দমদম স্টেশনে উচ্ছেদ অভিযান, বুলডোজারের নিচে হারাল শত শত হকারের জীবিকা

উচ্ছেদ অভিযানে জীবিকা হারিয়েছেন শত শত হকার। ছবি: আগামীর সময়
কলকাতার দমদম রেল ও মেট্রো স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় উচ্ছেদ অভিযানে শত শত হকারের দোকান গুঁড়িয়ে দেওয়াকে কেন্দ্র করে ছড়িয়ে পড়েছে অনিশ্চয়তা ও ক্ষোভ। শনিবার গভীর রাতে চালানো এই অভিযানের পর রবিবার সকাল থেকে স্টেশন চত্বরে দেখা যায় ভাঙা দোকানের ধ্বংসস্তূপ, ছড়িয়ে থাকা মালপত্র ও ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো।
স্থানীয়দের ভাষ্য, স্টেশন চত্বরে ছোটবড় মিলিয়ে বুলডোজার দিয়ে উচ্ছেদ করা হয়েছে প্রায় ৫০০টি দোকান। এই অভিযানের বাইরে ছিল রেলের কাছ থেকে লিজ নেওয়া কয়েকটি দোকান। প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, উচ্ছেদের আগে এলাকা ঘিরে ফেলে রেলরক্ষী বাহিনী এবং পরে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় রাজ্য পুলিশ।
হকারদের অভিযোগ, দোকান সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ তো দেওয়া হয়নি, বরং বহু দোকানের মালপত্রও রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। সকালে অনেকে নিজেদের দোকানের ধ্বংসাবশেষের মধ্যে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েন। দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করা একাধিক হকার জানান, কয়েক দশকের উপার্জনের একমাত্র অবলম্বন হারিয়ে গেছে মুহূর্তেই।
দীর্ঘদিন স্টেশনের বাইরে সবজির ব্যবসা করা অশোক পুরকায়স্থ জানিয়েছেন, মেট্রো চালুর সময় থেকেই সেখানে ব্যবসা করছেন তিনি। তার ভাষায়, এত বছরের মধ্যে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে তা ভাবেননি। পরিবার কীভাবে চলবে, সেই অনিশ্চয়তা তাড়া করছে তাকে।
বনগাঁ থেকে প্রতিদিন ফল বিক্রি করতে আসা বৃদ্ধা পূর্ণিমা অধিকারী বলেছেন, এই দোকানের আয়েই চলত তার সংসার। তবে এক রাতের অভিযানেই সব শেষ হয়ে গেছে।
উচ্ছেদ ঘিরে রবিবার দমদমে বিক্ষোভ মিছিল করে শ্রমিক সংগঠন সিটু। সংগঠনের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, কোনো আলোচনার সুযোগ না দিয়েই অভিযান চালানো হয়েছে। প্রাক্তন সাংসদ তড়িৎ তোপদার ঘটনাস্থলে গিয়ে সময় চাইলেও রেল কর্তৃপক্ষ সাড়া দেয়নি বলেও অভিযোগ ওঠে। বিভিন্ন স্টেশনে বিক্ষোভ ও দাবিপত্র জমা দেওয়ার কর্মসূচি ঘোষণা করেছে পশ্চিমবঙ্গ রেলওয়ে হকার্স ইউনিয়ন। একাধিক শ্রমিক সংগঠনও দিয়েছে আন্দোলনের ডাক।
রেল কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য না করলেও প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, স্টেশন উন্নয়ন, যাত্রী চলাচল সহজ করা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই চালানো হয়েছে উচ্ছেদ অভিযান। দীর্ঘদিন ধরেই স্টেশন এলাকায় অবৈধ দখল সরাতে নোটিস দেওয়া হচ্ছিল বলেও দাবি তাদের।
তবে উচ্ছেদকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে পুনর্বাসন ও জীবিকার প্রশ্নে। সমালোচকদের মতে, স্টেশন উন্নয়ন ও আধুনিকীকরণের উদ্যোগের পাশাপাশি হকারদের পুনর্বাসনের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা না থাকায় হাজারো পরিবার পড়ছে অনিশ্চয়তার মুখে। হাওড়া ও শিয়ালদহসহ একাধিক স্টেশনে সাম্প্রতিক উচ্ছেদ অভিযান নিয়েও হয়েছে এমন বিতর্ক।
অর্থনীতিবিদদের মতে, হকাররা অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাদের উচ্ছেদের পরিবর্তে নিয়মের মধ্যে পুনর্বাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। কারণ উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা মানুষের জীবিকা ধ্বংস না করে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।





