ভারতের অদৃশ্য গণহত্যার নাম হিটওয়েভ

সংগৃহীত ছবি
মাত্র ৩৫ বছর বয়স, ভোর থেকে চেন্নাইয়ের নির্মীয়মাণ বহুতলের ছাদে কাজ করছিলেন পল্লি মহালক্ষ্মী। মাথার ওপর জ্বলন্ত অগ্নিপিণ্ডের মতো সূর্য, আর চারদিকে কংক্রিটের উত্তাপ। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শরীর নেতিয়ে পড়ে। সহকর্মীরা তৎক্ষনাৎ হাসপাতালে নিয়ে গেলেও তাকে বাঁচানো যায়নি। মহালক্ষ্মীর স্বামী কৃষ্ণা রাও এখনও বিশ্বাস করতে পারেন না এত দ্রুত সব শেষ হয়ে যাবে। স্ত্রীই ছিলেন সংসারের প্রধান ও একমাত্র ভরসা। দুই সন্তানকে নিয়ে এখন তার জীবন অনিশ্চয়তার মুখে। চিকিৎসকদের মতে, অতিরিক্ত গরমে দীর্ঘক্ষণ কাজ করার ফলেই মৃত্যু। অবশ্য সরকারি নথিতে সেই মৃত্যুর কারণ অন্যভাবে লেখা হয়েছে। ফলে দেশের তাপপ্রবাহে মৃতের সরকারি তালিকায় মহালক্ষ্মীর নাম কখনওই উঠবে না।এটাই ভারতের নির্মম বাস্তব - যেখানে চরম গরমে মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা আজও অজানা।
বিশেষজ্ঞদের মতে হিটস্ট্রোকে মৃত্যু প্রমাণ করা সহজ নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হৃদ্রোগ, কিডনি বিকল হওয়া, শ্বাসকষ্ট এবং অন্য শারীরিক জটিলতার কারণ দেখানো হয়। ফলে প্রকৃত কারণ আড়ালেই থেকে যায়।
বিগত কয়েক বছর যাবৎ ভারতের আবহাওয়ার চরিত্র দ্রুত বদলাচ্ছে। প্রত্যেক বছর রেকর্ড ভাঙছে তাপমাত্রা। বহু রাজ্যে পারদ ৪৮ থেকে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত ছুঁয়েছে। শহরগুলিতে কংক্রিটের বিস্তার, অরণ্য, গাছগাছালি কমে যাওয়া এবং বস্তি এলাকায় অপর্যাপ্ত বাসস্থান পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলছে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন নির্মাণ শ্রমিক, কৃষিশ্রমিক, রাস্তার হকার, ডেলিভারি কর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের জীবন। কাজ বন্ধ মানেই আয় বন্ধ তাই প্রাণের ঝুঁকি জেনেও তাদের রোদে নামতেই হয়। তাই মহালক্ষ্মীর মৃত্যু কোনও একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং তা এমন এক বাস্তবতার উদাহরণ, যেখানে তাপপ্রবাহে প্রাণহানির প্রকৃত ছবি সরকারি নথির আড়ালেই থেকে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি হিসাব ও বাস্তব চিত্রের ব্যবধান এতটাই বড় যে তা নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও গুরুতর প্রভাব ফেলছে।
গবেষকদের দাবি,সরকারি পরিসংখ্যান বাস্তব চিত্রের তুলনায় অনেক কম। কারণ অধিকাংশ রাজ্যেই তাপপ্রবাহজনিত মৃত্যু শনাক্ত করার কোনও একক এবং বাধ্যতামূলক পদ্ধতি নেই। কোথাও চিকিৎসকের রিপোর্টের উপর নির্ভর করা হয় আবার কোথাও মৃত্যুর সঙ্গে গরমের সম্পর্কই খতিয়ে দেখা হয় না। ফলে হাজার হাজার মৃত্যু নথিভুক্তই হয় না সরকারি খাতায়।
এই পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরাও। তাদের বক্তব্য, হিটস্ট্রোক কেবল একটি সমস্যা নয়। অতিরিক্ত গরম শরীরের প্রায় সমস্ত অঙ্গের উপর চাপ সৃষ্টি করে। ফলে আগে থেকেই অসুস্থ, বয়স্ক বা অপুষ্ট মানুষদের ক্ষেত্রে সেই ঝুঁকি আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। সম্প্রতি প্রকাশিত ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া এবং বার্কলের এক গবেষণাও সেই আশঙ্কাকেই জোরালো করেছে। গবেষণার অন্যতম সদস্য অশোক গাডগিল জানান যে, প্রকৃত মৃত্যুর চিত্র জানতে তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ভারত সরকারের কাছে তথ্য চেয়েছিলেন কিন্তু পূর্ণাঙ্গ তথ্য মেলেনি। সরকারি হিসাবে ২০২৪ সালে তাপপ্রবাহে ৪৬০ জন এবং ২০২৫ সালে ৮৪ জনের মৃত্যুর ঘটনা নথি রয়েছে। কিন্তু গবেষকদের দাবি প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি। সম্প্রতি প্রকাশিত দিল্লি সংক্রান্ত একটি রিপোর্টেও সতর্ক করা হয়েছে যে, ২০২৫ সালে রাজধানীতে 'ফিলস লাইক' বা অনুভূত তাপমাত্রা ৫২ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এই বছর কেন্দ্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ও প্রথমবারের মতো হিটওয়েভকে একটি জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে হিট অ্যাকশন প্ল্যান চালু হলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, তার কার্যকারিতা এখনও বাস্তবে সীমিত। কোথাও আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছয় না, কোথাও পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানীয় জল বা বিশ্রামকেন্দ্র পর্যন্ত নেই। নির্মাণক্ষেত্র ও কৃষিক্ষেত্রে দুপুরের প্রচণ্ড গরমে কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে অধিকাংশ শ্রমিকের পক্ষে তা মানা সম্ভব হয় না। কারণ কাজ না করলে মজুরিও নেই। এই সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে দারিদ্র্যতা । যাদের ঘরে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র নেই, পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ নেই, নিরাপদ বাসস্থান নেই কিংবা কাজের সময় বেছে নেওয়ার স্বাধীনতাটুকু নেই তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। জলবায়ু পরিবর্তনের আঘাত তাই সবার উপর সমানভাবে পড়ে না। সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হয় সমাজের প্রান্তিক শ্রমজীবী মানুষদের।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন কেবল তাপমাত্রার রেকর্ড প্রকাশ করলেই চলবে না। প্রয়োজন নির্ভুল মৃত্যুর তথ্য সংগ্রহ , চিকিৎসকদের এই বিষয়ে প্রশিক্ষণ, কর্মক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক নিরাপত্তাবিধি, কর্মক্ষেত্রে পর্যাপ্ত ছায়া ও বিশুদ্ধ পানীয় জলের ব্যবস্থা এবং গরিব শ্রমজীবী মানুষের জন্য কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা। নচেৎ প্রতি বছর গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যুও বাড়বে। অথচ সেই প্রাণহানির বড় অংশ সরকারি খাতায় অদৃশ্যই থেকে যাবে। মহালক্ষ্মীর বাড়িতে এখনও তার কাজের সরঞ্জাম পড়ে আছে। সন্তানদের চোখে আজও প্রশ্ন- মা কি সত্যিই শুধু গরমের জন্য মারা গেলেন? সেই প্রশ্নের উত্তর হয়তো তার পরিবার জানে। কিন্তু সরকারি পরিসংখ্যানে তিনি আর পাঁচজনের মতোই এক সাধারণ মৃত্যু। জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে ভারতের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কেবল তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ নয়। আসল চ্যালেঞ্জ হল সেই মানুষগুলিকে বাঁচানো যারা প্রতিদিন রোদের নিচে দাঁড়িয়ে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখেন।




