বিজেপির দুর্গে ‘ককরোচ’ ধাক্কা
- তরুণদের ক্ষোভ কি বদলে দেবে মোদির রাজনীতি?

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বিহারের পাটনায় ৪ আগস্ট রাতের একটি উপনির্বাচনের ফলই যেন নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে ভারতের রাজনীতিতে। প্রায় তিন দশক ধরে বিজেপির দখলে থাকা বাঁকিপুর বিধানসভা কেন্দ্রে জয় ছিনিয়ে নিয়েছে প্রশান্ত কিশোরের জন সুরাজ পার্টি। আরও তাৎপর্যের বিষয়, কয়েক মাস আগেও এই আসনটি ছিল বিজেপির জাতীয় সভাপতি নিতিন নবীনের দখলে। ১২ বছরে বিজেপির এমন ধাক্কা বিরল বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
এই ফলের মাত্র দুই সপ্তাহ আগেই, ছাত্রদের ৩৬ দিনের আন্দোলনের মুখে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেছিলেন। সেই আন্দোলনের অন্যতম মুখ ছিল ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ ইনস্টাগ্রামে জন্ম নেওয়া এক ব্যঙ্গাত্মক ছাত্রসংগঠন। গত মে মাসে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত বেকার তরুণদের ‘ককরোচ’ ও ‘পরজীবী’ বলে মন্তব্য করার পর থেকে এই নামকে হাতিয়ার করে আন্দোলন দানা বাঁধে। দিল্লি থেকে শুরু হয়ে দেশের একাধিক শহরে ছড়িয়ে পড়ে প্রতিবাদ। অথচ আন্দোলনকারীদেরই ‘দেশ ভাঙার জন্য তৈরি ভাইরাস ও ককরোচের দল’ বলে আক্রমণ করেছিলেন বিজেপির সভাপতি নিতিন নবীন। ৪ আগস্টের ফল সেই বক্তব্যকেই যেন উল্টো প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, তরুণদের এই ক্ষোভ কি নিছক একটি ছাত্র আন্দোলন, নাকি বিজেপির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কৌশলের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ?
আন্দোলনের তীব্রতা বাড়তেই বিজেপির তরফে তরুণদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা শুরু হয়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইনস্টাগ্রামে একের পর এক স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিও প্রকাশ করে প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রসঙ্গে কথা বলেছেন। দলের অন্দরে মন্ত্রীদের তরুণদের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যোগাযোগ বাড়ানোর পরামর্শও দেওয়া হয়। উত্তর প্রদেশে সরকারি আধিকারিকদের স্কুলে পাঠিয়ে পেশাগত পরামর্শ দেওয়ার উদ্যোগ নেয় বিজেপি। এমনকি প্রজন্মের নিজস্ব কথ্যভাষা ব্যবহার করে একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই প্রচেষ্টা নিয়ে ব্যঙ্গবিদ্রূপও কম হয়নি।
দিল্লির বিশ্লেষক অসীম আলির মতে, মূলধারার সংবাদমাধ্যমে বিজেপির প্রচারযন্ত্র এখনো শক্তিশালী। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, বিশেষত ইনস্টাগ্রামে, ফেসবুকে আগের মতো স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ তৈরি করতে পারছে না বিজেপি। তার মতে, ২০১১-২০১৪ সালের সময়ের তুলনায় এখন বিজেপির প্রচার অনেক বেশি নিয়ন্ত্রিত ও পরিকল্পিত বলে মনে হচ্ছে। প্যারিসের সায়েন্স পোর গবেষক গিল ভের্নিয়ের অবশ্য এটিকে বিজেপির নীতিগত পরিবর্তন নয়, বরং ‘ধারণার লড়াই’ বলেই দেখছেন। তার বক্তব্য, শিক্ষামন্ত্রী বদলালেও সরকারের মূল রাজনৈতিক অবস্থানে বড় পরিবর্তন হয়নি। বরং ‘দেশদ্রোহী’, ‘বিদেশি মদদপুষ্ট’ বা ‘সন্ত্রাসবাদী’ তকমা দিয়ে আন্দোলন দমনের যে পুরনো কৌশল বিজেপি নাগরিকত্ব আইনবিরোধী আন্দোলন কিংবা কৃষক আন্দোলনের সময়ে ব্যবহার করেছিল, এবার তা ততটা কার্যকর হয়নি। কারণ, ‘ককরোচ’ আন্দোলনের কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম বা সম্প্রদায়ের পরিচয় ছিল না। বিজেপির তথাকথিত উচ্চবর্ণ হিন্দু ভোটব্যাংকের তরুণদের একাংশও এতে যোগ দেয়। ফলে আন্দোলনটি হয়ে ওঠে তুলনামূলক জাতপাত ও ধর্মের সীমা ছাড়ানো এক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। ভের্নিয়েরের মতে, এই আন্দোলন মোদির তরুণদের ওপর স্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণের ধারণাকেও ধাক্কা দিয়েছে। তার কথায় ৭৫ বছরের প্রধানমন্ত্রীকে এই আন্দোলন তরুণ প্রজন্মের চোখে ‘বুমার’ হিসেবে তুলে ধরেছে।
তবে উপনির্বাচনের ফলকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিতে নারাজ রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। আগস্টের প্রথম সপ্তাহে বিজেপি-শাসিত দুই রাজ্য— বিহারের বাঁকিপুর এবং মধ্যপ্রদেশের দাতিয়ায় তিনটি উপনির্বাচনের মধ্যে দুটিতে হেরেছে দল। কিন্তু মোদির নিজের রাজ্য গুজরাটে মঙ্গলপুর আসনটি সহজেই ধরে রেখেছে বিজেপি। ফলে এই ফলকে সরাসরি ছাত্র আন্দোলনের প্রভাব বলা এখনো কঠিন। হরিয়ানার উদাহরণও রয়েছে— কৃষক আন্দোলনের পরও বিজেপি সেখানে পরে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রেখেছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, আম আদমি পার্টির অভিজ্ঞতা সামনে রেখে আন্দোলনকে সংগঠন হিসেবে ধরে রাখাই কৌশলগতভাবে বেশি কার্যকর হতে পারে। বিজেপি কি তবে হিন্দুত্বের রাজনীতি থেকে সরে এসে তরুণদের চাকরি ও শিক্ষাকে সামনে আনবে? বিশ্লেষক অসীম আলি তেমনটা মনে করেন না। তার আশঙ্কা, বিজেপি বরং হিন্দুত্বের রাজনীতিতে আরও জোর দিতে পারে। কিন্তু এখানেই ককরোচ জনতা পার্টির আসল চ্যালেঞ্জ। বিজেপির ক্ষমতা হয়তো এখনো অটুট, কিন্তু সেই ক্ষমতার প্রতি মানুষের আস্থা ও বৈধতার জায়গায় যে ফাটল তৈরি হয়েছে, তা মেরামত করা সহজ নয়।






