যন্তর মন্তরে আবারও আন্দোলন
- জেন-জির পর এবার ‘সংরক্ষণ সংস্কার’-এর দাবিতে পথে অসংরক্ষিতরা

ফাইল ছবি
কিছুদিন আগেই জেন-জির আন্দোলনে উত্তাল হয়েছিল দিল্লির যন্তর মন্তর। সেই রেশ কাটতে না কাটতেই গত শুক্রবার ফের বিক্ষোভে শামিল হলো প্রতিবাদী জনতা। এবার আন্দোলনের কেন্দ্রে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস বা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ নয়— জাতিভিত্তিক সংরক্ষণব্যবস্থার সংস্কার এবং আর্থিক অবস্থাকে সরকারি সুযোগের অন্যতম প্রধান মাপকাঠি করার দাবি। ‘রিজার্ভেশন হটাও আন্দোলন’ এবং ‘রিজার্ভেশন রিফর্ম আন্দোলন’-এর ব্যানারে মূলত অসংরক্ষিত বা সাধারণ শ্রেণির তরুণ-তরুণীরা এ বিক্ষোভে যোগ দেন। আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়েছিল গত শুক্রবার যন্তর মন্তরে। এর সঙ্গে অন্যতম মুখ হিসেবে উঠে এসেছে নিট পরীক্ষার্থী হর্ষ দুবের নাম। দুবে আগস্ট গোড়াতেই জানিয়েছিলেন, তিনি সংরক্ষণব্যবস্থার সম্পূর্ণ বিরোধিতা না করে তার সংস্কারের দাবি তুলতে চান এবং ২১ আগস্ট যন্তর মন্তরে আন্দোলনে বসবেন।
শুক্রবার দুপুরের পর যন্তর মন্তরে জড়ো হন অসংখ্য ছেলেমেয়ে। বিহার, উত্তর প্রদেশ, কর্ণাটক, রাজস্থানসহ বিভিন্ন রাজ্য থেকে এসেছিলেন বিক্ষোভকারীরা। তাদের মধ্যে অধিকাংশই জাতিভিত্তিক সংরক্ষণ তুলে দেওয়ার দাবি জানালেন। আবার একটি অংশের বক্তব্য, সংরক্ষণ থাকলেও তার ভিত্তি হওয়া উচিত পরিবারের আর্থিক পরিস্থিতি, জাতি নয়। বিক্ষোভকারীদের স্লোগানের মূল সুর হলো— ‘রিজার্ভেশন ফর দ্য পুওর, নট ফর কাস্ট’। তাদের যুক্তি, একই রকম আর্থিক দুরবস্থায় থাকা দুজন পড়ুয়ার মধ্যে শুধু জাতিগত পরিচয়ের কারণে একজন যদি সরকারি সুবিধা পান এবং অন্যজন না পান, তা হলে ব্যবস্থাটির পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন। শিক্ষা, সরকারি চাকরি, কোচিং, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি এবং সরকারি সহায়তায় আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া পরিবারগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি ওঠে।
শুধু সংরক্ষণ নয়, ইউজিসির ইক্যুইটি রেগুলেশনস নিয়েও আপত্তি তোলেন আন্দোলনকারীরা। তারা এ নিয়ম প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি এসসি বা এসটি (প্রিভেনশন অব অ্যাট্রোসিটিজ) অ্যাক্ট নিয়েও আপত্তি ওঠে। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, আইনটির অপব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে। তাই তারা এর প্রত্যাহার বা পরিবর্তনের দাবি তোলেন। এই আন্দোলনে যোগ দেন জেনারেল সেনা, চাণক্য সেনা এবং কারনি সেনার সদস্যরাও। সোশ্যাল মিডিয়াব্যক্তিত্ব অজিত ভারতীকেও বিক্ষোভস্থলে দেখা যায়। আন্দোলনকারীদের মধ্যে কেউ কেউ হনুমান চালিশা পাঠ করেন এবং ‘সিয়াবর রামচন্দ্র কি জয়’ স্লোগান দেন। তবে আন্দোলনের শুরু থেকেই সৃষ্টি হয় অনুমতি নিয়ে বিতর্ক। দিল্লি পুলিশের দাবি, যন্তর মন্তরে গত শুক্রবারের এই বিক্ষোভের জন্য কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি। গত বৃহস্পতিবার দিল্লি পুলিশের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে বলা হয়েছিল, সংরক্ষণ সংস্কার নিয়ে যন্তর মন্তরে কোনো মিছিল, বিক্ষোভ বা জমায়েতের অনুমতি দেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে ওই এলাকায় বিএনএসএসের ধারা ১৬৩-এর অধীনে নিষেধাজ্ঞা জারি ছিল, যেখানে পাঁচ বা তার বেশি মানুষের জমায়েত নিষিদ্ধ।
অন্যদিকে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের জন্য রামলীলা ময়দানে সর্বোচ্চ ৫০০ জনের শান্তিপূর্ণ জমায়েতের অনুমতি দেয়, যার সময়সীমা ছিল বিকাল ৪টা পর্যন্ত। কিন্তু আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, তারা এক মাস আগে যন্তর মন্তরের জন্য অনুমতি চেয়েছিলেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে স্থান বদলে রামলীলা ময়দান নির্ধারণ করা হয়েছে। সেই সিদ্ধান্ত মানতে অস্বীকার করে তারা যন্তর মন্তরেই অবস্থান নেন। শুক্রবারের ঘোষিত কর্মসূচির পর গতকাল শনিবারও সংরক্ষণবিরোধী আন্দোলন ঘিরে তৎপরতা অব্যাহত ছিল। যদিও আন্দোলনটি ঠিক কত দিন চলবে, সে বিষয়ে আয়োজকদের তরফে এখনো নির্দিষ্ট সময়সীমা জানানো হয়নি। পরিস্থিতি সামলাতে যন্তর মন্তরে দিল্লি পুলিশ, র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স এবং ইন্দো-তিব্বতান বর্ডার পুলিশ মোতায়েন করা হয়। বসানো হয় ব্যারিকেডও। আন্দোলনকারীরা স্পষ্ট জানিয়ে দেন, তারা সেখান থেকেই তাদের দাবি জানাবেন এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে স্মারকলিপি না দেওয়া পর্যন্ত সরে যাবেন না। ফলে জেন-জির সাম্প্রতিক আন্দোলনের পর দিল্লির সেই পরিচিত প্রতিবাদস্থল যন্তর মন্তর আবারও হয়ে উঠল রাজনৈতিক, সামাজিক অসন্তোষের মঞ্চ। তবে এবার প্রশ্নটি কিন্তু আরও গভীর— ভারতের সংরক্ষণব্যবস্থার ভিত্তি কি জাতিগত পরিচয় থাকবে, নাকি আর্থিক ও সামাজিক বঞ্চনাকে নতুন করে মাপকাঠি করা হবে?






