বারুইপুর মুসলিম কিশোরী ধর্ষণ মামলায় ফের তদন্ত অফিসার বদল!

ফাইল ছবি
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার বারুইপুরের মুসলিম কিশোরী ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় তদন্তের মাঝপথে ফের বদল করা হল তদন্তকারী অফিসার। এবার মামলার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ডিএসপি পদমর্যাদার অফিসার শান্তনু মুখোপাধ্যায়ের হাতে। অল্প সময়ের মধ্যে একাধিকবার তদন্তের নেতৃত্বে পরিবর্তন হওয়ায় প্রশাসনের পদক্ষেপ ঘিরে নতুন করে জল্পনা শুরু হয়েছে রাজনৈতিক মহলে।
পুলিশ সূত্রে দাবি, মামলাটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একাধিক ঘটনা। শুধু ধর্ষণ ও খুন নয়, ঘটনার পর এলাকায় বিক্ষোভ, ভাঙচুর, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, গণপিটুনিতে এক অভিযুক্ত যুবকের মৃত্যু এবং ‘মূল অভিযুক্ত’ বলে চিহ্নিত প্রভাস মণ্ডলের পুলিশের গুলিতে মৃত্যুর ঘটনাও তদন্তের আওতায় রয়েছে। সেই কারণেই আরও অভিজ্ঞ আধিকারিককে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে প্রশাসনের ব্যাখ্যা।
ঘটনার পরই একটি বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিট গঠন করা হয়েছিল। প্রথমে এক আধিকারিকের হাতে তদন্তভার থাকলেও পরে তা অন্য এক অফিসারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এবার তৃতীয় দফায় তদন্তের দায়িত্ব গেল ডিএসপি পদমর্যাদার আধিকারিকের হাতে। প্রশাসনের বক্তব্য, তদন্তের কোনও দিক যাতে উপেক্ষিত না হয় এবং আদালতে শক্তিশালী মামলা উপস্থাপন করা যায়, সেই লক্ষ্যেই এই সিদ্ধান্ত।
এদিকে গণপিটুনিতে নিহত অভিযুক্ত ইন্দ্রজিৎ মণ্ডল মামলাতেও তদন্তে অগ্রগতি হয়েছে। পুলিশ শামিম আলি খান নামে আরও এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছে গণপিটুনির ঘটনার সঙ্গে যুক্ত থাকার সন্দেহে। তদন্তকারীদের দাবি, সিসিটিভি ফুটেজ এবং অন্যান্য তথ্যপ্রমাণ খতিয়ে দেখেই এই গ্রেপ্তার।
বারুইপুর কাণ্ড নিয়ে ইতিমধ্যেই রাজ্যজুড়ে তীব্র আলোড়ন তৈরি হয়েছে। নির্যাতিতার পরিবারের সঙ্গে দেখা করে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দ্রুত বিচার এবং কঠোর শাস্তির আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি প্রশাসনকে তদন্ত দ্রুত শেষ করার নির্দেশও দিয়েছেন বলে সরকারি সূত্রের দাবি।
তবে তদন্তকারী অফিসার বারবার বদল হওয়াকে কেন্দ্র করে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে বিরোধীরা। তাদের অভিযোগ, যদি তদন্ত সঠিক গতিতেই এগোচ্ছিল, তাহলে অল্প সময়ের মধ্যে বারবার দায়িত্ব বদলের প্রয়োজন কেন হল, তার জবাব দেওয়া উচিত সরকারের। বিরোধী নেতাদের একাংশের দাবি, এই ঘটনায় শুরু থেকেই প্রশাসনিক ব্যর্থতা নিয়ে মানুষের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। তাই তদন্তে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং নিয়মিত অগ্রগতির রিপোর্ট প্রকাশ করা জরুরি।
বিরোধীদের আরও অভিযোগ, শুধু অপরাধীদের গ্রেপ্তার করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। ঘটনার আগে এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কেমন ছিল, কোনও অভিযোগ উপেক্ষিত হয়েছিল কি না এবং পরবর্তী পরিস্থিতি সামলাতে কোথাও গাফিলতি ছিল কি না, তাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
এদিকে গণপিটুনিতে নিহত ইন্দ্রজিৎ মণ্ডলকে ঘিরেও বিতর্ক থামছে না। ঘটনার পর এলাকার মানুষ তাকে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার সঙ্গে জড়িত বলে সন্দেহ করে গণপিটুনি দেয়। পরে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী তাকে ‘নির্দোষ’ বলে উল্লেখ করেন। এমনকি মুখ্যমন্ত্রী ২৫ লক্ষ টাকার আর্থিক সাহায্যের চেক তুলে দেন তার পরিবারকে এবং তার দাদার হাতে চাকরির নিয়োগপত্রও দেন। সরকারের দাবি, একজন নির্দোষ মানুষ ভুল সন্দেহের শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন, তাই তার পরিবারের পাশে দাঁড়ানো প্রশাসনের দায়িত্ব।
তবে এই সিদ্ধান্ত নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে বিরোধীরা। তাদের বক্তব্য, তদন্ত এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি, চার্জশিটও জমা পড়েনি। সেই পরিস্থিতিতে কোন ভিত্তিতে একজনকে সরকারি স্তর থেকে ‘নির্দোষ’ বলা হচ্ছে, তা স্পষ্ট করা উচিত। বিরোধীদের দাবি, যদি পুলিশের কাছে এমন তথ্য থেকেই থাকে যে ইন্দ্রজিৎ ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন না, তাহলে সেই তথ্য জনসমক্ষে আনা হোক। একই সঙ্গে তাদের প্রশ্ন, একজনকে নির্দোষ ঘোষণা করে ক্ষতিপূরণ ও চাকরি দেওয়া সম্ভব হলে মূল অপরাধের তদন্তে এখনও কেন এত ধোঁয়াশা?




