জ্ঞানেশ কুমারের উত্থান কীভাবে, কেন বিতর্কের কেন্দ্রে?

জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ চলছে ভারতে। ছবি: রয়টার্স
‘গণতন্ত্রের শত্রু’- দিল্লির বিক্ষোভ থেকে এখন এভাবেই চিত্রিত করা হয়েছে জ্ঞানেশ কুমারকে। ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার তিনি। তাকে ঘিরেই আন্দোলনে উত্তাল এখন দেশটি।
ভারতে নির্বাচন কমিশনের প্রধান নিয়োগে বিতর্কিত আইন প্রণয়নের পর জ্ঞানেশ কুমারই এই পদটিতে প্রথম নিয়োগ পান। অভিযোগ রয়েছে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়োগে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রভাব বাড়িয়েছে এই আইন।
১৯ মাস আগে নির্বাচন কমিশনের শীর্ষ পদে আসীন হওয়ার পর একের পর এক বিতর্ক তৈরি করে চলেছেন জ্ঞানেশ কুমার। একাধিক রাজ্যে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) নিয়ে বিরোধী দলের সমালোচনার মুখে রয়েছেন তিনি। অভিযোগ উঠছে, তিনি নির্বাচন কমিশনকে ক্ষমতাসীন বিজেপির সুবিধা দেওয়ার কাজে ব্যবহার করছেন।
নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশীকে পাশ কাটিয়ে নানা সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন জ্ঞানেশ কুমার। গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার তিনি এমন সব সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যা আগে জানানো হয়নি বলে সুখবীর ও বিবেক যোশীর অভিযোগ।
সব মিলিয়ে জ্ঞানেশ কুমারের কর্মকাণ্ডে ভারতে তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশনের স্বচ্ছতা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন।
আমলা থেকে সিইসি
জ্ঞানেশ কুমার ১৯৮৮ ব্যাচের কেরালা ক্যাডারের ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের (আইএএস) কর্মকর্তা। তিনি স্নাতক ডিগ্রি নিয়েছেন আইআইটি কানপুর থেকে। পরে অর্থনীতি বিষয়ে একটি কোর্স করেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে।
১৯৯০ সালে কেরালার পাঠানামথিট্টায় মহকুমা প্রশাসক হিসেবে জ্ঞানেশ কুমারের কর্মজীবন শুরু। রাজ্য সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে দায়িত্ব পালনের পর ২০১২ সালে দিল্লিতে কেরালা হাউসের আবাসিক কমিশনার হন তিনি।
তবে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাশ্মীর বিভাগে যুগ্ম সচিব হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর তার প্রশাসনিক কর্মজীবনে বড় পরিবর্তন আসে।
২০১৬ সালের মে মাসে তাকে ওই পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন রাজনাথ সিং। ওই সময়ে কাশ্মীরে হিজবুল মুজাহিদিনের কমান্ডার বুরহান ওয়ানির নেতৃত্বে সশস্ত্র তৎপরতা নতুন করে বাড়ছিল।
২০১৯ সালে অমিত শাহ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর জম্মু-কাশ্মীর পুনর্গঠন বিল প্রণয়নের কাজে যুক্ত হন জ্ঞানেশ কুমার। ওই আইনের মাধ্যমে জম্মু-কাশ্মীরকে ভেঙে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভাগ করা হয় এবং সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করা হয়। এটি ছিল রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) ও বিজেপির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক-আদর্শিক লক্ষ্য।
৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের পর কাশ্মীরের পরিস্থিতি সামলানো এবং নিরাপত্তা অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে জ্ঞানেশ কুমারের ভূমিকা অমিত শাহের আস্থা অর্জন করেছিল বলে মনে করা হয়।
এরপর তাকে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়। তা হলো অযোধ্যায় রামমন্দির নির্মাণের তত্ত্বাবধানকারী রাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্ট গঠন।
২০২০ সালে তার কর্মজীবনে সাময়িক ছন্দপতন ঘটে। ১৯৮৮ ব্যাচের ২৪ জন আইএএস কর্মকর্তাকে সচিব পদে নিয়োগের জন্য বিবেচনা করা হলেও সেই তালিকায় তাকে রাখা হয়নি। তবে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি আবার গুরুত্বপূর্ণ পদে ফিরে আসেন। তাকে সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব করা হয়। পরে অমিত শাহের অধীন নতুন সমবায় মন্ত্রণালয়েও দায়িত্ব পান তিনি।
প্রশাসনে জ্ঞানেশ কুমারের সহকর্মীরা বলছেন, কাজের বিষয়ে সবসময় আন্তরিক ছিলেন তিনি। কোনো কাজ ফেলে রাখার পক্ষপাতী ছিলেন না তিনি। তার সব কাজ করতেন ঠান্ডা মাথায়।
জ্ঞানেশ কুমারের দুই মেয়েও সরকারি চাকরিতে রয়েছেন। একজন আইএএস এবং অন্যজন ভারতীয় রাজস্ব পরিষেবার (আইআরএস) কর্মকর্তা। তাদের দুজনের স্বামীও আইএএস কর্মকর্তা।
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে অবসরে যাওয়ার দুই মাসেরও কম সময়ের মধ্যে জ্ঞানেশ কুমার নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পান। ১৫ মার্চ তার নিয়োগের পরদিনই লোকসভা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয়েছিল।
ব্যস্ত নির্বাচনী বছরে জম্মু-কাশ্মীরে ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের পর প্রথম বিধানসভা নির্বাচন ছাড়াও হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র, ঝাড়খন্ড ও দিল্লির নির্বাচন আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন জ্ঞানেশ কুমার।
কমিশনের জ্যেষ্ঠতম সদস্য হওয়ায় তার প্রধান নির্বাচন কমিশনার হওয়ার প্রত্যাশা ছিল। নতুন নিয়োগবিধি কার্যকর হওয়ার কথা মাথায় রেখে দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক মাস আগেই তিনি কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরামর্শ শুরু করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে তিনি প্রধান নির্বাচন কমিশনার হন।
নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুসারে, আগের প্রধান নির্বাচন কমিশনার রাজীব কুমারের সঙ্গে জ্ঞানেশ কুমারের কাজের ধরনে বড় পার্থক্য ধরা পড়ে। কমিশনের বৈঠকগুলোতে উত্তপ্ত আলোচনা জ্ঞানেশ কুমারের সময়েই সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়।
অনেকের চোখে, একসময় যে কর্মকর্তার দরজা সবার জন্য খোলা থাকত এবং যিনি অতিথিদের কাশ্মীরি পানীয় কাহওয়া পান না করিয়ে বিদায় দিতে চাইতেন না, তিনি এখন অনেক দূরের এক অবস্থানে পৌঁছে গেছেন।
কেন বিতর্কের মুখে নির্বাচন কমিশন?
জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের বিতর্কের মুখে এখন ভারতের নির্বাচন কমিশন।
তার বিরুদ্ধে বড় অভিযোগ, সান্ধু ও যোশীকে অন্ধকারে রেখে তিনি সব সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। তাদেব আপত্তি কানে তুলছেন না। নিজেদের উদ্বেগের কথা জানিয়ে সান্ধু ও যোশী মন্ত্রিপরিষদসচিবের কাছে অভিযোগও করেছেন।
প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে অভিযোগ গুরুতর বলে মনে করছেন বিরোধী দলের নেতারা। তারা সেই কারণে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি তুলেছেন।
অন্য দুই নির্বাচন কমিশনারের লিখিত আপত্তির প্রসঙ্গ তুলে বিরোধী নেতারা বলছেন, জ্ঞানেশ কুমার গণতন্ত্রের মৌলিক নীতি লঙ্ঘন করছেন।
জ্ঞানেশ কুমারকে ‘দেশদ্রোহী’ আখ্যায়িত করেছেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। তার ভাষ্যে, ভারতে গণতন্ত্র ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।
তবে এর প্রতিক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশন এক বিবৃতিতে বলেছে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক।
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) কার্যক্রম চলার মধ্যেই নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
কমিশনের দাবি, ভোটার তালিকায় যাতে কোনো অযোগ্য ব্যক্তির নাম না থাকে, তা নিশ্চিত করতেই এই উদ্যোগ।
বিরোধী দলগুলোর দাবি, এসআইআর কার্যক্রম নিয়েও দুই নির্বাচন কমিশনার আপত্তি জানিয়েছিলেন। কিন্তু তাদের আপত্তি উপেক্ষা করা হয়েছে।
গত আগস্টে নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু একটি নথিতে লিখেছিলেন, ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য ব্যবহৃত ফরম-৬-এ পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত ‘অননুমোদিত ও বেআইনি’। তিনি পরিবর্তনটি অবিলম্বে প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছিলেন বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে।
২০১৮ সালে ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব পালন করা ওপি রাওয়াত ফরম-৬-এ পরিবর্তনকে ‘সম্পূর্ণ ভুল ও বেআইনি’ বলে বর্ণনা করেছেন।
সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার এসওয়াই কুরেশিও বলেছেন, ফরম-৬-এ সংযোজন করতে হলে বিধিমালায় সংশোধন আনা প্রয়োজন। এ বিষয়ে বর্তমান দুই নির্বাচন কমিশনারের যুক্তি সঠিক।
বিরোধীদের অভিযোগ, ক্ষমতাসীন বিজেপিকে সুবিধা দিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ভোটার তালিকায় কারসাজি করছেন।
তবে বিজেপির বক্তব্য, নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে রক্ষা করা তাদের উদ্দেশ্য নয়; বরং কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন দল ভারতের গণতন্ত্রকে রক্ষা করার চেষ্টা করছে।
বিজেপির মুখপাত্র সম্বিত পাত্র রাহুল গান্ধীর ‘দেশদ্রোহ’ মন্তব্যেরও সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, কে প্রকৃতপক্ষে দেশদ্রোহ করছেন, তা দেখার জন্য গোটা দেশ অপেক্ষা করছে।
বিজেপির আরেক মুখপাত্র ও রাজ্যসভার সদস্য সুধাংশু ত্রিবেদী কংগ্রেস আমলে নির্বাচনী অনিয়মের অভিযোগ তুলে বিরোধীদের পাল্টা আক্রমণ করছেন।
ভারতের নির্বাচন কমিশন অতীতেও এ ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিল। এমনটি ঘটেছিল প্রধান নির্বাচন কমিশনার টি এন সেশনের সময়ে।
তখন ক্ষমতায় ছিল কংগ্রেসের নরসিমা রাও সরকার। দুই নির্বাচন কমিশনার এম এস গিল ও জি ভি জি কৃষ্ণমূর্তিকে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন সেশন।
বিষয়টি সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ায়। আদালত তখন নীতিগতভাবে স্পষ্ট করে দেয়, প্রধান নির্বাচন কমিশনার কমিশনের চেয়ারম্যান হলেও নির্বাচন কমিশন একটি যৌথ প্রতিষ্ঠান। অন্য কমিশনারদেরও সিদ্ধান্ত গ্রহণে অর্থবহ ভূমিকা রয়েছে।
২০০৯ সালেও প্রধান নির্বাচন কমিশনার এন গোপালস্বামীর সময়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। তিনি নির্বাচন কমিশনার নবীন চাওলাকে পক্ষপাতমূলক আচরণের অভিযোগে অপসারণের সুপারিশ করেছিলেন। কিন্তু সরকার সেই সুপারিশ প্রত্যাখ্যান করে। পরে গোপালস্বামীর স্থলাভিষিক্ত হন নবীন চাওলা।
২০১৯ ও ২০২৪ সালেও নির্বাচন কমিশনে মতবিরোধের ঘটনা ঘটেছিল। ওই দুই সময়ে নির্বাচন কমিশনার ছিলেন যথাক্রমে অশোক লাভাসা ও অরুণ গোয়েল।
তথ্যসূত্র : এনডিটিভি, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস





