মমতাকে কি তৃণমূল থেকে আলাদা করা সম্ভব?

টিএমসি কার্যালয়ে মমতা ব্যানার্জি। ফাইল ছবি
আদালতের অন্তর্বর্তী নির্দেশ, নির্বাচন কমিশনে টানাপড়েন, ২১ জুলাইয়ের কর্মসূচি নিয়ে দ্বন্দ্ব-সব মিলিয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। কিন্তু এই সমগ্র সংঘাতের কেন্দ্রে একটি প্রশ্ন ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে- তৃণমূল কংগ্রেসের সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যতই আইনি ও রাজনৈতিক লড়াই হোক, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কি সত্যিই তৃণমূল থেকে আলাদা করা সম্ভব?
সোমবার ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় নেতৃত্বাধীন শিবির দাবি করেছে, তাদের গঠিত কমিটিই বৈধ এবং আদালতের অন্তর্বর্তী পর্যবেক্ষণ সেই দাবিকে শক্তিশালী করেছে। অন্যদিকে কালীঘাট শিবির স্পষ্ট জানিয়েছে, এটি কোনো চূড়ান্ত রায় নয়; মামলার পরবর্তী শুনানি এখনো বাকি। ফলে আইনি লড়াইয়ের নিষ্পত্তি এখনো অনেক দূরের পথ।
তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এই বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক আদালতের কক্ষে নয়, জনমনে। কারণ তৃণমূল কংগ্রেসের জন্ম, বিস্তার এবং ক্ষমতায় ওঠার ইতিহাসের সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম এতটাই অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে যে দলকে তার থেকে পৃথক করে দেখানো সহজ নয়। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে রাজ্যের রাজনীতিতে তৃণমূলের মুখ, আন্দোলনের মুখ এবং ভোটের মুখ হিসেবে মমতাই ছিলেন প্রধান শক্তি।
এই কারণেই আদালতের অন্তর্বর্তী নির্দেশকে সামনে রেখে ‘আসল তৃণমূল’ নিয়ে যত দাবি উঠছে, তার সমান্তরালে রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রশ্নও উঠে আসছে। কোনও দল শুধু অফিস, নথি বা সাংগঠনিক কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; দলের পরিচয় গড়ে ওঠে কর্মী, সমর্থক এবং জনমানসে তার গ্রহণযোগ্যতার উপর। সেই জায়গায় মমতা এখনও সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক নাম।
আগামী ২১ জুলাইয়ের শহিদ দিবসকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাও সেই বাস্তবতাকে সামনে এনেছে। যে কর্মসূচি দীর্ঘদিন ধরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে পরিচিত, সেই অনুষ্ঠান ঘিরেই এখন দ্বন্দ্ব। এমনকি বিরোধী শিবির অর্থাৎ ঋতব্রত শিবির থেকেও তাঁকে আমন্ত্রণ জানানোর বার্তা সামনে এসেছে। আর এই ঘটনাই প্রমাণ করে যে মমতাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে তৃণমূলের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার দাবি করা সহজ নয়।
অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনকে লেখা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের চিঠি নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। কমিশনের ভূমিকা, সময়সীমা বৃদ্ধি এবং প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি সরাসরি লড়াইয়ের বার্তা দিয়েছেন। এতে স্পষ্ট, তিনি এই সংঘাতকে শুধুমাত্র সাংগঠনিক বিরোধ হিসেবে দেখছেন না; বরং রাজনৈতিক ও নৈতিক বৈধতার লড়াই হিসেবেও তুলে ধরছেন।
এখন নজর ৬ আগস্টের দিকে। আদালতে পরবর্তী শুনানি, নির্বাচন কমিশনের অবস্থান এবং দুই শিবিরের রাজনৈতিক শক্তি-প্রদর্শন- সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় সত্য সম্ভবত একটাই-তৃণমূলের ভিতরে যত বিভাজনই তৈরি হোক, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখনও এমন এক কেন্দ্রীয় চরিত্র, যাঁকে ঘিরেই বিতর্ক, সমর্থন, বিরোধিতা এবং ভবিষ্যতের হিসাব-নিকাশ আবর্তিত হচ্ছে।




