার ক্যামেরায় ধারণ করেছিলেন।
কিংবদন্তি এই আলোকচিত্রীর তোলা শরণার্থীদের দুর্দশা, অনাহার, ক্লান্তি ও সীমান্ত পেরিয়ে আশ্রয়ের জন্য ছুটে চলা মানুষের ছবি আলোড়ন তোলে বিশ্বজুড়ে। যা পরবর্তী সময়ে হয়ে ওঠে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক গুরুত্বপূর্ণ ভিজ্যুয়াল দলিল।
এরপর ১৯৭৬ সালে তিনি স্টেটসম্যান ছেড়ে যোগ দেন ‘সানডে’ ম্যাগাজিনে। ১৯৭৭ সালে বিশ্ববিখ্যাত ফরাসি আলোকচিত্রী অরি কার্তিয়ে-ব্রেসোঁ স্বয়ং তাকে বিখ্যাত ‘ম্যাগনাম ফটোস’ এর জন্য মনোনীত করেছিলেন।
১৯৮০ সালে তিনি ‘ইন্ডিয়া টুডে’ তে যোগ দেন। ১৯৮৪ সালের সেই ভয়াবহ ভোপাল গ্যাস দুর্ঘটনার বিভীষিকা তিনি তার ক্যামেরায় বন্দি করেছিলেন। শুধু ছবি তুলেই ক্ষান্ত হননি, এই দুর্ঘটনার প্রভাব নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি কাজ করেছেন এবং ‘এক্সপোজার: আ কর্পোরেট ক্রাইম’ নামে একটি কালজয়ী বইও লিখেছিলেন।
রঘু রাই ভারতের মানুষ, সংস্কৃতি আর শহর নিয়ে ১৮টিরও বেশি বই প্রকাশ করেছেন। তার তোলা ছবি টাইম, লাইফ, নিউইয়র্ক টাইমস আর দ্য নিউ ইয়র্কারের মতো বিশ্বসেরা সব পত্রিকায় দাপটের সাথে ছাপা হয়েছে। তবে আমাদের জন্য গর্বের বিষয় হলো ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সেই উত্তাল দিনগুলোর ছবি তুলেছিলেন তিনি। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তগুলো বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ১৯৭২ সালে ভারত সরকার তাকে ‘পদ্মশ্রী’ সম্মানে ভূষিত করে।
একজন সত্যিকারের শিল্পী হিসেবে রঘু রাই ক্যামেরা দিয়ে ইতিহাস লিখে গিয়েছেন। তার চলে যাওয়াটা আলোকচিত্র জগতের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।

