পশ্চিমবঙ্গে সংখ্যালঘু খাতে বরাদ্দ কমানো নিয়ে বিধানসভায় বিতর্ক

আম জনতা উন্নয়ন পার্টির বিধায়ক হুমায়ুন কবির
পশ্চিমবঙ্গের নতুন বাজেটে সংখ্যালঘু উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ কমানোর অভিযোগকে কেন্দ্র করে বিধানসভায় ক্রমশ তীব্র হচ্ছে রাজনৈতিক বিতর্ক। বুধবার চলতি বাজেট অধিবেশনে বিরোধী শিবিরের পাশাপাশি একাধিক মুসলিম বিধায়কও সরব হয়েছেন এই ইস্যুতে। তাদের দাবি, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উন্নয়ন, শিক্ষা এবং সামাজিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে যে আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন, নতুন বাজেটে তার যথাযথ প্রতিফলন দেখা যায়নি।
বুধবার বিধানসভায় আলোচনায় অংশ নিয়ে আম জনতা উন্নয়ন পার্টির বিধায়ক হুমায়ুন কবির বলেছেন, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শক্তির প্রতি আস্থা রেখেছিল একসময়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই রাজনৈতিক সমীকরণে পরিবর্তন এসেছে। তার দাবি, সাম্প্রতিক নির্বাচনে মুসলিম ভোটের একটি অংশের সমর্থনও বর্তমান সরকারকে ক্ষমতায় আসতে সাহায্য করেছে। সেই প্রেক্ষাপটে সংখ্যালঘু উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ কমে যাওয়া হতাশাজনক।
হুমায়ুন কবির আরও বলেছেন, অকারণে সরকারের বিরোধিতা করতে চান না তিনি। সরকারের কোনো ইতিবাচক পদক্ষেপ থাকলে প্রশংসাও করা উচিত তার। তবে সমাজের কোনো অংশকে বঞ্চিত করা হলে তার বিরুদ্ধে বিধানসভার ভেতরে ও বাইরে প্রতিবাদ চালিয়ে যাবেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী বাজেটে এই বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করবেন অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত।
সংখ্যালঘু উন্নয়ন ও মাদ্রাসা শিক্ষার বরাদ্দ কমানোর প্রশ্নে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়ক গোলাম রব্বানিও। তার বক্তব্য, শিক্ষার সুযোগ ও সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই ধরনের সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একই সুর শোনা যায় তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষের বক্তব্যেও। তার ভাষ্য, পশ্চিমবঙ্গ দীর্ঘদিন ধরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ধর্মনিরপেক্ষ পরিবেশের জন্য পরিচিত। সেই কারণে সংখ্যালঘুদের শিক্ষা ও উন্নয়নসংক্রান্ত বিষয়গুলো আরও সংবেদনশীলতার সঙ্গে দেখা প্রয়োজন ছিল। বিশেষ করে মাদ্রাসা শিক্ষা খাতে বরাদ্দ কমানো হলে ভুল বার্তা যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মুর্শিদাবাদের বিধায়ক মোহতাব শেখও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার মতে, একটি সরকার ক্ষমতায় আসার পর সব সম্প্রদায়ের প্রতি সমান দায়িত্ব পালন করা উচিত। কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে উপেক্ষিত মনে হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়া কাম্য নয়। এর আগে মঙ্গলবার একই ইস্যুতে তীব্র সমালোচনা করেছিলেন ভাঙড়ের আইএসএফ বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকী। তার অভিযোগ, সরকার উন্নয়নের দাবি করলেও বাস্তবে সংখ্যালঘু উন্নয়ন খাতেই সবচেয়ে বেশি কাটছাঁট করা হয়েছে। নওশাদের দাবি, পূর্ববর্তী বাজেটে যেখানে সংখ্যালঘু উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ পাঁচ হাজার কোটি টাকারও বেশি ছিল, সেখানে নতুন বাজেটে তা প্রায় দুই হাজার কোটির ঘরে নেমে এসেছে। তার বক্তব্য, অন্যান্য বহু ক্ষেত্রে বরাদ্দ বৃদ্ধি পেলেও সংখ্যালঘু খাতে দেখা যাচ্ছে উল্টো চিত্র।
রাজ্যের বাজেট নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তৃণমূল বিধায়ক মদন মিত্রও। তার অভিযোগ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সংখ্যালঘু উন্নয়ন এবং সামাজিক সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোয় মানুষের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত বিষয়গুলোয় আরও জোর দেওয়া প্রয়োজন ছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে সংখ্যালঘু সংগঠনগুলোর একাংশ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাজেট নিয়ে। কলকাতার সমাজকর্মী সাবিনা ইয়াসমিন মনে করেন, সংখ্যালঘু উন্নয়ন মানে শুধু একটি সম্প্রদায়ের উন্নয়ন নয়, বরং শিক্ষার প্রসার, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আর্থ-সামাজিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষের ক্ষমতায়ন। এই খাতে বরাদ্দ কমে গেলে দীর্ঘমেয়াদে পড়তে পারে তার প্রভাব।
কলকাতার পার্ক সার্কাস এলাকার এক বাসিন্দা আব্দুল কাদেরের কথায়, সরকার যেই হোক, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো সবচেয়ে জরুরি। বাজেটে সেই বিষয়গুলোর ওপর বিশেষ নজর থাকা উচিত।





