পুজার বাজারে মার্কস থেকে দেবী দুর্গা
বইয়ের স্টলে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক লড়াই

সংগৃহীত ছবি
কলকাতার দুর্গাপুজার বাজারে এবার মার্কস থেকে দেবী দুর্গা। বইয়ের স্টল ঘিরেই সামনে এসেছে বাংলার এক অভিনব রাজনৈতিক লড়াই। এক দিকে মার্কসবাদী সাহিত্য, লেনিনের বই ও বামপন্থী মতাদর্শ; অন্য দিকে সনাতন ধর্ম, হিন্দুত্ব এবং বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয় নিয়ে পাল্টাপাল্টি দাবি। পুজোর মণ্ডপের পাশে বইয়ের স্টল ভাঙচুর, স্টল বসাতে বাধা, প্রতিবাদ মিছিল সব মিলিয়ে উৎসবের পরিচিত আবহে ঢুকে পড়েছে রাজনীতির এক অভিনব সংঘাত।
কলকাতার যাদবপুরে সপ্তমীর দিন সিপিএমের একটি বইয়ের স্টল ভাঙতে হাজির হন দুই ডজনেরও বেশি অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি। তাদের সঙ্গে ছিল দুটি ডাম্পার ও একটি জেসিবি খনন যন্ত্র। কলকাতা পুলিশ ও পুরসভার কর্মীরাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন বলে জানা যায়। বস্তুতপক্ষে স্টলটি গত ৪৯ বছর ধরে প্রতি দুর্গাপুজায় বসত। পরিস্থিতি বুঝে সিপিএমের যাদবপুর কমিটির সদস্য ৩৬ বছরের রঙ্গন ঘোষ সহকর্মীদের ফোন করেন। বইয়ের স্টল ঘিরে তারা মানববন্ধন তৈরি করেন। তাদের বক্তব্য ছিল, স্টল ভাঙতেই হলে পুলিশ ভাঙুক, নয়তো সরে যাক। পরে পুজা দেখতে আসা মানুষও মানববন্ধনে যোগ দিলে ভাঙার উদ্যোগ থেমে যায়।
বামেদের অভিযোগ, শুধু যাদবপুর নয় - বালিগঞ্জ, টালিগঞ্জ, হুগলি, হাওড়া, কোচবিহার এবং পশ্চিম মেদিনীপুরেও বইয়ের স্টল আক্রান্ত হয়েছে। কলকাতায় সিপিএমের তরফে দশটি অভিযোগ দায়ের করা হয় এবং আদালতের দ্বারস্থও হয় দল। বুধবার কলকাতা হাইকোর্ট সেই আবেদন খারিজ করে জানায়, স্টল বসানোর অনুমতি চাওয়া হলেও কলকাতা পুলিশ ও পুরসভার কাছ থেকে তা মেলেনি। তবে রঙ্গন ঘোষের দাবি, তারা এক মাস আগেই অনুমতির ব্যবস্থা করেছিলেন। পুরসভার কর দেওয়া, সিইএসসির বিদ্যুৎ সংযোগ ও নিরাপত্তার জন্য টাকা জমা দেওয়ার পরেও তাদের নিজস্ব মিটার কিনতে হয়েছিল। এত কিছুর পরও অনুমতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
উল্লেখ্য, ১৯৫০- এর দশক থেকে বাংলার পুজায় বামেদের বইয়ের স্টল বসানোর রীতি চলে আসছে। সেখানে কম দামে পাওয়া যায় সমাজতান্ত্রিক সাহিত্য, মার্কসবাদী ধ্রুপদি বই, জীবনী এবং প্রগতিশীল লেখালিখি। ১৯৭৭ থেকে ২০১১ টানা ৩৪ বছর পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় ছিল। সেই রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে বইয়ের স্টলগুলিও জড়িয়ে রয়েছে। প্রাক্তন রাজ্যসভা সাংসদ বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য, যিনি দীর্ঘদিন ধরে এই বইয়ের স্টল থেকে বই কেনেন। তিনি বলেছেন, বই বাঙালির সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। মানুষ পোশাক, গয়না কেনার জন্য যেমন টাকা জমায়, তেমনই বই কেনার জন্যও সঞ্চয় করে। তার দাবি, তৃণমূলের শাসনকালেও তিনি কখনও এ ধরনের ভাঙচুর দেখেননি।
এই সংঘাতের অন্য ছবি দেখা গিয়েছে কলকাতার ট্যাংরা- কামারডাঙা এলাকায়। সেখানে শ্রী রাম স্বাভিমান পরিষদ (এসআরএসপি) ঘোষণা করে, বামেদের বইয়ের স্টল বসতে দেওয়া হবে না। ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডের পুজোর থিম রাখা হয়েছে ‘সনাতন হিন্দু রাষ্ট্রীয় ও বাম বধ’। অর্থাৎ বামপন্থার বিনাশ। প্রবেশপথে বামেদের ধ্বংসের আহ্বান জানানো পোস্টার, সঙ্গে পতাকা হাতে ভারতমাতার মূর্তি - সব মিলিয়ে পুজমণ্ডপে রাজনৈতিক বার্তা স্পষ্ট। পুজা কমিটির সদস্য এবং এসআরএসপির প্রতিষ্ঠাতা সুরজ সিংয়ের বক্তব্য, হিন্দু ধর্মকে অসম্মান করার জন্য বামেদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ থেকেই এই থিম। তার প্রশ্ন, যারা ঈশ্বরে বিশ্বাস করে না, তারা দুর্গাপুজোয় স্টল বসিয়ে কী করতে চায়? তার দাবি, কলকাতার বিভিন্ন জায়গায় একই ধরনের পোস্টার দেওয়া হয়েছে এবং সিপিএম- সহ কোনও বাম সংগঠনকেই স্টল বসাতে দেওয়া হবে না।
এই এলাকায় এসইউসিআইয়ের একটি স্টল নিয়েও বিরোধ বাধে। সাইকেল সারাইয়ের দোকানের কাছে স্টল বসানোর চেষ্টা করলে দোকানের মালিক তাদের সরে যেতে বলেন। পরে এসআরএসপির সদস্যরাও হস্তক্ষেপ করেন। দলীয় কর্মীর বাড়িতে স্টল খোলার চেষ্টা হলেও স্থানীয়দের আপত্তির মুখে তা সম্ভব হয়নি বলে সুরজ সিং দাবি করেছেন।
সুরজ সিংয়ের কথায়, হিন্দুদের সাহায্য করার জন্য তার বিরুদ্ধে ৬০টিরও বেশি এফআইআর রয়েছে। তিনি একসময় উত্তর কলকাতার বিজেপির যুব সংগঠন ভারতীয় জনতা যুব মোর্চার জেলা সভাপতি ছিলেন এবং নিজেকে আরএসএসের স্বয়ংসেবক বলে পরিচয় দেন। সামাজিক মাধ্যমে তার পোস্টে বাংলাদেশের হিন্দুদের রক্ষার আহ্বান এবং পশ্চিমবঙ্গকে হিন্দুদের একমাত্র মাতৃভূমি বলে দাবি করতে দেখা গিয়েছে। গত বছর ‘আয়াত’ নামের একটি রেস্তরাঁর বিজ্ঞাপনে বিরিয়ানি হাতে দেবী দুর্গার ছবি নিয়ে তিনি প্রতিবাদ করেছিলেন। পরে বাধ্য হয়ে রেস্তরাঁটি সেই বিজ্ঞাপন সরিয়ে নেয়। সুরজের বক্তব্য, প্রায় এক দশক ধরে তাদের সংগঠন সক্রিয়। তার দাবি, একসময় নিজেকে হিন্দু বা ধর্মবিশ্বাসী বলে পরিচয় দেওয়াই কঠিন ছিল। তিনি আরও জানান তারাই রামনবমী ও বিভিন্ন হিন্দু উৎসব আয়োজন শুরু করেন।
রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও বামেদের বইয়ের স্টল নিয়ে বিতর্কে বক্তব্য রেখেছেন। ১০ সেপ্টেম্বর বিধানসভায় তিনি অভিযোগ করেন, বামপন্থী পরিচয় দেওয়া কিছু অধ্যাপক ‘সনাতনীদের’ আক্রমণ করছেন এবং গেরুয়া রং- কে বেছে বেছে নিশানা করছেন। পুজা কমিটিগুলোকে তার পরামর্শ ছিল, যে সব স্টলে দুর্গাপুজোর বদলে ‘শারদোৎসব’ লেখা হয়, সেখানে কমিউনিস্টদের বইয়ের স্টল বসতে দেওয়া উচিত নয়। এ বারের পুজায় কয়েকটি মণ্ডপে আরএসএস ও হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের কর্মীদের স্বেচ্ছাসেবকের ভূমিকাতেও দেখা গিয়েছে। কোথাও কোথাও বাংলা গানের বদলে বাজানো হয়েছে ‘জয় হনুমান’-এর মতো হিন্দি গান। পুলিশের স্বেচ্ছাসেবকদের একাংশের পরনে ছিল গেরুয়া টি-শার্ট ও টুপি।
অন্যদিকে টালিগঞ্জে ৭৩ বছরের সাধনা দাশগুপ্ত গত ২৬ বছর ধরে সেখানে বামেদের বইয়ের স্টল দেখভাল করছেন। রবিবার মাঝরাত পেরিয়ে যাওয়ার পর তিনি খবর পান, স্টলটি ভেঙে দেওয়া হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, মুখ ঢাকা কয়েকজন ব্যক্তি মোটর বাইকে এসে লাঠি দিয়ে স্টলটি ভাঙচুর করেন। সকালে গিয়ে সাধনা দেখেন, বাঁশ ভাঙা, দলীয় পতাকা ছড়িয়ে রয়েছে চারদিকে। তার ক্ষোভ, বিষয়টি শুধু কোনও রাজনৈতিক দলের নয় - বইয়ের। ভাঙা কাঠামোর পাশেই দুটি টেবিলে বই সাজিয়ে আবার স্টল চালু করেন তিনি। ভাঙা বাঁশের গায়ে লাগানো পোস্টারে লেখা হয়, ‘মাঝরাতে বইয়ের স্টল ভাঙলে কেন?’ অন্য পোস্টারে ছিল ‘লজ্জা! লজ্জা!’
সাধনার বক্তব্য, বইয়ের স্টল খোলা কোনও অপরাধ নয়। কারও আপত্তি থাকলে মুখ ঢেকে রাতের অন্ধকারে নয়, প্রকাশ্যে এসে প্রতিবাদ করা উচিত। কাছেই ঢাকুরিয়ায় আর একটি স্টল ভাঙার অভিযোগের পর বামেরা মিছিল করেন। তাদের স্লোগান ছিল, ‘যত আক্রমণ করবে, আমাদের মিছিল তত বড় হবে।’
ভাঙচুরের পর অবশ্য টালিগঞ্জের স্টলে বই বিক্রি কমেনি, বরং বেড়েছে। সাধনার হিসাব অনুযায়ী, আগে দিনে প্রায় পাঁচ হাজার টাকার বই বিক্রি হত। ঘটনার পর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে সাত হাজার টাকায়। তার কথায়, অরবিন্দ থেকে শেক্সপিয়র বিভিন্ন ধরনের বই সেখানে পাওয়া যায়। ক্রেতাদের সবাই নাস্তিক নন। অনেকেই নতুন চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে পরিচিত হতে বই কেনেন। বাম কর্মীরাও পুজোয় যান, ভোগ দেন। এস রায় নামে এক ক্রেতা মেয়েকে নিয়ে স্টলে এসে ছ’টি বাংলা বই কেনেন। তিনি কোনও রাজনৈতিক দলের সদস্য নন। তার বক্তব্য, বাঙালির পরিচয় গঠনে বইয়ের বড় ভূমিকা রয়েছে। বই ধ্বংস করা তাই ব্যক্তিগত আঘাতের মতো।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে ৮বি বাসস্ট্যান্ডের আশপাশেও এ বার দেখা গিয়েছে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ। প্রায় পাঁচ দশক ধরে একই জায়গায় সিপিএমের বইয়ের স্টল বসে। কিন্তু এ বার তার কয়েক মিটার দূরেই হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলির একটি যৌথ স্টল খোলা হয়। সেখানে ‘মহর্ষি অরবিন্দ অখণ্ড ভারত’ লেখা পোস্টারের পাশে রাখা ছিল ‘কমিউনিস্ট আতঙ্কবাদ’, ‘ছাত্রদের জন্য শ্রীমদ্ভগবত’ এবং আরএসএসের শতবর্ষ উপলক্ষে প্রকাশিত ‘অর্গানাইজার’ পত্রিকার বিশেষ সংখ্যা। স্টলে ক্রেতা দেখা যায়নি।
দুর্গাপুজায় বামেদের বইয়ের স্টল ঘিরে এই সংঘাত তাই শুধু রাজনৈতিক বিরোধের ঘটনা নয়। একদিকে ধর্মীয় পরিচয় ও সনাতনী ঐতিহ্যের দাবি, অন্যদিকে মতপ্রকাশ, বই পড়া এবং মতাদর্শের স্বাধীনতার প্রশ্ন। দুইয়ের টানাপোড়েন প্রকাশ্যে এসেছে উৎসবের ময়দানে। বিজেপির একাধিক নেতাও ভাঙচুরের নিন্দা করেছেন। কিন্তু যে পুজায় এতদিন পাশাপাশি জায়গা করে নিয়েছিল দেবীর আরাধনা ও বইয়ের পাতা, সেখানেই এবার সেই সহাবস্থানের ভবিষ্যৎ নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।



