ইতালিতে জন্ম নেওয়া সোনিয়া যেভাবে ভারতের রাজনীতির কেন্দ্রে

লোকসভায় ভোটদানের পর সাবেক কংগ্রেসের শীর্ষ নেত্রী সোনিয়া গান্ধী। ফাইল ছবি/ রয়টার্স
সোনিয়া গান্ধীর জন্ম ইতালির ভেনেতো অঞ্চলের ভিসেঞ্জার লুসিয়ানা শহরে, ১৯৪৬ সালের ৯ ডিসেম্বর। তবে তার বেড়ে ওঠা তুরিন শহরের কাছে ওরবাসানোতে।
১৯৬৪ সালে ইংরেজি শেখার জন্য যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজে যান সোনিয়া। সেখানেই পরিচয় হয় ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর সঙ্গে। ১৯৬৮ সালে তাদের বিয়ে হয়। বিয়ের পর সোনিয়া ভারতে চলে আসেন এবং ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর পরিবারের সদস্য হন।
তবে বিয়ের পর দীর্ঘদিন রাজনীতি থেকে দূরে ছিলেন সোনিয়া। ১৯৮৪ সালে ইন্দিরা গান্ধী হত্যাকাণ্ডের পর রাজীব গান্ধী ভারতের প্রধানমন্ত্রী হন। সেই সময়ও সোনিয়া সরাসরি রাজনীতিতে সক্রিয় হননি।
তার ইতালিতে জন্ম এবং ভারতীয় নাগরিকত্ব নিয়ে অবশ্য রাজনৈতিক বিতর্ক ছিল। বিরোধী দলের কয়েকজন নেতা তার বিদেশে জন্মের বিষয়টি তুলে ধরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। সোনিয়া ১৯৮৩ সালে ভারতীয় নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। পরে তিনি নির্বাচনে অংশ নিয়ে সংসদ সদস্য হন।
রাজীবের হত্যার পর বদলে গেল পরিস্থিতি
১৯৯১ সালে তামিলনাড়ুর শ্রীপেরুম্বুদুরে নির্বাচনী প্রচারণার সময় আত্মঘাতী হামলায় রাজীব গান্ধী নিহত হন। এরপর কংগ্রেসের একটি অংশ সোনিয়াকে দলের নেতৃত্বে আসার আহ্বান জানায়। তবে তিনি প্রথমদিকে রাজি হননি।
পরিস্থিতি বদলে যায় কয়েক বছর পর। ১৯৯৭ সালে সোনিয়া গান্ধী কংগ্রেসে যোগ দেন। পরের বছরই তিনি দলের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৯৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে জয়ী হয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় রাজনীতিতে নিজের অবস্থান তৈরি করেন।
এরপর ধীরে ধীরে কংগ্রেসের রাজনীতিতে তার প্রভাব বাড়তে থাকে। ১৯৯৮ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত টানা কংগ্রেস সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন তিনি। পরে ২০১৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত আবারও দলের সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন। ভারতের রাজ্যসভার সরকারি নথি অনুযায়ী, ২০২২ সালে সভাপতির পদ ছাড়ার পরও তিনি দলের অন্যতম জ্যেষ্ঠ নেতা হিসেবে সক্রিয় ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী না হয়েও ক্ষমতার কেন্দ্রে
সোনিয়া গান্ধীর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় আসে ২০০৪ সালে। ওই বছরের লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ জোট সরকার গঠন করে।
সোনিয়া গান্ধী নিজে প্রধানমন্ত্রী না হয়ে মনমোহন সিংকে প্রধানমন্ত্রী করার সিদ্ধান্ত নেন। এরপর ২০০৪ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ইউপিএ সরকারের সময় তিনি জোটের চেয়ারপারসন হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ভূমিকা পালন করেন।
অর্থাৎ তিনি কখনো ভারতের প্রধানমন্ত্রী হননি। কিন্তু এক দশক ধরে ক্ষমতাসীন জোটের রাজনীতিতে তার প্রভাব ছিল গুরুত্বপূর্ণ। একই সময়ে তিনি কংগ্রেসের নেতৃত্বও ধরে রেখেছিলেন।
এ সময়টিই সোনিয়া গান্ধীর রাজনৈতিক অবস্থানকে অন্য মাত্রা দেয়। ভারতের রাজনীতিতে তার ভূমিকা শুধু একটি দলের সভাপতির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। সরকার পরিচালনা ও জোটের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তেও তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ইতালিতে জন্ম নিয়ে ভারতীয় রাজনীতির শীর্ষে
সোনিয়া গান্ধীর রাজনৈতিক যাত্রার শুরু ভারতের রাজনীতি দিয়ে হয়নি। ইতালিতে জন্ম নেওয়া এই নারী প্রথমে রাজনীতি থেকে দূরেই ছিলেন। রাজীব গান্ধীর সঙ্গে পরিচয়, বিয়ে এবং পরে গান্ধী পরিবারের সদস্য হয়ে ওঠার মধ্য দিয়ে তার ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয়।
রাজীব গান্ধীর হত্যার পরও তিনি সঙ্গে সঙ্গে রাজনীতিতে আসেননি। কিন্তু কয়েক বছর পর কংগ্রেসে যোগ দিয়ে দলের নেতৃত্বে উঠে আসেন। ১৯৯৮ সালে কংগ্রেস সভাপতি হওয়ার পর প্রায় দুই দশক ধরে বিভিন্ন মেয়াদে দলের নেতৃত্ব দেন।
২০২৪ সালে তিনি রাজ্যসভার সদস্য নির্বাচিত হন। সরকারি নথি অনুযায়ী, তিনি রাজস্থানের প্রতিনিধিত্ব করছেন। এর আগে ১৯৯৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত টানা পাঁচ মেয়াদ লোকসভার সদস্য ছিলেন। একই নথিতে তাকে ২০০৪ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ইউপিএর চেয়ারপারসন হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে।
বর্তমানে সোনিয়া গান্ধী রাজ্যসভার সদস্য এবং কংগ্রেস পার্লামেন্টারি পার্টির চেয়ারপারসন। ফলে ইতালিতে জন্ম নেওয়া সেই নারী, যিনি একসময় ভারতের রাজনীতি থেকে দূরে ছিলেন, কয়েক দশক পরও দেশটির সংসদীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে আছেন।
তার রাজনৈতিক জীবন তাই শুধু একজন বিদেশে জন্ম নেওয়া নারীর ভারতের রাজনীতিতে প্রবেশের গল্প নয়। এটি একই সঙ্গে গান্ধী পরিবারের সঙ্গে তার সম্পর্ক, রাজীব গান্ধীর হত্যার পর রাজনীতিতে তার প্রবেশ, কংগ্রেসের নেতৃত্ব এবং প্রধানমন্ত্রী না হয়েও দীর্ঘ সময় সরকার পরিচালনায় প্রভাব রাখার ইতিহাস।



