তেলাপোকার পর এবার মাছি বাহিনী
- বিজেপির বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সিজেপির পাশে নতুন ‘দল’

তেলাপোকার পর এবার মাছি! মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন ঘিরে যখন দিল্লিতে উত্তেজনা তুঙ্গে, তখনই আলোচনায় এল নতুন এক ব্যঙ্গাত্মক মঞ্চ— ‘মক্ষী জনতা পার্টি’ (এমজেপি)। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে ইনস্টাগ্রামে আত্মপ্রকাশ করা এই পেজ এ বার ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) এবং ছাত্রনেত্রী নেহা বোরার পাশে দাঁড়িয়েছে। জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে বিতর্কে কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা নিয়েও যখন বিরোধীদের প্রশ্ন, তখন এই নতুন মঞ্চের আবির্ভাব রাজনৈতিক পরিসরে ব্যঙ্গের নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
গত ১৩ অক্টোবর এমজেপি দাবি করে, মাত্র ৭২ ঘণ্টায় তাদের ইনস্টাগ্রাম পেজে ৪০ লক্ষেরও বেশি ভিউ এবং ৩ লক্ষ ৩০ হাজারের বেশি অনুগামী হয়েছে। পেজটির বক্তব্য যে, তারা সিজেপির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছে। দুই পক্ষের সম্মতি মিললে যৌথ অবস্থান বা সমন্বিত কর্মসূচি নিয়েও আলোচনা হতে পারে। তবে এখনও আনুষ্ঠানিক জোটের ঘোষণা হয়নি।
পেজটির তথ্য অনুযায়ী, আরিয়ান নামে এক পড়ুয়া এর প্রতিষ্ঠাতা।
কেন মাছি, কেনই বা আরশোলা?
গত ৯ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টে একটি আবেদনের শুনানি চলাকালীন এই ব্যঙ্গের সূত্রপাত। ১০ অক্টোবর সিজেপির প্রস্তাবিত বিক্ষোভের আগে দিল্লিতে ট্রেন, মেট্রো ও ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ বা সীমিত করার সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ জানায়, নিরাপত্তার স্বার্থে পরিষেবা নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে, কিন্তু গোটা ব্যবস্থাকে অচল করে দেওয়া যায় না। সেই প্রসঙ্গেই আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, ‘মাছি মারতে হাতুড়ি ব্যবহার করা যায় না’।
সেই মন্তব্যকেই ব্যঙ্গের অস্ত্র করেছে এমজেপি। তাদের বক্তব্যের সারকথা হল, মাছি যদি হাতুড়ির আঘাতের উপমা হয়ে ওঠে, তাহলে সেই মাছিও এ বার নিজের কথা বলবে। নামের মধ্যে হাস্যরস থাকলেও, প্রতিবাদের অধিকার এবং প্রশাসনের জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তুলতেই এই উদ্যোগ বলে দাবি পেজটির।
নেহা বোরার পাশে, প্রশ্ন পুলিশি পদক্ষেপেও
এমজেপি পৃথক বিবৃতিতে অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (আইসা)- এর সভানেত্রী নেহা বোরার প্রতি সংহতি জানিয়েছে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিবাদকে সাহসী পদক্ষেপ বলে উল্লেখ করে পেজটি জানিয়েছে, গণতন্ত্রে কর্তৃপক্ষের কাছে প্রশ্ন করা এবং জবাবদিহি চাওয়া অত্যন্ত জরুরি।
যন্তর মন্তরে সিজেপির দুই নেতা আশুতোষ রাঙ্কা ও সৌরভ দাসকে আটক করার ঘটনাতেও প্রশ্ন তুলেছে নতুন এই মঞ্চ। জাতীয় পতাকা হাতে স্লোগান দেওয়ার পর তাঁদের বিরুদ্ধে পুলিশের পদক্ষেপ নিয়ে এমজেপির প্রশ্ন, প্রতিবাদের নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়েও যদি মানুষের বক্তব্য শোনানোর সুযোগ না থাকে, তা হলে সেই জায়গার প্রয়োজন কী? তাদের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন আলোচনা দূরত্ব নয়।
সিজেপির আন্দোলন, নিশানায় জ্ঞানেশ ও কেন্দ্র
সিজেপির উত্থানও একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে। তরুণদের একাংশকে ‘আরশোলা’ বলে উল্লেখ করার মন্তব্যের প্রতিবাদে ব্যঙ্গাত্মক পেজ হিসেবে এর সূত্রপাত। পরে তা আন্দোলনের পরিচিত মুখ হয়ে ওঠে। পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগে প্রতিবাদ থেকে শুরু করে এ বার ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) নিয়ে প্রশ্ন— একের পর এক ইস্যুতে সংগঠনটি সরব হয়েছে। গত ১০ অক্টোবর জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছিল সিজেপি ও একাধিক ছাত্র সংগঠন।
ভোটার তালিকা সংশোধনে বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়া নিয়ে বিরোধীদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়া শাসক বিজেপির রাজনৈতিক স্বার্থে কাজে লাগতে পারে। সিজেপি ও আন্দোলনকারীদের দাবি, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্নের জবাব দিতে হবে এবং জ্ঞানেশ কুমারকে পদত্যাগ করতে হবে।
১৫ অক্টোবর সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে আরও অভিযোগ করেন, জ্ঞানেশ কুমারকে রক্ষা করতে কেন্দ্র সরকার বিক্ষোভকারীদের উপর কঠোর পদক্ষেপ করছে। তাঁর বক্তব্য, ছাত্র, বিরোধী নেতা ও প্রতিবাদীদের আটক করা হলেও মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের ভূমিকা নিয়ে যথেষ্ট জবাবদিহি নেই।
এমজেপি আপাতত ইনস্টাগ্রামকেন্দ্রিক ব্যঙ্গাত্মক উদ্যোগ। কিন্তু সিজেপির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা, নেহা বোরার প্রতি সমর্থন এবং আটক নেতাদের নিয়ে প্রশ্ন তোলার মধ্য দিয়ে তারা যে বৃহত্তর প্রতিবাদী পরিসরে জায়গা করে নিতে চাইছে, তা স্পষ্ট। আরশোলা থেকে মাছি নামের এই অদ্ভুত ধারাবাহিকতা শেষ পর্যন্ত কত দূর গড়ায়, তা সময়ই বলবে। তবে জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে বিতর্কে ব্যঙ্গ যে নতুন রাজনৈতিক ভাষা হয়ে উঠছে, তা অস্বীকার করা কঠিন।



