কেন পুরনো জলব্যবস্থায় ফিরছে ভারত

ভারতের যোধপুরের সংস্কার করা কূপ। ছবি : সংগৃহীত
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভারতে বাড়ছে পানির সমস্যা। এ সংকট মোকাবিলায় নতুন প্রযুক্তির বদলে অনেক সময় বহু শতাব্দী ধরে পরীক্ষিত পুরনো ব্যবস্থাই বেশি কার্যকর হতে পারে। এ কারণেই ভারত আবার পুরনো জলসংরক্ষণ পদ্ধতির দিকে ফিরছে। দেশটির বিভিন্ন এলাকায় সংস্কার করা হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী জলাধার ও পানি সংরক্ষণব্যবস্থার। স্থানীয় মানুষও এসব ব্যবস্থাকে নতুন করে কাজে লাগাচ্ছেন।
রাজস্থানের আলওয়ার শহরের মুসি রানি সাগর এমনই একটি উদাহরণ। এটি একটি প্রাচীন সিঁড়িঘাট। অর্থাৎ পানির কাছে যেতে ধাপে ধাপে নিচে নামতে হয়। ১৮০০-এর দশকের শুরুর দিকে তৈরি এই জলাধারটি প্রায় ১ দশমিক ৩ একর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত।
২০২১ সাল পর্যন্ত মুসি রানি সাগরে পানি থাকত অনিয়মিতভাবে। পানিও ছিল ব্যাপকভাবে দূষিত। কিন্তু সংস্কারের পর পরিস্থিতি বদলে গেছে। ২০২৫ সালে ৩০ বছরের বেশি সময় পর প্রথমবারের মতো জলাধারের পানি উপচে ফুটপাথে ওঠে।
এখন সেখানে সর্বোচ্চ ৩০ ফুট বা প্রায় ৯ মিটার গভীর পানি থাকে। আলওয়ারের ৬০ বছর বয়সী বাসিন্দা বিজয় সারস্বত বলেছেন, বছরের সবচেয়ে শুষ্ক সময়েও পানির গভীরতা ২০ ফুট বা প্রায় ৬ মিটারের নিচে নামে না।
জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে মুসি রানি সাগর দেখাচ্ছে, বহু পুরনো জ্ঞানও পানির সংকট মোকাবিলায় কাজে লাগতে পারে।
ভারতের বিভিন্ন এলাকার শত শত সম্প্রদায় এখন একই পথ অনুসরণ করছে। একসময় এসব ঐতিহ্যবাহী জলব্যবস্থাকে শুধু পুরনো স্থাপনা বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন হিসেবে দেখা হতো। এখন সেগুলোকে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার কার্যকর উপায় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
হারিয়ে যাওয়া জলব্যবস্থা ফিরছে
ভারতে বাওরি, জোহাদ, কুন্ড, টাঙ্কা ও নাদি নামে নানা ধরনের ঐতিহ্যবাহী জলব্যবস্থা রয়েছে। শত শত বছর ধরে গ্রামের মানুষ এসবের ওপর নির্ভর করেছেন।
গত প্রায় ২০০ বছরে এগুলোর অনেকগুলো ধীরে ধীরে ব্যবহার থেকে হারিয়ে যায়। পদ্ধতিগুলো ভিন্ন হলেও মূল উদ্দেশ্য ছিল একই। বৃষ্টির পানি আটকে রাখা এবং ধীরে ধীরে তা মাটির নিচে ঢোকার সুযোগ দেওয়া। এতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আবার পূরণ হয়।
এর মধ্যে বাওরি বা সিঁড়িঘাট সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন। পাথর দিয়ে তৈরি এসব স্থাপনার সিঁড়ি নেমে যায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পর্যন্ত।
সপ্তম শতক থেকে উনিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত ভারতের বিভিন্ন এলাকায় হাজার হাজার সিঁড়িঘাট তৈরি হয়েছিল। দিল্লি থেকে যোধপুর পর্যন্ত অনেক পুরনো সিঁড়িঘাট সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সংস্কার করা হয়েছে।
ভারতে বিশ্বের প্রায় ১৮ শতাংশ মানুষ বাস করে। কিন্তু বিশ্বের মোট মিঠা পানির মাত্র ৪ শতাংশ দেশটির হাতে। এর বড় একটি অংশ আবার দূষিত।
ভারত বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় বেশি ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করে। প্রায় ১৪০ কোটি মানুষের জীবন ও কৃষি অনেকটাই এই পানির ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় পানীয় জল ও সেচের বড় উৎস ভূগর্ভস্থ পানি।
সমস্যা হলো, অনেক এলাকায় প্রতিবছর যত পানি মাটির নিচ থেকে তোলা হচ্ছে, বৃষ্টির মাধ্যমে তার তুলনায় অনেক কম পানি আবার মাটির নিচে ঢুকছে।
জলবায়ু পরিবর্তন পরিস্থিতি আরও কঠিন করে তুলছে। তাপমাত্রা বাড়ায় মাটি দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে। আবার বৃষ্টিও হচ্ছে বেশি তীব্রভাবে। ফলে বৃষ্টির পানি ধীরে মাটিতে ঢোকার বদলে দ্রুত প্রবাহিত হয়ে চলে যাচ্ছে।
পুরনো ব্যবস্থার সুবিধা
আধুনিক খাল ও বাঁধও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কিছুটা পূরণ করতে পারে। তবে অনেক ক্ষেত্রে এগুলো ঐতিহ্যবাহী ব্যবস্থার মতো কার্যকর নয়।
খোলা জলাধারে সূর্যের তাপে অনেক পানি বাষ্প হয়ে যায়। সিঁড়িঘাটেও পুরোপুরি বাষ্পীভবন ঠেকানো সম্ভব নয়। তবে এসব ব্যবস্থা পানিকে মাটির গভীরে পৌঁছাতে সাহায্য করে। ফলে পানি সূর্যের তাপ থেকে কিছুটা সুরক্ষিত থাকে।
পরে আশপাশের কূপ বা হাতপাম্পের মাধ্যমে সেই পানি ব্যবহার করা যায়।
জোহাদ আরও সহজ একটি ব্যবস্থা। দেখতে অনেকটা অর্ধচন্দ্রাকৃতির ছোট মাটির বাঁধের মতো। বর্ষার পানি কিছু সময় আটকে রাখে এটি। পরে সেই পানি ধীরে ধীরে মাটির নিচে চলে যায়।
আলওয়ারে জোহাদ পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগ এরই মধ্যে বড় পরিবর্তন এনেছে।
আলওয়ারে জোহাদের সাফল্য
ব্রিটিশ শাসনের সময় আলওয়ারের পুরনো জোহাদভিত্তিক পানিব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়ে। অতিরিক্ত খনন ও গাছ কাটার কারণে বনভূমি নষ্ট হয়। পানির স্বাভাবিক প্রবাহের এলাকাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
একই সময়ে ভূগর্ভস্থ পানি তোলার জন্য বোরওয়েলের ব্যবহার বাড়তে থাকে।
১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে এলাকার নদীগুলো শুকিয়ে যেতে শুরু করে। কাজের সন্ধানে বহু পুরুষ শহরে চলে যান। গ্রামে মূলত নারী ও বয়স্করা থেকে যান।
পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয় যে সরকারের পক্ষ থেকে এলাকার কিছু অংশকে ‘ডার্ক জোন’ ঘোষণা করা হয়। অর্থাৎ সেখানে ভূগর্ভস্থ পানি যত দ্রুত জমা হচ্ছিল, তার চেয়ে বেশি পানি তুলে নেওয়া হচ্ছিল।
১৯৮৫ সালে আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক রাজেন্দ্র সিং আলওয়ারে আসেন স্বাস্থ্যকেন্দ্র করার পরিকল্পনা নিয়ে। কিন্তু গোপালপুরা গ্রামের মানুষের সঙ্গে কথা বলে তিনি বুঝতে পারেন, তাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা স্বাস্থ্য নয়, পানি।
তাই স্বাস্থ্যকেন্দ্র না করে তিনি জোহাদ তৈরির কাজ শুরু করেন।
প্রথম প্রকল্পের ফল দ্রুত দেখা যায়। ১৯৮৬ সালের বর্ষায় সংস্কার করা জোহাদটি পানিতে ভরে যায়। একই সময়ে গোপালপুরার বহু বছর ধরে শুকিয়ে থাকা কূপেও পানি ফিরে আসে।
পাশের গ্রামের মানুষও এই পরিবর্তন দেখে একই ধরনের কাজ শুরু করেন।
রাজেন্দ্র সিংয়ের প্রতিষ্ঠিত বেসরকারি সংস্থা তরুণ ভারত সংঘ তাদের সহায়তা করতে থাকে। এরপর উদ্যোগটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
১৯৯৪ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে আলওয়ার জুড়ে ১০ হাজারের বেশি পানি সংরক্ষণ কাঠামো তৈরি করা হয়। এর ফলে নদীগুলোয় সারা বছর পানি প্রবাহ ফিরে আসে। উপকৃত হন প্রায় ২৫০টি গ্রামের মানুষ।
রাজেন্দ্র সিং যখন আলওয়ারে আসেন, তখন বর্ষা ছাড়া প্রায় সারা বছর আরভারি নদী শুকিয়ে থাকত। ১৯৯৬ সালের গ্রীষ্মে কয়েক দশকের মধ্যে প্রথমবার নদীটিতে আবার পানি প্রবাহিত হতে দেখা যায়।
পরে এই উদ্যোগ রাজস্থানের ৭০০টির বেশি গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। একই সঙ্গে স্থানীয় গ্রামসভাগুলোও আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে।
সরকারি নীতিতেও পরিবর্তন
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ভারতের বিভিন্ন এলাকায় পুরনো জলব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে।
২০১০-এর দশকের শেষ দিকে একটি প্রকল্পের মাধ্যমে ৬ হাজারের বেশি গ্রামকে মাটি ও পানি সংরক্ষণের কাজে যুক্ত করা হয়।
প্রকল্পটি পরিচালনাকারী পানি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এসব উদ্যোগের মাধ্যমে ৫৫০ বিলিয়ন লিটারের বেশি পানি ধারণের সক্ষমতা তৈরি হয়েছে।
আধুনিক বোরওয়েল আর জোহাদের মধ্যে পার্থক্যও স্পষ্ট। বোরওয়েল মাটির নিচ থেকে পানি তুলতে পারে। কিন্তু সেই পানি আবার মাটির নিচে ফেরত দিতে পারে না।
অন্যদিকে হাতে তৈরি একটি জোহাদ তুলনামূলক কম খরচে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পূরণ করতে পারে। একবার তৈরি করার পর এটি বছরের পর বছর কাজ করতে পারে।
গবেষকদের মতে, স্থাপনাগুলো টিকে থাকলেও ব্রিটিশ শাসনের সময় এগুলো পরিচালনার স্থানীয় ব্যবস্থা ভেঙে দেওয়া হয়। পানি ব্যবহারের প্রচলিত অধিকারব্যবস্থাও দুর্বল হয়ে পড়ে।
ফলে জলাধারগুলো থেকে নিয়মিত পলি পরিষ্কার করার দায়িত্ব নেওয়ার মতো স্থানীয় ব্যবস্থাও আর থাকেনি।
স্বাধীনতার পর ভারত পানি উত্তোলন ও সরবরাহের জন্য আধুনিক অবকাঠামোয় বেশি বিনিয়োগ করে। বড় বাঁধ, খাল ও বিদ্যুৎচালিত বোরওয়েল তৈরি করা হয়।
১৯৫৪ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ভাকরা-নাঙ্গাল খাল ব্যবস্থা উদ্বোধন করেন। সেসময় এ ধরনের বড় প্রকল্পকে তিনি ‘নতুন ভারতের মন্দির’ বলেছিলেন।
তবে ভূগর্ভস্থ পানি দ্রুত কমে যাওয়ার বিপরীতে সেই পানি আবার মাটির নিচে ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা তৈরিতে তুলনামূলক কম গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এখন অবশ্য নীতিতেও পরিবর্তন এসেছে।
২০১৯ সালে ভারতের সরকার প্রতিটি গ্রামে জোহাদ, টাঙ্কা, বাওরি ও কুন্ডের মতো ঐতিহ্যবাহী জলব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত করার ওপর গুরুত্ব দেয়। আরেকটি সরকারি কর্মসূচির মাধ্যমে ৬৯ হাজার গ্রামীণ পুকুর তৈরি করা হয়েছে।
জাতীয় পর্যায়ে পুকুর, জলাধার ও পানি সংরক্ষণ কাঠামোর মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানি পুনর্ভরণের পরিমাণও বেড়েছে। ২০১৭ সালে এর পরিমাণ ছিল ১৪ বিলিয়ন ঘনমিটার। ২০২৪ সালে তা বেড়ে ২৫ বিলিয়ন ঘনমিটারে পৌঁছায়।
২০২০ সালে ভারত সরকার কৃত্রিমভাবে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পূরণের একটি বড় পরিকল্পনা নেয়। এতে ১ কোটি ৪০ লাখ বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও ভূগর্ভস্থ পানি পুনর্ভরণের কাঠামো তৈরির লক্ষ্য রাখা হয়েছে।
ধারণা করা হচ্ছে, এসব কাঠামো বর্ষাকালে প্রায় ১৮৫ বিলিয়ন ঘনমিটার পানি ধরে রাখতে পারবে।
মজার বিষয় হলো, এই পরিকল্পনায় যে ধরনের কাঠামোর কথা বলা হয়েছে, সেগুলোর অনেকগুলোই ভারতে শত শত বছর আগে মানুষ হাতে তৈরি করে রেখে গেছে।
পুরনো জ্ঞানই হতে পারে ভবিষ্যতের সমাধান
ভারতের প্রত্যন্ত গ্রামের এক বয়োজ্যেষ্ঠ বাসিন্দা বর্ষা বলেছেন, জোহাদ তৈরির আগে শুষ্ক মৌসুমে তার কূপে নিয়মিত পানি থাকত না। এখন সারা বছরই কূপে পানি থাকে।
তার মতে, নিয়মিত পলি পরিষ্কার করা দরকার। পাশাপাশি আরও জলসংরক্ষণ কাঠামো তৈরি করতে হবে। তাহলে কোনো একটি পানির উৎসের ওপর মানুষের অতিরিক্ত নির্ভরতা কমবে।
ভারতের সরকারি মরু গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্ট্রাল অ্যারিড জোন রিসার্চ ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানী প্রতাপ মহারানা বলেছেন, টাঙ্কা ও নাদির মতো ব্যবস্থার গুরুত্ব সম্পর্কে স্থানীয় মানুষের জ্ঞান কখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।
অনেক সম্প্রদায় এখনো নিজেদের প্রয়োজনেই এসব ব্যবস্থা তৈরি করে।
তার মতে, হারিয়ে গিয়েছিল মূলত রাজনৈতিক সদিচ্ছা। ঐতিহ্যবাহী জ্ঞানকে গুরুত্ব দিয়ে কাজে লাগানোর আগ্রহও কমে গিয়েছিল।
মুসি রানি সাগর সিঁড়িঘাট সংস্কার প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত এনভায়রনমেন্টালিস্ট ফাউন্ডেশন অব ইন্ডিয়ার প্রতিষ্ঠাতা অরুণ কৃষ্ণমূর্তি বলেছেন, শুধু অর্থ, প্রযুক্তি বা মাঠপর্যায়ের উদ্যোগ দিয়ে এসব জলব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।
তার মতে, মানুষের মধ্যে সামাজিক ও নাগরিক দায়িত্ববোধও থাকতে হবে।
ভারতের অভিজ্ঞতা তাই একটি বিষয় স্পষ্ট করে। পানির সংকট মোকাবিলায় ভবিষ্যতের সব সমাধান নতুন প্রযুক্তির মধ্যে নাও থাকতে পারে। বহু শতাব্দী ধরে টিকে থাকা স্থানীয় জ্ঞান ও জলব্যবস্থাকেও নতুন করে কাজে লাগানো সম্ভব।
সূত্র: বিবিসি







