রঘু রাইয়ের কিংবদন্তি হয়ে ওঠার গল্প

কিংবদন্তি আলোকচিত্রী রঘু রাই
ভারতের আলোকচিত্র জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র রঘু রাই পাড়ি জমালেন না ফেরার দেশে। ৮৪ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ২৬ এপ্রিলের শেষ রাতে। যখন পুরো দেশ ঘুমাচ্ছিল গভীর ঘুমে, তখন তিনি চিরতরে চোখ বুজলেন দিল্লির এক হাসপাতালে। গত দুই বছর ধরে তিনি লড়াই করছিলেন মরণব্যাধি প্রোস্টেট ক্যান্সারের সাথে। আজ বিকেলে দিল্লির লোদি রোড শ্মশানে সম্পন্ন হবে তার শেষ বিদায়ের সব আনুষ্ঠানিকতা।কিংবদন্তি আলোকচিত্রী অরি কার্তিয়ে-ব্রেসঁ ১৯৭১ সালে রঘুকে করে দিলেন বিশ্বখ্যাত ‘ম্যাগনাম ফটোস’ এর সদস্য। তিনি তার ক্যামেরায় ধরে রেখেছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ আর ভোপাল গ্যাস ট্র্যাজেডির মতো সব ঐতিহাসিক মুহূর্ত। মাদার তেরেসা আর দালাই লামার দারুণ সব ছবি তুলে তিনি হয়েছিলেন বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। তার পরিবারের পক্ষ থেকে ইনস্টাগ্রামে নিশ্চিত করা হয়েছে এই বিদায়ের করুণ খবর।
১৯৪২ সালে রঘু জন্মেছিলেন অবিভক্ত পাঞ্জাবের এক ছোট্ট গ্রামে। চার ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। বড় ভাই এস পাল তাকে উপহার দিয়েছিলেন তার জীবনের প্রথম ক্যামেরা। সেই থেকেই শুরু হলো রঘুর ক্যামেরায় ভারতের আত্মাকে খোঁজার এক মহাকাব্যিক যাত্রা।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় রঘু রাই শরণার্থী শিবির, সীমান্ত এলাকা এবং যুদ্ধের মানবিক বাস্তবতা ক্যামেরায় ধারণ করেন। তার তোলা শরণার্থীদের দুর্দশা, অনাহার, ক্লান্তি ও সীমান্ত পেরিয়ে আশ্রয়ের জন্য ছুটে চলা মানুষের ছবি বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলে এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক গুরুত্বপূর্ণ ভিজ্যুয়াল দলিল হয়ে ওঠে।
ষাটের দশকে রঘু যোগ দিলেন বিখ্যাত পত্রিকা ‘দ্য স্টেটসম্যান’ এ প্রধান আলোকচিত্রী হিসেবে। প্যারিসের এক প্রদর্শনীতে তার কাজ দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন ফরাসি মাস্টার কার্তিয়ে-ব্রেসঁ। তার উৎসাহেই রঘু ১৯৭৭ সালে নাম লেখালেন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে। একাত্তরের শরণার্থী শিবির থেকে বাংলাদেশের জন্ম সবই তিনি ক্যামেরাবন্দী করেছিলেন একজন দরদী শিল্পীর নিপুণ ছোঁয়ায়।
কর্মজীবনে তিনি কাজ করেছেন ‘সানডে’ এবং ‘ইন্ডিয়া টুডে’র মতো নামী সব ম্যাগাজিনে। দিল্লি, কলকাতা আর তাজমহল নিয়ে তিনি লিখেছেন প্রায় ২০টির মতো অসাধারণ বই। ভোপালের গ্যাস আক্রান্তদের নিয়ে তার ছবির সিরিজটি নাড়িয়ে দিয়েছিল পুরো বিশ্বের বিবেককে।
১৯৭১ সালে ভারত সরকার তাকে ভূষিত করেছিল সম্মানজনক ‘পদ্মশ্রী’ পদকে। নিউইয়র্ক থেকে শুরু করে লন্ডন, টোকিও কিংবা সিডনি সবখানেই প্রদর্শিত হয়েছে তার তোলা কালজয়ী ছবিগুলো। নামী সব ম্যাগাজিন যেমন টাইম কিংবা লাইফ নিয়মিত ছাপতো তার তোলা জীবনের গল্পগুলো।
রঘু রাই ছিলেন আসলে আলোর কারিগর আর ছবি দিয়ে গল্প বলার এক ওস্তাদ মানুষ। ক্যামেরার ওপাশের জগতকে তিনি ভালোবাসতেন নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি। শিকারের জগতে জিম করবেট যেমন ছিলেন কিংবদন্তি, আলোকচিত্রের দুনিয়ায় রঘু রাইও ঠিক তেমন এক সংবেদনশীল আত্মার নাম।






