Agamir Somoy E-Paper
শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬
আগামীর সময়
হাজারো মানুষের প্রেরণা রফিকুল
শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬
আগামীর সময়
  • সর্বশেষ
  • জাতীয়
  • রাজনীতি
  • অর্থনীতি
  • চট্টগ্রাম
  • সারা দেশ
  • বিদেশ
  • খেলা
  • বিনোদন
  • লাইফস্টাইল
  • মতামত
  • ফিচার
  • ভিডিও
  • শিক্ষা
  • ক্লাব
  • বিচিত্রা
  • চাকরি
  • ছবি
  • সাহিত্য
  • বিবিধ
  • ধর্ম
  • প্রবাস
  • ফ্যাক্টচেক
  • সোশ্যাল মিডিয়া
  • ধন্যবাদ
  • বিশেষ সংখ্যা
  • সর্বজনের গল্প
  • বিশেষ লেখা
EN
  • সর্বশেষ
  • জাতীয়
  • রাজনীতি
  • অর্থনীতি
  • চট্টগ্রাম
  • সারা দেশ
  • বিদেশ
  • খেলা
  • বিনোদন
  • লাইফস্টাইল
  • মতামত
  • ফিচার
  • ভিডিও
  • শিক্ষা
  • ক্লাব
  • ইপেপার
  • EN
লোড হচ্ছে…

প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক : আবদুস সাত্তার মিয়াজী

সম্পাদক : মোস্তফা মামুন

আগামীর সময়
আমাদের সম্পর্কেযোগাযোগশর্তাবলিগোপনীয়তাআমরা

ইডিবি ট্রেড সেন্টার (লেভেল-৬ ও ৭), ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ানবাজার, ঢাকা-১২১৫

যোগাযোগ: ০৯৬৬৬ ৭৭১০১০

বিজ্ঞাপন: ০১৭৫৫ ৬৫১১৬৪

[email protected]

স্বত্ব © ২০২৬ | দৈনিক আগামীর সময়

আগামীর সময় সাহিত্য

কবি মোহাম্মদ রফিকের সাক্ষাৎকার

মনে রাখতে হবে আমরা কী মন্ত্রে দেশ স্বাধীন করেছি!

শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন
agamir somoy
প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৩৫
মনে রাখতে হবে আমরা কী মন্ত্রে দেশ স্বাধীন করেছি!

কবি মোহাম্মদ রফিক ও শিমুল সালাহ্উদ্দিন। ছবি: বারীন ঘোষ

ষাটের দশকে লেখালেখি শুরু করা কবি মোহাম্মদ রফিক (২৩ অক্টোবর ১৯৪৩ - ০৬ আগস্ট ২০২৩) জীবনভর নদী, জল, কাদামাটির সঙ্গে যুক্ত জীবনযাপনের চিত্র তুলে এনে তার স্বাদু কবিতার মধ্য দিয়ে বাংলা কবিতার ভাণ্ডার মণিরত্নে ভরে দিয়েছেন। কীর্তিনাশা, কপিলা, গাওদিয়া, খোলা কবিতা, বিষখালী সন্ধ্যা বা কালাপানি, অশ্রুমতির শব বা নোনাঝাউ— তার এসব কাব্য বাংলা কবিতায় অনন্য সংযোজন বলে স্বীকার করবেন কবিতার পাঠক পদবাচ্যের যে কেউই। ‘সব শালা কবি হবে’- সামরিক শাসন ও শাসকের তথাকথিত কবি হওয়ার অভিলাসের বিরুদ্ধে তার রচিত বহুবিশ্রুত পঙক্তি। আধুনিক বাংলা কাব্যসম্ভারে তার ‘কপিলা’ (১৯৮৩) সম্ভবত একমাত্র সার্থক মহাকাব্য।

সর্বমানুষের মুক্তিচেতনার কবি মোহাম্মদ রফিকের জন্ম ১৯৪৩ সালে ২৩ অক্টোবর বাগেরহাট জেলার বেমরতা ইউনিয়নের বৈটপুর (বর্তমান চিতলী) গ্রামে। পিতা সামছুদ্দীন আহমদ এবং মাতা রেশাতুন নাহার। আট ভাইবোনের জেষ্ঠ্যভ্রাতা মোহাম্মদ রফিক ৬০-এর দশকে ছাত্র আন্দোলনে, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে এবং স্বাধীন বাংলাদেশে আশির দশকের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করেছেন।

খুলনার বাগেরহাটেই কেটেছে কবির শৈশব। স্থানীয় বিদ্যালয়ে লেখাপড়া শুরু করলেও পরে পিরোজপুর জেলা স্কুল, বরিশাল ও খুলনা জেলা স্কুলে পড়াশুনা করেছেন রফিক। খুলনা জেলা স্কুল থেকে ১৯৫৮ সালে ম্যাট্রিকুলেশন (মাধ্যমিক) পাস করেন মোহাম্মদ রফিক। মেট্রিক পাশ করে ঢাকার নটরডেম কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন, কিন্তু পরে ঢাকা কলেজে মানবিক বিভাগে চলে যান। এ সময় কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সাথে তার বন্ধুত্ব হয়, যা তার সাহিত্যিক চেতনায় প্রগাঢ় ছাপ ফেলে। ১৯৬১ সালে ইন্টারমিডিয়েট (উচ্চ মাধ্যমিক) পাস করেন। সে বছরই রাজশাহী সরকারি কলেজে ইরেজিতে অনার্সসহ স্নাতক শ্রেণিতে ভর্তি হন কবি মোহাম্মদ রফিক। এরপর অংশ নেন সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে। সামরিক আইনে তাকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেয় সামরিক আদালত। এ সময় দিনের পর দিন পালিয়ে বেড়ান মোহাম্মদ রফিক। কিন্তু জেল এড়াতে পারেননি। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান বিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকায় তাকে বহিস্কার করা হয় রাজশাহী কলেজ থেকে। পরে, সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে মামলায় জয়লাভ করে পাস কোর্সে বি.এ পাস করেন ১৯৬৫ সালে। একই বছর ইংরেজি বিষয়ে এম.এ তে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।

১৯৬৭ সালে মোহাম্মদ রফিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৫৮-৫৯ সালে কবি যুক্ত হন ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে, আইয়ুবশাহীর আমলে খুলনা, যশোর, বাগেরহাট এবং পরে বগুড়া ও রাজশাহী অঞ্চলে ছাত্র ইউনিয়নকে সংগঠিত করেন। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘বৈশাখী পূর্ণিমায়’ প্রকাশিত হয় ১৯৭০ সালে। ১৯৭১ সালে সক্রিয়ভাবে যোগ দেন মুক্তিযুদ্ধে। যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন ১নং সেক্টরের হয়ে। অবিস্মরণীয় ভূমিকা রেখেছেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রকে সংগঠিত করে তুলতে। ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত হয় মোহাম্মদ রফিকের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘ধুলোর সংসারে এই মাটি’। আশির দশকের শুরুতে স্বৈরাচার এরশাদের রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের প্রেক্ষাপটে দেশে সাম্প্রদায়িকতা, দারিদ্র ও একনায়কতন্ত্রের যে ভয়াল থাবা বিস্তৃত হয় তারই প্রেক্ষাপটে লেখেন ‘খোলা কবিতা’ (১৯৮৩)। যার হাজার হাজার কপি বিলি করেছে স্বৈরাচারের পতনপ্রত্যাশী, গণতন্ত্রকামী বাংলাদেশের মানুষ।কবি মোহাম্মদ রফিক (২৩ অক্টোবর ১৯৪৩ - ০৬ আগস্ট ২০২৩), ছবি নাসির আলী মামুন, ফটোজিয়াম
কীর্তিনাশা (১৯৭৯), খোলা কবিতা ও কপিলা (১৯৮৩), গাওদিয়া (১৯৮৬), স্বদেশী নিঃশ্বাস তুমিময় (১৯৮৮), মেঘে এবং কাদায় (১৯৯১), রূপকথা কিংবদন্তি (১৯৯৮), মৎস্যগন্ধা (১৯৯৯), মাতি কিসকু (২০০০), বিষখালি সন্ধ্যা (২০০৩), নির্বাচিত কবিতা (২০০৩), কালাপানি (২০০৬), নির্বাচিত কবিতা (২০০৭), নোনাঝাউ (২০০৮), দোমাটির মুখ (২০০৯), অশ্রুময়ীর শব (২০১১), কালের মান্দাস (২০১২), ঘোরলাগা অপরাহ্ন (২০১৩), বন্ধু তুমি প্রসন্ন অবেলায় (২০১৫), এসবই মোহাম্মদ রফিকের কবিতাগ্রন্থ। ঐতিহ্য প্রকাশ করেছে কীর্তিনাশা, গাওদিয়া ও কপিলা নিয়ে কাব্যসংকলন ত্রয়ী (২০০৯)। মোহাম্মদ রফিক রচনাবলী -১ (২০০৯) ও মোহাম্মদ রফিক রচনাবলী -২ (২০১০) ও প্রকাশ করেছে ঐতিহ্য। ১৯৯৩ সালে অরুণ সেনের সম্পাদনায় কোলকাতার প্রতিক্ষণ থেকে প্রকাশিত হয়েছে মোহাম্মদ রফিকের নির্বাচিত কবিতা। কবিতার পাশাপাশি তার রয়েছে বেশ কয়েকটি গদ্যগ্রন্থ। এর মধ্য ভালোবাসার জীবনানন্দ (২০০৩), আত্মরক্ষার প্রতিবেদন’ (২০০১, ২০১৫) ও ‘স্মৃতি বিস্মৃতির অন্তরালে’ (২০০২) অন্যতম। কবি মোহাম্মদ রফিক আয়ওয়াতে ইন্টারন্যাশনাল রাইটিং প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করেন ১৯৯৩ সালে। মার্কিনীদের আয়ওয়া শহরের অভিজ্ঞতা, ভিন দেশের লেখকদের সঙ্গে কবির মতবিনিময়, দেশ-বিদেশের সাহিত্যের খবর ইত্যাদি বিষয় নিয়ে ২০০৩ সালে প্রকাশিত হয় তার দূরের দেশ নয় আয়ওয়া বইটি। নব্বইয়ের দশকে বেশ কিছু ছোটগল্প লেখেন তিনি। চট্টগ্রামের শুভানুধ্যায়ী পাঠকরা প্রকাশ করেছে তার ‘গল্প-সংগ্রহ’। ১৯৮১ সালে কবি আলাওল পুরস্কার, ১৯৮৭ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার, ২০১০ সালে একুশে পদক পেয়েছেন। কবি মোহাম্মদ রফিক শিক্ষকতা করেছেন বাজিতপুর কলেজ, চট্টগ্রাম মহিলা কলেজ এবং স্বাধীনতার পরে ঢাকা কলেজে। ১৯৭৪ সালের মার্চে যোগ দেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে। ২৯ জুন ২০০৯ পর্যন্ত দীর্ঘকাল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার পর অবসরে ছিলেন কবি। তার সহধর্মিনী ছিলেন নিজের স্বাতন্ত্র্যে উজ্জ্বল কবি জিনাত আরা রফিক। ২০০৫ সালের ৭ ডিসেম্বর তিনি প্রয়াত হন। দুই ছেলে শুভস্বত্ব রফিক ও শুদ্ধস্বত্ব রফিক। কবি মোহাম্মদ রফিক ২০২৩ সালের ০৬ আগস্ট মারা যান। কবির সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে কয়েক দফার আলাপের টুকরো সার নিয়ে তৈরি করা হয়েছে এ আলাপচারিতা।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনি এ অঞ্চলের মাটি মানুষ জনসংস্কৃতিকে আপনার কবিতার উপাদান হিসেবে ব্যবহার করেছেন। গুলশানের হলি আর্টজানে হামলার ঘটনার পর সবার মধ্যে যেনো একটা ভীতি ঢুকে গেছে। এ দশায় করণীয় কি স্যার বাঙালির। বাঙালি এখন কি করবে?

মোহাম্মদ রফিক: তুমি যে বাঙালি বলছ, তার মধ্যেই তুমি উত্তর দিয়ে দিয়েছ। বাঙালি আরও বাঙালি হবে। বাঙালিকে আরও বাঙালি হতে হবে। আমরা ১৯৭১ এ মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম এবং এদের বিরুদ্ধেই তো মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম। এদের মতো ধর্মকে রাজনীতিতে ব্যবহার করা কিছু মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেই তো দেশ স্বাধীন করেছি। আমরা কী মন্ত্রে দেশ স্বাধীন করেছি! অন্য যা কিছু থাক, আমাদের মূল উদ্দ্যেশের জায়গা ছিল, আমরা আমাদের বাঙালিত্বকে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলাম। একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে আমরা আবির্ভূত হয়েছিলাম এদের সাথে লড়াই করে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: অনেক তরুণরা ধর্মীয় রাজনীতির দিকে আকৃষ্ট হচ্ছে, এমনকী তারা জীবনের তোয়াক্কা করছে না। গুলশানের হামলায় বাচ্চা বাচ্চা ছেলেরা বিশজন মানুষকে জবাই করে হত্যা করেছে, তাদের এই মোটিভেশনের কারণ কি বলে মনে করেন আপনি?

মোহাম্মদ রফিক: আজকের তরুণদের বিভ্রান্ত হওয়ার বড় কারণ, তাদের সামনে কোন মন্ত্র নেই। তারা জানে না, তারা কেনো জীবন ধারণ করছে। তাকে যদি এই মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করা যায়, যেটা আমাদের মতোই, রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব বলে আমি মনে করি, যে, তাকে বোঝাতে হবে, তুমি বাঙালি, তোমার বাঙালি সত্ত্বাকে বিশ্বে প্রতিষ্ঠা করতে হবে— তাহলে দেখবে এই জঙ্গিবাদের ক্ষমতা অনেক কমে যাবে।

কবি মোহাম্মদ রফিক, জীবনভর নদী, জল, কাদামাটির সঙ্গে যুক্ত জীবনযাপনের চিত্র তুলে এনে তাঁর স্বাদু কবিতার মধ্য দিয়ে বাংলা কবিতার ভাণ্ডার মণিরত্নে ভরে দিয়েছেন; নিজের বসার ঘরে কবি, ছবি রাজু আলাউদ্দিন

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: সারাবিশ্বে জঙ্গিবাদের এই যে আগ্রাসন, উত্থান এর কারণ আপনি কিভাবে ব্যাখ্যা করেন স্যার?

মোহাম্মদ রফিক: এর থেকে জরুরী আরেকটা বিষয় আছে, এই জঙ্গিবাদের যে উত্থান হয়েছে, এটা আমরা খুব ভালো করে জানি, যে কেনো হচ্ছে! এর মূল কারণটা হচ্ছে, আমি যেটা মনে করি, ধনতন্ত্র, ক্ষয়িষ্ণু ধনতন্ত্র তার মরণদশায় পৌঁছে গেছে। যেকোনভাবে সে বাঁচতে চায়। একদিকে এজন্য সে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্ম দিচ্ছে, অন্যদিকে সে আইএস কে জন্ম দিচ্ছে। আল কায়েদার জন্ম দিচ্ছে। আমাদের তরুণদের কাছে এই জায়গাটা, বৈশ্বিক এই রাজনীতি স্পষ্ট করতে হবে। তাদেরকে শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চার দিকে, বাঙালি হবার দিকে ফিরিয়ে আনতে হবে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: ধনতন্ত্র বলতে কি স্যার আপনি পুঁজিবাদের কথাই বলছেন? আমেরিকান স্বপ্নের কথা?

মোহাম্মদ রফিক: ভালো বলেছো। এই আমেরিকান ড্রিম আমাদের তরুণদের নষ্ট করছে। পুঁজিবাদ। পুঁজি তো পুঞ্জিভূত করেছে সারা পৃথিবী থেকে লুট করে পশ্চিমারা। ধনতন্ত্র বলতে আমি পুঁজিবাদই বলছি, যার প্রধান অস্ত্র মুক্তবাজার অর্থনীতি। এই পুঁজিবাদ এখন নিজেই নিজের কবর খুঁড়েছে। সে প্রায় ধ্বংসের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে। ফলে সে আত্মরক্ষার পথ খুঁজছে। তার স্টেক বাঁচাবার জন্য এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে। শুধু আমাদের দেশে না। সর্বত্র। সারা পৃথিবীতে। যেখানে ধর্ম উস্কানোর দরকার সেখানে ধর্ম উসকাচ্ছে। যেখানে জাতিত্ব উসকানো দরকার সেখানে জাতিত্ব উসকে দিচ্ছে। যেখানে রেসিজম, উগ্র বর্ণবাদ উসকে দেয়া দরকার সেখানে সেটি ছড়িয়ে দিচ্ছে। অর্থ এবং অস্ত্রের ক্ষমতায় মানবিকতাকে পদদলিত করছে, যার ফলাফল এইসব ঘটনা। ব্রেইনওয়াশ করে কিছু ছেলেকে দিয়ে কি মর্মান্তিক সব ঘটনা ঘটাচ্ছে। এসবের বিরুদ্ধে জাতিগতভাবে এক হয়ে এখন পৃথিবীর মানুষকে লড়াই করতে হবে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: যুক্তরাষ্ট্র হুমকী দিচ্ছে সৈন্য পাঠানোর, বিভিন্ন দেশে—

মোহাম্মদ রফিক: আসল জায়গাটাই তো আমি বললাম, ওর ক্ষমতা আছে, আমেরিকার ক্ষমতা আছে সে হুমকী দিচ্ছে এটাই কিন্তু প্রকৃত সত্য না, তাদের আমরা হুমকী দেবার মতো পাত্তা দিচ্ছি, সুতরাং আমাদের ক্ষমতা বাড়াতে হবে। কিন্তু আমার মনে হয়, এখনকার এটা বাড়াবাড়ি। আমাদের কোনভাবেই সৈন্য পাঠানোর মতো অবস্থা হয় নাই। আমাদের কি ইরাক আফগানিস্তানের মতো অবস্থা? আমরা কি সিরিয়ার মতো প্রেক্ষাপটে আছি? এমন অবস্থা তো সারাবিশ্বেই হচ্ছে। বাংলাদেশে আমি কোন বিদেশী সৈন্য দেখতে চাই না।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আবৃত্তি সংগঠন ধ্বনির উৎসবে কবি মোহাম্মদ রফিক, নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক সাঈদ ফেরদৌসসহ ধ্বনির কর্মীরা, ২০০৪ সালের ছবি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: গুলশানের, শোলাকিয়ার ঘটনায় সিএনএন কিন্তু বাংলাদেশের অব্স্থাকে সিরিয়া, ইরাকের সাথে তুলনা করেছে।

মোহাম্মদ রফিক: সিএনএন আমার ধারণা ইচ্ছাকৃতভাবে নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করার জন্য এটা করেছে। এখনো আমাদের ওরকম অবস্থা হয়নি। আমি অন্তত এটা অনুভব করি না।

হ্যাঁ, আমরা বিপন্ন, আমরা ব্যথিত। কিন্তু আমি মনে করি, আমাদের শক্তি যথেষ্ট। আমরা যদি সবাই নেমে আসি, আমরা কেনো রাস্তায় নামছি না! আমাদের মুক্তিকামী শান্তিপ্রিয় জনগণ কোথায়? সেই জনগণ কোথায় যারা ঊনসত্তুরের গণআন্দোলন করেছে? তাদের বংশধররাই তো আজো এদেশে বসবাস করছে। তারা যদি নেমে আসে, প্রতিবাদ করে, ঘরে বাইরে সমানভাবে নজর দেয়, গানে কবিতায় ফিরে আসে তাহলে এমনিতেই এসব জঙ্গিবাদফাদ উড়ে যাবে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: তো স্যার আপনার মতে এখন এই জাতির করণীয় কি?

মোহাম্মদ রফিক: প্রতিবাদ শুধু না, এই জাতিকে এখন দৃঢ়ভাবে শক্তভাবে প্রতিবাদ করতে হবে। এই আইএসওয়ালাদের বুঝিয়ে দিতে হবে, এতো সহজ না, এটা বাংলাদেশ। এই দেশের মানুষ মাথা নত করে না। এই খেলা বহুদিন যাবৎ চলছে, এই খেলা উপনিবেশ আমল থেকে চলছে— বাঙালিকে ধ্বংস করো। কারণা বাঙালির যে আত্মশক্তি, ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি তাকে সারা পৃথিবী ভয় পায়। বিশেষ করে ইউরোপ এবং আমেরিকানরা ভয় পায়। কারণ তুমি তাকালেই দেখতে পাবে, আমাদের এই, এতো খারাপ অবস্থা, তাও দেখো আমাদের মানুষের এগিয়ে যাওয়া কেউ থামাতে পারে নাই। আমাদের প্রবৃদ্ধির হার দেখো, আমাদের স্কলারদের সারাবিশ্বে অবদান দেখো। আমাদের নারীরা যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, পৃথিবীর কয়টা দেশ পেরেছে তা, বলো।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: খুব কম।

মোহাম্মদ রফিক: সুতরাং, বিশ্বশক্তি জানে আমাদের দুর্বার স্পৃহা আছে। শক্তি আছে। পরিশ্রম করার সামর্থ আছে। তারা আমাদের দাবায়ে রাখতে চায়। আমি বঙ্গবন্ধুর কথাটাই পুনরুক্তি করতে চাই, আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবা না। আমাদের দাবায়া রাখার কলকাঠি হলো এইসব, জঙ্গি হামলা। বাচ্চা বাচ্চা ছেলেদের ভেতর ধর্মের বিষ ঢুকিয়ে দেয়া। আমাদের এসবের বিরুদ্ধে এক হয়ে সম্মিলিত ভাবে লড়াই করতে হবে। ভয় পেলে চলবে না। শিল্পের আশ্চর্য ক্ষমতার দিকে তরুণদের নিয়ে আকৃষ্ট করতে হবে। এমন সময়ে তাই শিল্পী সাহিত্যিকদের দায়িত্ব আরো বেড়ে গেলো বলে আমি মনে করি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: জরুরী কথা বলছেন,স্যার। (গাওদিয়া’র প্রথম সংস্করণের একটি বই দেখিয়ে) স্যার, এটা আছে আপনার কাছে?

মোহাম্মদ রফিক: (অবাক হয়ে) না, এটা কোথায় পেলে তুমি?

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: স্যার, নীলক্ষেতের পুরনো বইয়ের দোকান থেকে। ছান্দসিক আবদুল কাদির এর সংগ্রহের বই থেকে। আপনি উনাকে স্বাক্ষর করে উপহার দিয়েছিলেন। শিল্পী কামরুল হাসানের প্রচ্ছদ। বিশ টাকায় কিনেছি।

মোহাম্মদ রফিক: তুমি তো অদ্ভুত জিনিস মনে করিয়ে দিলে। আমি কী কাজে যেনো বাংলা একাডেমি গেছি একদিন। গিয়ে দেখি যে এক বয়স্ক লোক। খুব কষ্ট করে একটা কী প্রবন্ধের প্রুফ দেখছেন। একজন পৌঢ় লোক। আমার একটু মনে হলো সাহায্য করি। আমি বললাম উনাকে যে, আমি আপনাকে সাহায্য করি। উনি বললেন যে, ‘হ্যাঁ তুমি আমাকে সাহায্য করতে পারো’। আমি সাহায্য করলাম। করে, আমি প্রুফ দেখে বেরিয়ে এসেছি। বাইরে শিশির দত্তরা আড্ডা মারছে, ওখানে দাঁড়িয়েছি, আমিও ওদের সাথে গল্প করছি। একটু পর শামসুজ্জামান খান বেরিয়ে আসলেন ঐ প্রৌঢ়মানুষটিকে নিয়ে। আমাকে বললেন মোহাম্মদ রফিক মোহাম্মদ রফিক, উনি আপনার সাথে একটু কথা বলতে চান। উনি আমাকে বললেন, যে তুমি বললে কোন ক্ষতি নেই তো! আমি বললাম, না, আমি আপনার ছেলের বয়সী হবো। বললেন, তুমি কীর্তিনাশা লিখেছ? আমি বললাম যে, জ্বি। উনি বললেন, তুমি অনেক বড় কবি। আমি তো তখন ই (বিব্রত) হয়ে গেছি। গাধার মত হাসছি। উনি বললেন, ‘তুমি মনে করেছ যে, আমি আধুনিক কবিতা বুঝি না! কিন্তু ছন্দ তো বুঝি। তুমি অনেক বড় কবি’।

আবৃত্তি সংগঠন ধ্বনির যুগপূর্তি আবৃত্তি উৎসব উদ্বোধন করেছিলেন কবি মোহাম্মদ রফিক, ২০০৯ সালের ছবিশিমুল সালাহ্উদ্দিন: (হাসির পর) কবিতার ছন্দের ব্যাপারে বাংলা সাহিত্যে উনি কিন্তু বড় অথরিটি স্যার! ছান্দসিক আবদুল কাদিরের ঐ বড় কবি অভিধা খুব ছোট করে দেখার কিছু নাই।

মোহাম্মদ রফিক: আমি তখন উনাকে চিনিই না। আর প্রশংসা শুনে আমি তো আরো গাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। উনি বলছেন যে, “তোমার ছন্দের যে হাত আর কোন কবির এই হাত আমি দেখি নাই’’। এই বলে রাগান্বিত ভাবে গটগট করে চলে গেলেন। শামসুজ্জামান খান বোকার মতো আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো। আমিও তার দিকে। শামসুজ্জামান খান বললেন, আপনি উনাকে চেনেন? আমি বললাম, ‘না তো’। উনি বললেন, আবদুল কাদির। তো আমি গিয়ে যে উনাকে বলবো যে আমি আপনাকে চিনতে পারিনি, ঐটুকু তখন আমার হয়নি, এক ধরণের ঐদ্ধত্য ও অহমিকা ছিলো, আমি গিয়ে আবার আড্ডা দিতে শুরু করেছি ওদের সাথে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: ‘গাওদিয়া’র এই কপিটা স্যার আমি পেয়েছি নীলক্ষেতে। ছান্দসিক আবদুল কাদির এর সংগ্রহের অনেকগুলো বইয়ের সাথে। উনার বাড়ির কোন লোক বোধহয় সব একসাথে বিক্রি করে দিয়েছিল। আপনার নিজের স্বাক্ষর করা এবং লেখা, শ্রদ্ধাভাজনেষু, আবদুল কাদির, করকমলে। আমার খুবই ভাল্লাগলো আপনার সিগনেচার দেখে এবং আমি কিনলাম। আপনার কাছে কি এই সংস্করণের কোন কপি আছে?

মোহাম্মদ রফিক: না, নাই।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এই বইটা দিয়া শুরু করার কারণ স্যার, গাওদিয়ার শুরুতে, প্রারম্ভপত্রে আপনি লিখেছেন, “ গাওদিয়া, হতে পারে একটি গ্রাম,/ শহর কিংবা গঞ্জ,/এমনকি সারাটা বাংলাদেশ”। ১৯৪৩ সালে আপনার জন্ম, এখন পর্যন্ত এই দীর্ঘ সময়ের কাব্যচর্চায় আপনি বাংলাদেশের মানুষের দুঃখ, দুর্দশা, কষ্ট, বেদনা, এগুলো আসলে আপনার কবিতায় অনেক বেশি মূর্ত হয়ে উঠেছে। এবং তার চেয়ে বেশি শক্তিশালী ভাবে উঠে এসেছে এই অঞ্চলের মানুষের অদম্য চেতনা বা স্পিরিটের গল্প। একভাবে বলা যায়, রাজনৈতিক দিকনির্দেশনার গল্পও। তো স্যার, জানতে চাই, আপনার যে পোয়েটিক ফিলসফি বা কাব্যদর্শন তা দাঁড়ালো কিভাবে?

মোহাম্মদ রফিক: শোন, তুমি যে প্রশ্ন তুললে, এর উত্তর দেয়া এত সহজ নয়। কারণ, যখন আমি কাজ শুরু করেছি, তখন আমি এত কিছু চিন্তা করি নাই। যেকোন কবিই যে কাজ করে, তা তার বেড়ে উঠার সাথে, জীবনযাপনের সাথে সম্পর্কযুক্ত। সাযুজ্যপূর্ণ। কতগুলি ব্যাপার আমার মধ্যে খুব প্রভাব রেখেছে, প্রভাবিত করেছে, এখন আমি বুঝি, যখন আমি ফিরে তাকাবার চেষ্টা করি, যে আমি যে এখানে দাঁড়ালাম, কিভাবে দাঁড়ালাম! যা হয়ে উঠলাম, কিভাবে হয়ে উঠলাম! আমার উপর একটা বিরাটা প্রভাব পড়েছে আমার দাদার। আমার দাদা খুব শিক্ষিত মানুষ ছিলেন না, কিন্তু স্বশিক্ষিত ছিলেন। সেই আমলে তিনি সিক্স পর্যন্ত পড়েছিলেন। এন্ট্রান্স পরীক্ষা তখন একটা মাণদণ্ড। তিনি সেটা দিতে পারেন নাই। তিনি আমাদের অঞ্চলে একটা প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন।

কবি মোহাম্মদ রফিকের কিছু বই, শিমুল সালাহ্উদ্দিনের সংগৃহীত

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এটা কী স্যার নাইনটিন থার্টির দিকে?

মোহাম্মদ রফিক: না, এটা তারও আগে। উনিশশো বিশটিশ থেকে শুরু। তার আগ থেকেও হতে পারে। তবে তিনি রাজনৈতিক, ধর্মীয় এবং সামাজিকভাবে খুব সচেতন ব্যক্তি ছিলেন। তিনি রাজনৈতিকভাবে সুভাষ বোসের শিষ্য ছিলেন। তখন সমগ্র বাংলাই সুভাষ বোসে মুগ্ধ। এবং কংগ্রেস করতেন। ধর্মীয়ভাবেও তিনি খুব সচেতন ছিলেন। তিনি নামাজ পড়তেন, প্রতিদিন কোরান শরীফ পড়তেন, হাদীস পড়তেন এবং শুধুই পড়তেন না, জেনে বুঝে পড়তেন। প্রতিটা শব্দের অর্থ তিনি জানতেন একথা তিনি আমাকে বলেছেন। কিন্তু তিনি খুব ধর্মনিরপেক্ষ ছিলেন।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: সেসময়ই মুক্তিচিন্তার মানুষ ছিলেন!

মোহাম্মদ রফিক: হ্যাঁ। উদার ছিলেন। তিনি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন, তিরিশটা রোজা রাখতেন, কিন্তু তিনি আমাকে বলেছেন, “দ্যাখ, ধর্ম আমাকে শিখিয়েছে— আমার ধর্ম করার অধিকার যেমন আমার, ঠিক তেমনি আমার পাশের বাড়ির প্রতিবেশী, সে যদি অন্য সম্প্রদায়ের মানুষও হয় তাহলে তারও নিজের ধর্ম পালন করার একই অধিকার আছে। সে অধিকার যেনো রক্ষিত হয় সেটা দেখাও আমারই দায়িত্ব। এটা আমার ধর্মই আমাকে শিক্ষা দিয়েছে। তুই আমাকে জিজ্ঞেস করতে পারিস, তাহলে কেন আমি এত ধর্মপালন করি। তার উত্তর হচ্ছে, আমি একটা ধর্মপালনকারী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছি, ধর্ম পালন করা আমার উপরে দায়িত্ব হিসেবে বর্তেছে। আমার সংস্কৃতির অংশ হিসেবে। সেটা রক্ষা করাটাও তাই আমার দায়িত্ব। এবং অতি শৈশবেকাল থেকেই পাকিস্তান রাষ্ট্র নিয়ে আমার মনে একটা সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: সেটা কিরকম?

মোহাম্মদ রফিক: আমার এখনো স্পষ্ট মনে পড়ে ১৯৪৭ এ বা ৪৮ এ যখন পাকিস্তান হলো, তখন আমার দাদা ঐ অঞ্চলের ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট। আমাদের ওখানে যে স্থানীয় স্কুল আছে, সেখানে সেদিন প্রথম পাকিস্তানী পতাকা তোলা হবে। পতাকা উত্তোলন উৎসব। সব লোক সেজেগুঁজে যাচ্ছে। কিন্তু আমার দাদা বসে আছেন। তিনি যাবেন না। তো আমার বাবা তখন তাগড়া যুবক। পাকিস্তান বিষয়ে তারও উৎসাহ আছে। তিনিও যাবার জন্য তৈরি হচ্ছেন। দাদাকে বলছেন, বাপজান চলেন চলেন। দাদা বললেন, যেতে হলে তোমরা যাও। একটা জালেম রাষ্ট্র হতে যাচ্ছে এই পাকিস্তান। আমি গেলাম বটে সেই উৎসব দেখতে, কিন্তু আমার মনে দাদার ঐ দৃঢ় মুখ আর কথাটা কোথায় যেনো গেঁথে রইলো। এটা একটা আর দ্বিতীয়ত তোমরা সে সময় দেখনি, আমাদের গ্রামে মূলত হিন্দু এবং নিম্নবর্ণের হিন্দুরা বসবাস করতো। নদীর ধার ঘেঁষে তাদের পাড়া প্রথমে, তারপর মুসলমানদের বাড়িঘর ছিলো। ছেলেবেলা থেকে আমার বন্ধুত্ব ছিল ঐ হিন্দুপরিবারের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে। তারাই কিন্তু তখন লেখাপড়া করতো, বই আদানপ্রদান করতো। আমি বাংলা উপন্যাস, বাংলা কবিতার বই, ইংরেজী উপন্যাস, ইংরেজী কবিতা, এসবের সাথে যোগাযোগ আমার ঐ শৈশবে ঐ হিন্দুপরিবারের ছেলেমেয়েদের মধ্য দিয়েই হয়েছে। এবং সত্যি কথা বলতে কী, ঢাকা কলেজে আসার আগ পর্যন্ত আমি মুসলমান ছেলেরা কেমন হয় আমি জানতাম না। আমার প্রথম বাঙালি মুসলমান বন্ধু হচ্ছে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, প্রয়াত প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক। এবং বলা যায় এখন পর্যন্ত সেই আমার একমাত্র বন্ধু, কারণ তার সঙ্গে আমার দীর্ঘজীবন, মানে যতদিন সে বেঁচে ছিলো এবং আমরা একসাথে থেকেছি, আমাদের শিল্পসাহিত্যচেতনার আদানপ্রদান, হাসি ঠাট্টা, মদ্যপান এসব আমরা, সবটা করেছি। এবং আমি খুব অল্পবয়সেই বামপন্থী রাজনীতির প্রতি একধরণের আকর্ষণ বোধ করেছি, ফলে সম্পৃক্ত হয়েছি।কবি মোহাম্মদ রফিক, আশির দশকে, তখন তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপকশিমুল সালাহ্উদ্দিন: সম্পৃক্ত হলেন কিভাবে?

মোহাম্মদ রফিক: সেটাও মজার ঘটনা। আমি কিন্তু মার্কস লেলিন পড়ে বামপন্থার প্রতি আকৃষ্ট হইনি। আমি আকৃষ্ট হয়েছিলাম দস্তয়ভস্কির উপন্যাস পড়ে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এবং দস্তয়ভস্কি আপনার প্রিয়তম লেখক!

মোহাম্মদ রফিক: হ্যাঁ, অন্যতম, প্রিয় লেখকদের একজন। আমি তখন ক্লাস এইটে পড়ি। দস্তয়ভস্কির ‘লাঞ্ছিত এবং নিপীড়িত’ উপন্যাসটি আমি খুলনা থেকে কিনে এনেছিলাম। এই উপন্যাসটি পড়ার পর থেকে আমার মধ্যে কেনো যেনো বামপন্থার প্রতি এক ধরণের দুর্নিবার আকর্ষণ তৈরি হয়। এবং যতদিন আমি সক্রিয় বামপন্থী রাজনীতির সাথে যুক্ত থেকেছি, আমি আমার জায়গা থেকে নড়িনি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এখনো কী নড়েছেন স্যার?

মোহাম্মদ রফিক: এখনো যে নড়েছি, তা না। আমি তো আদর্শের রাজনীতি করেছি। ঐ আদর্শে আমি বিশ্বাস করি। এবং এর প্রতি দুর্বলতা আমার আছে, থাকবেও। আমার কবিতায়ও ঐ আদর্শের প্রভাব রয়েছে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনার কবিতার কথা জানতে চেয়েছিলাম স্যার, কবির দর্শন—

মোহাম্মদ রফিক: আমি যে আমাদের সমাজ, বোধ, জীবন, বেদনা, সমাজজীবন নিয়ে কাজ করেছি, আপাতভাবে যা দেখা যায়, এসবই কেবল দানা বেঁধেছে, এটাই শুধুমাত্র নয় কিন্তু। কিছু জিনিস আমি কবিতায় খুব সচেতন ভাবে করতে চেয়েছি। তুমি তাকিয়ে দেখো, ইয়োরোপীয় সভ্যতা, যা দিয়ে আমরা খানিকটা মোহাচ্ছন্ন বলবো, এই ইয়োরোপীয় সভ্যতা কিন্তু মূলত গড়ে উঠেছে গ্রীক পুরাণের উপর নির্ভর করে। এই পুরাণটা, মিথটা কিন্তু একটা জাতির মেরুদণ্ড গঠন করার জন্যে খুব প্রয়োজন। তুমি নৃবিজ্ঞানের ছাত্র, তুমি বুঝবে, একটা কথা আছে প্রত্নতত্ত্বপ্রতিভা।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: প্রত্মপ্রতিভা স্যার!

মোহাম্মদ রফিক: আমি ইংরেজিতে বলি আর্ক জিনিয়াস (Ark-genius)। আমি যদি বঙ্গবন্ধুর কথা চিন্তা করি, তাহলে দেখো বাঙালিরদের এমন অনেক লোকের চেহারা কিন্তু ভেসে ওঠে। আমার মনে ভেসে ওঠে, বাঙালি ভাবলেই যাদের চেহারা তার মধ্যে তিনি অন্যতম। তোমার সামনেও ভেসে উঠতে বাধ্য, কারণ কোন লোক, শুধু শেকড় না, তার মাটি থেকে বিচ্যুত হয় না। মাটির সমস্ত ঐশ্বর্য নিয়েই সে বেড়ে ওঠে কিন্তু। আমি সচেতন ভাবে যেটা ভেবেছি, আমাদের, বাঙালির, একদম বাঙালির, একটা নিজস্ব পুরাণ গ্রহণীয়। এবং তুমি দেখবে, আমি কিন্তু সচেতনভাবে আমার কবিতায় সেটা করার চেষ্টা করেছি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: হ্যাঁ স্যার, চরিত্র হিসেবে আপনার কপিলায় তো এদেশের মাঠ ঘাটের মানুষই মিথ হয়ে উঠেছে। ঈশা খাঁ এর বংশের বঁধু না পলাইতাম আমি কিংবা ময়মনসিংহ গীতিকার মহুয়া মলুয়ার চরিত্র যেখানে কবিতায় উঠে এসেছে। কিংবা গাওদিয়ার কথা যদি বলি!

মোহাম্মদ রফিক: কোত্থেকে নিয়েছি যদি বলো, আমি নিয়েছি বাঙালি লোকগাঁথা, লোককাহিনী এমনকী বাংলা উপন্যাসকেও আমি ব্যবহার করেছি। যেমন তুমি নিজেই মঞ্চের জন্য কপিলা নির্দেশনা দিয়েছো।

মোহাম্মদ রফিকের দেয়ালে শোভা পেতেন রবীন্দ্রনাথ, কবির সাথে আরেক প্রয়াত কবি মাহবুব পিয়াল, সাক্ষাৎকারগ্রহীতা শিমুল সালাহ্উদ্দিনের সেলফি এটিশিমুল সালাহ্উদ্দিন: জি স্যার। শুধু তো কপিলায় না স্যার, আপনার অন্য সব রচনাবলীতেও আঞ্চলিক বিবিধ মিথের উপস্থিতি রয়েছে। এবং এই পুরাণপ্রচেষ্টা গুরুত্বপূর্ণ বিস্তার নিয়ে আপনার কবিতায়—

মোহাম্মদ রফিক: তা বলতে পারো। শুধু কপিলায়ই নয়, মহুয়া, বেহুলা, দামোদর এই চরিত্রগুলো পুরাণ থেকেই আমার কবিতায় আমি তুলে আনতে চেষ্টা করেছি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এই সমস্ত কিছুর বাইরে, আপনি যা যা কিছু গ্রন্থিত করেছেন কবিতায় উপাদান হিসেবে, তার বাইরে আপনার কবিতায় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মতো বিশুদ্ধতার এক ধরনের প্রচেষ্টা আছে। একজন কবির এই যে প্রকল্প, এটা আপনি কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

মোহাম্মদ রফিক: এটা হয়তো আমার পঠনপাঠনের একটা প্রক্রিয়া। আমি ব্যক্তিগতভাবে যেটাকে আমরা বলি ধ্রুপদী সাহিত্য, তার প্রতি আমার একটা মারাত্মক আকর্ষণ আছে। ছেলেবেলা থেকেই মহাকাব্যের প্রতি আমার এক ধরনের দুর্বলতা ছিলো। মহাকাব্য হয়েছে কিনা জানিনা, কিন্তু আমি চেষ্টা করেছি। কপিলাকে অনেকেই স্বার্থক মহাকাব্য বলেছেও। অরুণ সেন বলেছেন। শুনছি সুধীর চক্রবর্তীও নাকি লিখেছেন। আমি এখনো, হোমার বলো, , ভার্জিল বলো, ঈনিড বলো, দান্তে বলো, আফ্রিকা বা ল্যাটিন আমেরিকার কবিতা বলো, বা আমাদের রামায়ণ, মহাভারত বলো, কিংবা আমাদের সাহিত্যের মাইকেল, রবীন্দ্রনাথ বলো, এদের প্রতি আমার ভীষণ প্রেম রয়েছে। ষাটের দশকে যখন আমি লিখতে শুরু করি, তখন কিন্তু আমি মূলত রবীন্দ্রনাথের বলয়েরই ছিলাম। এখনো আমি মনে করি যে আমি রবীন্দ্রনাথের বলয়েরই লোক। বাংলা কবিতার ছন্দ আমাকে ভীষণভাবে আকৃষ্ট করে। যে একজন গায়ক, সে যদি তাল লয় ভুল করে, তাহলে আমরা তাকে কখনোই গায়ক স্বীকৃতি দেবো না। হয়তো তার গান শুনতে পারি, কিন্তু শিল্পীর কাতারে তাকে কখনোই স্থান দেবো না। কবি যদি হতে চায় কেউ, বা টিকে থাকতে চায় কবি হিসেবে, এবং একটা লেখা লিখে ভাবে এটা কবিতা পদবাচ্য কী না, তাহলে অবশ্যই তাকে বাংলা ছন্দের ওপরে অধিকার অর্জন করতে হবে। এবং সেই ছন্দটাকে যেভাবে ইচ্ছে সেভাবেই যেনো সে ব্যবহার করতে পারে। এটা প্রথমত, দ্বিতীয়ত যেটা আমি বলি, পুরনো কবিতা ধরো, চর্যাপদ, বৈষ্ণব পদাবলী, গীতিকা, মধ্যযুগের কবিতা, আমি সবটাই পড়েছি। আমি একটা কথা বলতে পারি যে, ২০০৩ বিসি থেকে শুরু করে, ৩০০০ বিসি থেকে শুরু করে পৃথিবীতে যত উল্লেখযোগ্য কবিতা লেখা হয়েছে, যেখানেই লেখা হোক, যেগুলো প্রকাশিত হয়নি বা আমার কাছে আসেনি সেগুলো আলাদা কথা, যেগুলো হয়েছে, অনূদিত, প্রকাশিত তার সাথে আমার যোগাযোগ নেই সেটা হতে পারে না। পৃথিবীর মোটামুটি সব অঞ্চলের ছোট বড় সব কবিরই কিছু না কিছু কবিতা আমি পড়েছি। এবং তার একটা অনুরণন নিশ্চয়ই আমার মধ্যে আছে। আমি যখন লিখতে বসি, তখন আপনা আপনিই আমার কবিতা বিষয়ে অর্জিত যে ধারণা, তা ভেতরে কাজ করতে থাকে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: স্যার, এটা বলা হয়ে থাকে যে আধুনিক বাংলা সাহিত্যে মহাকাব্যের একটা বড় ধরনের হাহাকার ছিলো। কপিলা যেটা একভাবে অবসিত করেছে বলে আমি মনে করি। কপিলা নিয়ে প্রচুর কাজ হয়েছে, শঙ্কর সাঁওজালের সেটনির্মাণ সহযোগিতা নিয়ে আমি কাজ করেছিলাম, তার বাইরে লেখালেখিও হয়েছে প্রচুর। কপিলার যে মূল শক্তির জায়গা এটা আপনার পরবর্তী প্রজন্ম একভাবে আবিষ্কার করেছে। আপনি যখন কপিলা লেখা শুরু করেন, সেই প্রস্তুতির সময়টা যদি বলেন আমাদেরকে।

মোহাম্মদ রফিক: আমার যেটা ধারণা, যে আমি মানুষের মুক্তিতে বিশ্বাস করি। অবশ্যই আমি মানুষের অর্থনৈতিক সাম্যে বিশ্বাস করি। আমি মনে করি প্রত্যেক মানুষের অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত। শুধু তাই না আমি মনে করি নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়াটা একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। এবং নারীশক্তি যতটা বিকশিত হবে, একটা সমাজ ততটা বিকশিত হবে। এটা আমার ভিতরের বিশ্বাস। আমি কপিলাতে গিয়ে সেই নারীশক্তির বিষয়টাকে বুঝতে চেষ্টা করেছি। তুমি দেখবে যে ঐখানে কিন্তু প্রতিমা হয়ে আসছে বারবার কপিলা, কপিলার ভূমিকায় নারী। এরকমই আমি ইদানিংকালে, আরেকটা বই আমার লেখার প্রস্তুতি, প্রস্তুতি বলা ঠিক হচ্ছে না, লেখা হয়ে যাচ্ছে, মানে প্রকাশের পথে, সেটা হলো বেহুলার অপর পরিচয়। এবং আরেকটা লেখায় আমি হাত দিয়েছি সেটা হচ্ছে মহুয়াকে নিয়ে আমি একটা দীর্ঘকাব্য— প্রায় আশি পৃষ্ঠার বেশি। এবং তোমার মনে আছে কী না যে কপিলাও কিন্তু আশি পৃষ্ঠা।

শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: স্যার ত্রয়ী তে ৬২ পৃষ্ঠা, প্রথম সংস্করণে খুব সম্ভবত ৮৪ পৃষ্ঠা।

মোহাম্মদ রফিক: হ্যাঁ, কপিলা, মহুয়া এবং বেহুলা এই তিনটাকে নিয়ে আমি একটা জগৎ তৈরি করতে চাই। যে জগতে এই নারীশক্তির বিকাশকে অন্তত আমি আমার জায়গা থেকে পূর্ণমাত্রায় অবলোকন করতে পারবো। আমাদের সমাজে নারী যতটা বিকশিত হবে, নারী যতটা এগিয়ে আসবে, নারী যতটা হাল ধরতে পারবে, আধুনিক অর্থে নয়, একজন বা দুইজন নয়, সমস্ত নারীরা যখন এগিয়ে আসবে, তখন আমাদের সমাজে ভিতর থেকে একটা অবশ্য পরিবর্তন হবে। এবং সেই পরিবর্তনের জন্য আমি অপেক্ষা করছি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: স্যার, গত কয়েকটা বইমেলায় আপনার যে বইগুলি বেরিয়েছে, প্রথমা থেকে অশ্রুময়ীর শব, শুদ্ধস্বর থেকে ঘোরলাগা অপরাহ্ণ, রূপসীবাংলা থেকে বন্ধু তুমি প্রসন্ন অবেলায়, বেঙ্গল থেকে কালের মান্দাস, শুদ্ধস্বর থেকে দোমাটির মুখ, —

মোহাম্মদ রফিক: এই গুলি তো আমি আমার এখনকার বই ধরিই না। এখন আমার সামনের যে বইমেলা, আশা করছি দুটো নতুন কবিতার বই বেরুবে। সবমিলিয়ে আমার মোটামুটি পাঁচটা বই প্রকাশিত হবার পথে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: বাহ্। প্রচুর লিখছেন স্যার। আমার প্রশ্নটা ছিলো স্যার, যে বইগুলোর নাম করলাম সবগুলো বইয়ের শিরোনামই কেমন মৃত্যুগন্ধী! এটা কেনো স্যার?

মোহাম্মদ রফিক: খুব ভালো প্রশ্ন করেছো। এই প্রশ্নেই বোঝা যায় আমার কবিতার প্রতি খুব মনোযোগ আছে তোমার। গত কয়েক বছরে আমি হঠাৎ করে করে কয়েকবার অসুস্থ হয়েছি। গত চার পাঁচ বছরের মধ্যে প্রায় পাঁচ ছবার আমি হাসপাতালে গেছি। আমার মাতৃবিয়োগ ঘটেছে। দীর্ঘদিনের ভালোবাসার কর্মস্থল জাহাঙ্গীরনগর ছেড়ে এসেছি। কবিতা তো যাপন থেকে আলাদা কিছু না। এটা একটা কারণ ছিলো। দ্বিতীয়ত মনে হয়েছে যে যাবার বেলায় একটা নিজস্ব কথা উচ্চারণ করে যাওয়া ভালো। তবে, এটা কিন্তু আমার পুরো কথা নয়। এখন আমি নিজের ভেতর এক ধরনের উজ্জীবন অনুভব করছি। আমি মনে করি, এই উজ্জীবনের নেশাটা আমি রেখে যেতে চাই। ইদানিংকার একটা কবিতায় আমি লিখেছি, মৃত্যুকে জয় করাই হচ্ছে জীবনের, বেঁচে থাকার মূল অনুষঙ্গ। তোমাকে তো বললাম, আমার ভেতরে মানবমুক্তির, সর্বমানুষের অধিকারের পক্ষে দাঁড়াবার একটা তাড়না আমার ভেতরে আছে।

কবি মোহাম্মদ রফিক, জ্ঞানগর্ভ সারাৎসারে আড্ডা মাতিয়ে রাখতেনশিমুল সালাহ্উদ্দিন: হ্যাঁ স্যার, কালাপানির কবিতায় তো আপনি লিখেছেন, ‘শীত শীত/ দু হাঁটুতে সিঁধিয়েছে মৃত্যুভীতি/ মনে লয়/ আসন্ন বিলয় / সর্বমানুষের// দ্যাখ, ন্যাড়া কঞ্চিতে ধরেছে ফুল/ পূর্ণিমার। আপনি সবসময়ই সর্বমানুষের হতে চেয়েছেন। সর্বমানুষের আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতিফলনের কথাই যেনো মনে করিয়ে দেয় আপনার এ কবিতা। সর্বমানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা থেকেই কী আপনার কবিতা মুদ্রিত হয় আপনার শাদা খাতার পাতায়? এবং আপনার কবিতার চরিত্ররা যেনো সুলতানের আঁকা ছবির সেই দৃঢ়, ঋজু, পেশীবহুল মানুষগুলি, এইখানে স্যার আমি জানতে চাই, সুলতানের যে চিত্রকলার জগৎ, সেটার সাথে আপনার কবিতার জগতের একটা অস্পষ্ট মিল যেনো আছে—

মোহাম্মদ রফিক: তুমি খুব ভালো একটা প্রসঙ্গ তুলেছো। আমি আশির দশকের শুরুতে, তখন বোধহয় আমার কীর্তিনাশা বেরিয়েছে, কপিলা বোধহয় লেখা হয়েছে, খোলা কবিতা লেখার আগে আগে, আমি একবার যশোর গেলাম। যাওয়ার পর আমার খুব ইচ্ছে হলো যে আমি, নড়াইল যাবো, সুলতান ভাইকে দেখে আসবো। তখন কিন্তু আমি উনাকে চিনি না। নাম শুনেছি, কিংবদন্তী শুনেছি, প্রচুর কল্পকাহিনী শুনেছি। তো আমার ইচ্ছে হলো যে আমি যাবোই যাবো। উনাকে চাক্ষুস দেখবো। তো আমি যশোর থেকে দুটা ছেলেকে বললাম যে আমি নড়াইল যাবো। তখন কিন্তু যাওয়ার পথ অত সুগম ছিলো না। এবং তখন ঐ ঝরঝরে বাসে যেতে হতো। বহুপথ হেঁটে আর নৌকায় যেতে হতো। একদিন সকালবেলা যশোর থেকে রওনা দিলাম আমরা তিনজন। এবং দশটা এগারোটা নাগাদ সুলতান ভাইয়ের ভাঙা বাড়িতে গিয়ে আমরা হাজির হলাম। সুলতান ভাই তখন একা থাকেন এবং সঙ্গে তার একজন মহিলা থাকেন, যিনি রান্না বান্না করে দেন। এবং বাঁশের একটা মাচার উপর খাঁচার ভিতরে একটা বেজি, সাপ, শকুন এসব পালেন তিনি। এবং মাচার নিচে ঐ ডাম্প জায়গায় গাঁদা মারা তার ছবি। এবং আমাদের মনে হলো সেই সকালবেলাতেই, তিনি গঞ্জিকা ছাড়া আর কিছু সেবন করেন না। তো এর মধ্যেই কথাবার্তা চলছে। হঠাৎ করে তিনি বললেন, এই আপনারা কিন্তু দুপুরবেলা আমার এখানে খেয়ে যাবেন। আমরা কিছুতেই রাজী হচ্ছি না। তিনি জোর করছেন। বলছেন, না খেয়ে যেতেই হবে। তখন যে মহিলা সুলতান ভাইয়ের সাথে থাকতেন, তিনি আমাদের ডেকে নিয়ে বললেন, যে উনি যে আপনাদের খেয়ে যেতে বলছেন, বাড়িতে তো কিছুই নেই। চালও নেই। কি খাবেন? আমি আস্তে আস্তে তাঁকে বললাম, ভাববেন না, উনি বলে ফেলেছেন, আমরা ব্যবস্থা করছি। আমি গিয়ে তখন অশোক সেন নামে আমার সাথে যে দুজন গেছেন তাদের একজন, তাকে টাকা দিয়ে বললাম যে বাজারে গিয়ে বাজার করে নিয়ে আসো। তো সে, দ্রুত গিয়ে মাছ, শাকসব্জী এসব নিয়ে আসলো। আসার পরে ঐ মহিলা রান্নাবান্না করলো। সুলতানভাই সহ আমরা খেলাম। সুস্বাদু রান্না অবশ্যই। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার, সুলতান ভাই একবার জিজ্ঞেসও করলেন না, এই খাবার কোত্থেকে আসলো, অথচ প্রসন্নচিত্তে খেয়ে নিলেন! সুলতান ভাই এমনই সরল ও জগৎসংসারের ভাবনাহীন মানুষ ছিলেন। তো সন্ধ্যায় সেই অজপাড়াগায়ে অন্ধকার নামলে আমরা চলে এলাম। এবং দেখলাম যে সুলতান ভাইয়ের বাড়িতে ইলেকট্রিসিটি নাই। আমি মনে করলাম যে এটা আমার দায়িত্ব। আমি জেলাপ্রশাসক এর সাথে দেখা করে তাকে বললাম যে, আপনি আর্থিকভাবে না পারেন, অন্তত তাঁর বাড়িটাতে একটু বিদ্যুতের ব্যবস্থা করেন। তাতে অন্তত এই তীব্র শীতে একটু উষ্ণতা এই বাড়িতে তৈরি হবে। পরে আমি খোঁজ নিয়ে জেনেছি, যে, উনি সেটা করেছিলেন।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: সুলতান কী স্যার জাহাঙ্গীরনগরে গিয়েছিলেন?

মোহাম্মদ রফিক: কিছুদিন পরেই, এ ঘটনার, আমি তখন জাহাঙ্গীরনগরে, তুমি তো জানোই প্রান্তিকের কাছে যে বাসাটায় থাকতাম, হঠাৎ করে একদিন দেখি যে সুলতান ভাই হাজির। কি ব্যাপার! বলে ভাই, আমি তো আপনার এখানে থাকতে এসেছি। এবং সুলতান ভাই প্রায় ছ’মাস আমার সাথে কাটিয়ে গেলো। এবং উনি প্রতি সকালবেলা উঠে আমার একটা ছবি আঁকতেন। বাসা বদলে আসার পর সেই ছবিগুলি যে কোথায় হারিয়ে গেছে আর কোন খোঁজ নেই এখন। এঁকে এঁকে তিনি আমার খাটের ওপর বিছানার নিচে রেখে দিতেন। তখন আমিও খুব মদ্যপানে আসক্ত ছিলাম। আর আমি দেখতাম উনি সকালবেলা উঠেই গাঁজা নিয়ে বসেছেন। ফরিদী (হুমায়ূন) ছিলো আমাদের ছাত্র, আরেকজন ছিলো মেহেদী বলে নাম, দুজনেই মারা গেছে। উনি ঐ দুজনকে দিয়ে গাঁজার ব্যবস্থা করাতেন। আমি বললাম সুলতান ভাই, গাঁজা খেলে তো শরীর নষ্ট হয়। তো, উনি খুব ছেলে মানুষ ছিলেন, অদ্ভুত অদ্ভুত সব গল্প করতেন! আমাকে বললেন যে, আচ্ছা রফিক, তো কী করি! আমি বললাম, আপনিও আমার সাথে মদ্য পান করেন। উনি রাজি হলেন। তখন আমি ফরিদীকে বললাম, ফরিদী, একটা ব্যবস্থা তো করতে হয়। তো, ও ঢাকা থেকে একটা ভালো মদ যোগাড় করলো। আমরা তো বাংলা খেতাম, বুঝতেই পারো। ফরিদী, সুলতান ভাই খাবে বলে একটা ভালো, বিদেশী মদ নিয়ে এলো ক্যাম্পাসে। খুব আয়েশ করে আমি ফরিদী আর সুলতান ভাই বসলাম। একটু খেয়ে সুলতান ভাই বললনে, এটা তো জল, হা হা হা, এটা তো কিছু হয় না। এটা আমি খাবো না। হা হা হা। (দুজনের সম্মিলিত হাসি)

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আর খেলেনই না?

মোহাম্মদ রফিক: তুমি অবাক হয়ে যাবে, উনি যে গাঁজায় একেকটা টান দিতেন, তুমি বা আমি যদি দেই ওরকম আমি নিশ্চিত আমাদের বুক ফেটে যাবে। সুলতান ভাই সকালবেলায় উঠে ঠিকমত কথা বলতে পারতো না, কিছু করতে পারতো না, কিন্তু গাঁজায় টান দেবার পরই বলতো যে, এইবার ভাল্লাগছে। এই হচ্ছে সুলতান ভাই। তারপরে, আমার ছাত্ররা, তাদের বিদায় উপলক্ষে উৎসব করবে, তারা শিল্পী সুলতানকে উৎসব আমন্ত্রণ জানাবে, ওরা উনাকে আমন্ত্রণ করতে গেলো, বললো, যে আপনি কোথায় থাকবেন! আমাদের টিএসসিতে গেস্ট হাউস আছে, ওখানে আমরা ব্যবস্থা করতে পারি আপনি চাইলে। বললো, রফিক ভাই আছে না? ওরা বললো, যে, হ্যাঁ আছে। উনি বললেন, তাহলে গেস্ট হাউসে থাকবো কেন? রফিক ভাইয়ের ওখানে থাকবো। তো আমার ছাত্রদের একজন কবির এসে বললো যে স্যার, সুলতান ভাই তো বলছে আপনার এখানে থাকবে, তো আমি বললাম, ঠিক আছে, থাকবে। তখন তিনি গাঁজা টাজা ছেড়ে দিয়েছেন, কিন্তু প্রচন্ড কাশি। এবং কিছুদিন আমার এখানে থাকলেন, জাহাঙ্গীরনগরে মুক্তমঞ্চ থেকে সম্বর্ধনা নিলেন, এরপর তো ফিরে গিয়ে মারা গেলেন। আমার ধারণা সুলতান ভাই খুব সরল ধরণের, সাহসী লোক ছিলেন, নিজের কল্পনার জগতে বিচরণ করতেন।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনারা দুজনেই এই অঞ্চলের মানুষের যাপনের মূল সুরটা ধরেছেন, নিজেদের সৃষ্টিকর্মে প্রোথিত করেছেন—

মোহাম্মদ রফিক: করতে পেরেছি কি না জানিনা, তবে আমি এখনো চেষ্টা করে যাচ্ছি। এই হচ্ছে আমার সাথে সুলতান ভাইয়ের সংশ্রব। তবে আমার মনে হয় যে, সুলতান ভাইয়ের এই নেশায় থাকার সুযোগ নিয়ে এইদেশে অনেকে অনেক ব্যবসা সুবিধা বাগিয়ে নিয়েছে। অনেকেই ব্যাবসা করছে এইদেশে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এখনো করছে।

মোহাম্মদ রফিক: আমি তোমার সাথে একমত, এখনো করছে। আমার সময়ের দুই বড় শিল্পী সুলতান ভাই এবং কামরুল হাসান, দুজনের সাথেই আমার খুব হৃদ্যতা ছিলো। এমনকী কাইয়ুম ভাইয়ের সাথেও।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: হ্যাঁ, সময়ের বড় শিল্পীরা সকলেই আপনার বইয়ের প্রচ্ছদ করেছেন। কপিলার প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণ তো করেছিলেন কাইয়ুম চৌধুরী।

মোহাম্মদ রফিক: এবং কপিলার প্রচ্ছদের তো একটা গল্প আছে। কপিলা কিন্তু আমি লিখেছিলাম মাত্র, আমার আবার হয় কী এক একসময় তাগিদ আসে লেখার…

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এটা জানত চাই স্যার। এটা কী ঐশী?

মোহাম্মদ রফিক: না। তা বলবো না। হয়তো এটা দীর্ঘদিনের প্রস্তুতির ব্যাপার। এবং সেই প্রস্তুতি সম্বন্ধে আমি তেমন সচেতন থাকি না। হঠাৎ করে, আমার মধ্যে একটা ঘটনা বা কোন একটা টানাপোড়েন, কাছের মানুষের কোন ঘটনা, মান অভিমান বিভিন্ন ভুল বোঝাবুঝি আমার মধ্যে এক ধরনের আবেগ তৈরি করে। সেই আবেগটাই তাগিদাটা তৈরি করে। এমন হয়েছে আমি একদিনে সাতটা আটটা কবিতাও লিখেছি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: সম্প্রতি আর্টসে ভিডিওসহ ছাপা হওয়া কবিতাগুলিও এই মে মাসের মধ্যেই লেখা দেখলাম।

মোহাম্মদ রফিক: এবং আমি বেহুলাও লিখে ফেলেছি অনেক। তোমাকে আমি দেখাতে পারি পাণ্ডুলিপিটা, তুমি দেখলে অবাক হয়ে যাবে। এবং আমি মহুয়া যে লিখছি সেটারও একই অবস্থা—

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: দেখবো স্যার কথাটা শেষ করি। স্যার মহুয়া বলতেই সেলিম স্যারের কথা মনে পড়লো। আপনার বন্ধু এবং শত্রু একসাথে বলা যায়। জাহাঙ্গীরনগরের শিক্ষার্থীদের আপনারা দুজন দুর্দান্ত কিছু সময় ও অভিজ্ঞতা উপহার দিয়েছেন। ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক বলয় গড়ে তুলেছেন। আপনার শেষ সময় পর্যন্ত খুব অল্পকালের আমার যে অভিজ্ঞতা তাতেও একটা অনিন্দ্যসুন্দর সময় আপনারা দুজনই জাহাঙ্গীরনগরকে দিয়েছেন। এবং এখন এই ২০১৫ সালে বসে বলতে পারছি, এখন বাংলাদেশে যারা খারাপ লিখছে না, ভালো লিখছে তাদের বিশাল একটা দল আপনাদের দুজনের স্নেহছায়া পেয়ে বড় হয়েছেন। আপনারা থাকায় তাদের প্রস্তুতিটাও হয়েছে বেশ মজবুত।

মোহাম্মদ রফিক: শোন,সেলিম এবং আমি,সেলিম মনে হয় চাকরিতে যোগ দিয়েছে আমার মাস ছয়েক আগে। আমি গিয়ে দেখি যে সেলিম আছে। তার আগে থেকেই ছিল আর কী! এবং আমি থাকতে থাকতেই ও মারা গেল। ওর সাথে আমার একটা অদ্ভুত সম্পর্ক ছিলো। সেটা আমি—

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: ঠিক মারা যাওয়ার পর পর আপনি একটি দৈনিকের পাতায় লিখেছেন, বড় আবেগঘন সে লেখা, তার শিরোনাম—

মোহাম্মদ রফিক: আমি মনে করি যে, আমি জানিনা আমাদের কাজ কতটা কী হয়েছে, কিন্তু আমি মনে করি আমাদের মধ্যে দেওয়ানেওয়াটা দুইজনকেই প্রচণ্ডভাবে সাহায্য করেছে। এবং সেলিম একদিন প্রান্তিকে আমাকে বলছে যে, আপনি কী লেখেন কী পড়েন তা জানতে আমি আপনার পেছনে স্পাই লাগিয়ে রাখি। এবং এই ধরণের ঘটনা কিন্তু বাংলাদেশে আর নেই।

মোহাম্মদ রফিকের বিখ্যাত 'খোলা কবিতা'র প্রচ্ছদশিমুল সালাহ্উদ্দিন: বিরল!

মোহাম্মদ রফিক: বিরল না শিমুল, নেই। দুইজন সৃষ্টিশীল লোক, যে মানেরই হোক, একজন তিনতলায় আরেকজন দোতলায় থাকতো শুরুতে, পরে ও দোতলায় আমি নীচতলায়, রুম থেকে বেরুলেই দুজনের চেহারা দেখা যেতো। তার আগে একজন দোতলায় আর একজন নীচতলায় চাকরি করছে। এই যে ঘটনাটা, আমার মনে হয় না যে বাংলাদেশে, কোন সাহিত্য চর্চায় এটা আর ঘটবে! আর আমার সেই অর্থে ইলিয়াস ছাড়া কোন বন্ধু না থাকলেও আমি সেলিমকে আমার বন্ধু মনে করি। কারণ, সেলিমকে দিয়ে আমি উপকৃত হয়েছি, সেলিমও উপকৃত হয়েছে। দুজনের চরিত্রগত ভাবে কিছু অমিল ছিলো। ওর চরিত্র ঠিক আমার সঙ্গে যেতো না আর কী!

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনাদের অনুসারীদলও তো ভিন্ন ছিলো স্যার।

মোহাম্মদ রফিক: অনুসারীরা কখনো আসল লোক হয় না। অনুসারীরা কখনোই বুঝবে না আসলে ওর সঙ্গে আমার সম্পর্কটা কী ছিলো! কিন্তু এমন ধরো আছে কেউ কেউ যারা দুইজনেরই অনুসারী ছিলো। যেমন আমি ফরিদীর নাম বলবো। ফরিদী যেমন ধরো দুজনের সাথেই তাল রেখে চলেছে। সুতরাং একেবারে যে আলাদা ছিলো তা না। এমনকী আনু মোহাম্মদ ও তাই। আনুর সাথে দুজনের সম্পর্কই খুব ভালো ছিলো। যদিও আনু ঠিক সৃষ্টিশীল লেখক না, স্কলার, অন্য জগতের লোক, এরকম আরো দু-একজন আছে যাদের উভয়ের সাথে ভালো সম্পর্ক ছিলো। তবে কবিতা কেন্দ্রিক যে সব সম্পর্ক তোমাদের সাথে, তোমাদের আমি অনুসারী মনে করিনি কখনো, তোমরা আমার সহযাত্রী। ফজল মাহমুদের কথা বলতে হয় যে মারা গেছে। ওর সাথে দুইজনেরই ভালো সম্পর্ক ছিলো।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: সুনীল সাইফুল্লাহ?

মোহাম্মদ রফিক: সুনীলের সাথে সেলিমের সম্পর্ক ছিলো না। সবসময় নিজের ভেতরে থাকতো। আত্মমগ্ন। ওর কিছু প্রবলেমের কথা ও আমাকে বলেছিল। আমার মনে হয় শেষপর্যন্ত ওর আত্মঘাতি হবার কারণও ওটাই। সুমন (রহমান), কফিল (আহমেদ) কিংবা (মাহবুব) পিয়ালের কথা বলতে পারো, ওরা যেমন আমার সাথেই আড্ডা দিতো বেশি। শামীমের (শামীম রেজা) আবার দুজনের সাথেই ভালো সম্পর্ক ছিলো।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: তো স্যার, দীর্ঘসময় শিক্ষকতা করে অবসর নিয়েছেন। জাহাঙ্গীরনগরের শিক্ষার্থীরা আপনাকে গ্রান্ড ফেয়ারওয়েল দিয়েছে, তা বিভাগে, বিভাগের বাইরে, উভয় জায়গায়ই।

মোহাম্মদ রফিক: ঐ প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে একটা কথা তোমাকে বলে নেই, মনে পড়েছে, আমরা যখন ষাটের দশকে লিখতে শুরু করেছিলাম, আমাদের মধ্যে এক ধরনের নির্বেদ এবং অবক্ষয়বোধ আমাদের মধ্যে কাজ করতো। সেটা কিন্তু সবার মধ্যেই ছিলো। এমনকী আমি রবীন্দ্রনাথের বলয়ে থাকলেও, আমার মধ্যেও সেটা কাজ করেছে। কিন্তু আমি সাতষট্টি সালে, আমি তখন চট্টগ্রামে চাকরি পেয়ে গেলাম। চট্টগ্রামের ভূমণ্ডল কিন্তু একটু আলাদা, পাহাড়, সমুদ্র, আমাদের দক্ষিণ বঙ্গ সেই তুলনায় সমতল।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: বাগেরহাট, খুলনা হয়ে চট্টগ্রাম!

মোহাম্মদ রফিক: হ্যাঁ, আমার মূল ভূমি কিন্তু দক্ষিণবাংলা, বরিশাল, বাগেরহাট এইসব জায়গা। বরিশাল বাগেরহাটের মধ্যে কিন্তু প্রাকৃতিকভাবে খুব একটা পার্থক্য নেই। যেটা আছে বরিশাল ও চট্টগ্রামের মধ্যে। যা বলতে চাচ্ছিলাম, তার পরে, তো সেই পাকিস্তানী নির্বেদ ও অবক্ষয়বোধ কাটিয়ে ওঠার একটা তাগিদ, অনুভব, চেষ্টা ছিলো আমাদের মধ্যে। আমার মধ্যে বিশেষ করে, বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের বক্তৃতা একটা বিরাট তোলপাড় ঘটিয়েছে। এবং এটা আমি লিখেছি একটা কবিতা, ব্যাঘ্রবিষয়ক এ। ঐ বক্তৃতা শোনার পরে আমার হঠাৎ মনে হলো আমি এতদিন শেয়াল ছিলাম, এই বক্তৃতা আমাকে বাঘে রুপান্তরিত করে দিল। তারপরই লেখা কবিতা ব্যাঘ্রবিষয়ক। আমি যে বঙ্গবন্ধুকে বাঘ বলেছি তা না, ঐ সাতই মার্চের ভাষণ শুনে আমার ভেতরে যে অনুভূতিটা হয়েছিলো সেটাকে আমি ঐভাবে ধরার চেষ্টা করেছি। সেই বক্তৃতাকে আমার মনে হয়েছিলো একটা শ্রেষ্ঠ কবিতা। আমার মনে হয়, যারা শুনেছিল সেই বক্তৃতা, তারা প্রত্যেকেই—

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: শৃগাল হইতে ব্যাঘ্রে রূপান্তরিত হইয়াছিলো!

মোহাম্মদ রফিক: হ্যাঁ। যখন পঁচিশে মার্চ পাকিস্তানীরা ক্র্যাকডাউনটা করলো তারপর আমি মানুষের যে চেহারা আমি দেখেছি, এটা আমি আমার ছাত্রদেরকেও বলেছি, সেই চেহারা আজকে আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় যখন আমি শুনি যে একটা গারো মেয়েকে ধর্ষণ করা হয়েছে, তখন আমি অবাক হয়ে যাই, কারণ বাঙালি এমন নয়। আমি এই জাতির সবচেয়ে বড় বিপদের সময়ও তাদের যে চেহারা দেখেছি, এই চেহারা তাদের ছিলোনা।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনার দেখা চেহারা কেমন স্যার?

মোহাম্মদ রফিক: এটা শুনলেই বুঝতে পারবে। ক্র্যাকডাউনের পরে আমরা যখন ভারত যাচ্ছি পালিয়ে, আমাদের দলে কমসে কম দুইশো জন লোক ছিলো। তাদের ভেতরে ৬৫ বছরের বিধবা থেকে শুরু করে, ১৬, ১৭ বছরের নারী পর্যন্ত ছিলো। আমরা টিলাময় রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি, হঠাৎ করে বৃষ্টি হলো। রাস্তা ভয়ঙ্কর পিচ্ছিল হয়ে গেল। কেউ পা ফেলতে পারছে না। পা পিছলে যাচ্ছে। তখন আমাদের যে লিডার ছিলেন, তিনি বললেন, আপনারা একজন আরেকজনের মাজায় ধরেন। আমার সামনেই একজন তরুণী ছিলেন, ১৭/১৮ বছর বয়স হবে,

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনার গল্পসংগ্রহে এই যাত্রা নিয়ে একটা দুর্দান্ত গল্প আছে।

মোহাম্মদ রফিক: হ্যাঁ, গল্পে আমি লিখেছি, তো, সেই তরুণী, আমি খুব ইতস্তত করছি তাকে ধরতে, সে আমাকে বললো, আপনি তো পড়ে যাবেন, আপনি আমাকে ধরেন, হ্যাঁ, এবং জানো, আমার তাকে ধরে কিছুই মনে হলো না। এবং তারপর আমরা যখন ইসে, বর্ডার পাড় হবো, লিডার বললেন, আপনারা যে দুই পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে যাবেন, এই কাপড়চোপড় পড়ে তো আপনারা পার হতে পারবেন না। পাহাড়ের চূড়ায় পাক আর্মির টহলচৌকি আছে, দেখলেই গুলি করে দেবে। এবং গুলি চালালে সব মারা পড়বেন। সুতরাং যেতে হলে আপনাদের সব কাপড় খুলে ফেলতে হবে। মেয়েরা শুধু ব্রা-পেন্টি রাখতে পারবে। আর ছেলেরা শুধু আন্ডারওয়্যার। আর কিচ্ছু না। সেই অবস্থায় যখন আমরা পার হচ্ছি। বৃষ্টি হচ্ছে। তখন ঐ যে ৬৫বৎসরের বিধবা ছিলেন, তিনি পা পিছলে একেবারে কাদায় পড়ে গেলেন। আমি ধরতে গেলাম, দেখি পাঁচ ছয়টা যুবক একসাথে ধরতে এসেছে। তাদের বয়স আমার চেয়ে কম। ওরা বললো, আমরা থাকতে আপনি কেনো? আমিও যুবকই কিন্তু তখন। আমি কিন্তু তখন মাত্র ২৯।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আমার এখনকার বয়সী স্যার।

মোহাম্মদ রফিক: আমি বললাম যে ঠিক আছে, ধরেন সব ধরেন। সবাই ধরে তাকে প্রায় কাঁধে করে, ঘাঁড়ে করে নিয়ে যাওয়া হলো। এতগুলো মানুষ আমরা পার হলাম, যাওয়ার পর আমি একজনের মুখ কালো দেখলাম না, সবাই হাসিমুখ, কেউ বলতে পারলো না যে কেউ কারো সাথে কোন খারাপ ব্যবহার করেছে। আমরা পঁচিশে মার্চের পরে যে বাড়িতে আশ্রয় নিলাম, সেই বাড়িতে , ছোট্ট একটা বাড়িতে বিশ্বাস করবা না, গরিব গৃহস্থের বাড়ি, সুজিত দস্তিদারের বাড়ি, ৯৯জন লোক আশ্রয় নিলো, তাদের খাওয়াও জুটলো, সবই জুটলো। সারাবছরের খোরাকের গোলা খালি করে দিয়ে। এবং কয়েকদিন পরে দেখা গেলো আর কিছুই নাই। ভদ্রলোক বাড়িতে আমাদের রেখে পটিয়ার বাজারে বাজার করতে গেলেন, সেই দিন পাকিস্তানী আর্মি বম্বিং করলো ঐ এলাকায়। তার উরুতে স্প্লিন্টার লাগলো, উরুতে এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে গেলো। আহত অবস্থায় সুজিত দস্তিদার আশ্রিতদের জন্য বাজার নিয়ে, চাল ডাল নিয়ে বাড়ি ফিরলো। এবং সেইদিন আমাদের ক্যাপ্টেন হারুন ছিলো, পরে তো সে মেজর জেনারেল টেনারেল হয়ে রিটায়ার করেছে, হারুন আহত হয়ে ঐ পটিয়ায় হেল্থ কম্প্লেক্সে চিকিৎসা নিতে আসলো। আমি দেখতে গেলাম। ঐখান থেকে ফিরছি, দেখি এক ভদ্রলোক, বুক পর্যন্ত শুভ্র শাদা বড় দাঁড়ি, কাঁদছে আর মোনাজাত করছে— “হে আল্লাহ, এই জালেম পাকিস্তান তুমি ধ্বংস করে দাও’। আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে দেখি তার দুচোখ বেয়ে ঝরঝর করে পানি পড়ছে। খুব সম্ভ্রান্ত উচ্চবংশের মুসলমান হবেন। তার চোখে পানি দেখে আমি দাঁড়ালাম। উনি মোনাজাত শেষ করলেন, বললেন, খোকা তুমি কে? আমি পরিচয় দিলাম। বললাম যে দস্তিদার বাড়িতে থাকছি। উনি বাড়ির পথ বলে দিয়ে বললেন, তুমি আমার বাড়িতে এসো। সন্ধ্যাবেলায় আমি গেলাম। তখন উনি আমাকে বললেন, দেখেন, আপনি আমাকে কানতে দেখে মনে হয় অবাক হয়ে গেলেন! শোনেন, এই পাকিস্তানের জন্য আমরা কী না করেছি! শুধু জান দিতে বাকী রেখেছি। আর সবই তো করেছি। কিন্তু আজকে এই পাকিস্তান একটি জালেম রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। সেইদিনই আমি বুঝলাম যে পাকিস্তান থাকছে না। মানে আমার মধ্যে বিশ্বাসটা বদ্ধমূল হলো, এই পাকিস্তানের ভাঙন অবশ্যাম্ভাবী।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: স্যার সাতই মার্চে তো—

মোহাম্মদ রফিক: পাকিস্তানের মৃত্যু হয়ে গেছে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আমি বলছিলাম, স্বাধীনতার ঘোষণা একভাবে চলে এলো—

মোহাম্মদ রফিক: অবশ্যই, যদি কেউ অস্বীকার করতে চায় আমি বলবো তার কোন বোধ নেই। মনে রেখো ইতিহাসের বহুকথা অব্যক্তই থেকে যায়!

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: রূপকার্থে থেকে যায় স্যার!

মোহাম্মদ রফিক: হ্যাঁ রূপকার্থে থেকে যায়! সুতরাং ঐ রূপক বাস্তবের চেয়ে অধিক বাস্তব।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: স্যার, সাতই মার্চের পর শৃগাল থেকে ব্যাঘ্রতে পরিণত হলেন—

মোহাম্মদ রফিক: তুমি যদি আমার আগের লেখা পড়ো, ‘বৈশাখী পূর্ণিমায়’ ও ‘কীর্তিনাশা’ যদি মিলিয়ে পড়, তাহলে বুঝবে আমি নতুন জন্ম নিয়েছি। তোমাকে তো আমি বলেছি, মুক্তিযুদ্ধ নতুন আমাকে জন্ম দিয়েছে। এবং আমার পিতা শামসউদ্দীন আহমেদ, কিন্তু পুর্নজন্মের পিতা হচ্ছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

কবি মোহাম্মদ রফিক, ষাটের দশকেশিমুল সালাহ্উদ্দিন: স্যার, আপনি তো মুক্তিযুদ্ধের সময়ে এক নম্বর সেক্টরের সাথে যুক্ত ছিলেন, এবং পলিটিকাল অফিসার হিসেবে ছিলেন। এই বিষয়গুলো নিয়ে আপনি কখনোই প্রকাশ্যে বলেননি, দেনা-পাওনার হিসেব করেন নাই। অনেক কবিসাহিত্যিকই সেটা করেছেন, সুবিধা নিয়েছেন। এই বিষয়গুলো আপনি কখনোই রাজনীতিক ভাবে কাজে লাগান নাই, বা তুলে ধরেন নাই। কেনো?

মোহাম্মদ রফিক: না, এটা তো আমার কাজ না। আজকে আমি তোমাকে বলি, অনেক জায়গায় আমি বিভিন্নভাবে কাজ করেছি। যেমন বগুড়া, রাজশাহীতেও আমার ভূমিকা আছে, রাজশাহীতে অনার্স তৃতীয় বর্ষে থাকা অবস্থায় আমাকে বের করে দেয়া হয়েছে, রাস্ট্রিকেট করা হয়েছে, আমি যে আজকে আমার এ অবস্থানে পৌঁছেছি, সেটা আমার কর্মগুণে, ভাগ্যগুণে বলবো না। সেসব কথা আমাকে কখনো লিখতে হবে, ভাবিনি। সে আবার আরেকধরনের ইতিহাস। এসব কথা যে আমাকে বলতে হব তা আমি কখনো বিশ্বাস করতাম না। আমি মনে করতাম আমার ব্যক্তিকর্ম অন্তরালে থাক, আমার লেখাই সামনে আসুক।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: কিন্তু ব্যক্তির যে যাপন বা প্রভাববলয় তা অনেকসময় লেখকের লেখায়ও ভূমিকা রাখে।

মোহাম্মদ রফিক: এখন মনে হয় রাখে। এসব আমি এখন না হয় ভবিষ্যতে যদি সময় পাই কিছু কিছু লিখবো।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: মুক্তিযুদ্ধের ঐ সময়টার আপনি যে ঘটনাগুলো বললেন, আপনি গেলেন এবং ষোলই ডিসেম্বর আমরা—

মোহাম্মদ রফিক: আচ্ছা, তুমি মুক্তিযুদ্ধের ঘটনার কথা বলছো, আমি তখন এক এক নম্বর সেক্টরে কাজ করি, মেজর রফিক তখন এক নম্বর সেক্টরে ছিলেন। আমি সেখানে কাজ করতাম বেতনও পেতাম। পরে আমি সেখান থেকে গিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতারে কাজ করা শুরু করি। কিন্তু এসব ব্যাপার মিলিয়ে আমি যে মুক্তিযুদ্ধে সক্রীয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছি, তার কাগজপত্র তো আমার কাছে ছিলো। পরে আমি যখন ঢাকায় এসে নামলাম, আমার মনে হলো আমি তো এই কাগজপত্রগুলো আমার নিজের সুবিধার্থে ব্যবহার করতে পারি। কিন্তু আমি মুক্তভাবে এইদেশ থেকে গিয়েছিলাম, মুক্তভাবে ফিরতে চেয়েছি। সমস্ত কাগজপত্র রানওয়েতে উড়িয়ে দিয়ে আমি দেশে প্রবেশ করেছি। ঢুকে দেখলাম, আমি মনে হয় দেশে ফিরলাম এগারোই জানুয়ারি, ১৯৭২, তখন সেখানে আমাকে অনেক কিছু বুঝিয়ে দিতে হয়েছিলো বলে ফিরতে একটু দেরি হয়। ফিরে দেখি, আমার চাকরি নেই। আমি তখন নোমান সাহেবের কাছে যাই। উনি তখন শিক্ষা দপ্তরের দায়িত্বে আছেন। আমি গিয়ে বললাম, স্যার আমার তো চাকরি নাই। তিনি হাসতে হাসতে বললেন, আমি জানি তুমি দেশের জন্য কী করেছো। সুতরাং তুমি যাও, তোমার চাকরি আছে। আমি গিয়ে চিটাগং এ যোগ দিলাম। যাওয়ার কিছুদিন পর— আমি আবার নোমান স্যারের প্রিয় ছাত্র, আমি, ইলিয়াস (আখতারুজ্জামান) উনার ছাত্র, মান্নান (সৈয়দ) উনার ছাত্র। আমি ঢাকা কলেজে আসলাম। এক লোক আমার কাছে আসলেন। তিনি বললেন তিনি মুক্তিযোদ্ধা। আমি তখন অবাক হলাম। কী বলেন এসব। আমি আপনাকে একুশ না জানি ছাব্বিশে ডিসেম্বর কফি হাউসে দেখেছি, আপনি তখন আমাকে বলেছেন, আপনি ঐ দিনই দেশ থেকে এখানে এসেছেন, তাহলে আপনি কিভাবে মুক্তিযোদ্ধা হন! তিনি, হে হে করছেন, আমতা আমতা করছেন, আমিতো, অবাক। তখন আমি তাকে বললাম, আমি তো জানি আপনি মুক্তিযোদ্ধা না। আসলে আমি এটাও জানি, এদেশে অনেক মুক্তিযোদ্ধা আছেন, যারা সত্যিকার অর্থেই মুক্তিযোদ্ধা, যাদের কোন সার্টিফিকেট নেই, এবং আমরা করলাম কী! আমরা মুক্তিযুদ্ধের পর সকল যোদ্ধাদের অস্ত্রহীন করে গ্রামে গ্রামে, তাদের গ্রামে পাঠিয়ে দিলাম, দিয়ে দেশটাকে দখল করার চেষ্টা করলাম। এখান থেকেই আমাদের বিয়োগান্তক কাহিনির শুরু। আমার কিছু গল্পে এসব ঘটনা আছে। এবং লেখার চেষ্টা করেছি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: স্যার মুক্তিযুদ্ধের ৪৪ বছর চলে গেছে। আমরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছি। এবং বিশ্বরাজনীতিতেও আমরা অবদান রাখতে শুরু করেছি।

মোহাম্মদ রফিক: আরো অনেক অবদানই আমাদের থাকবে। আমি তোমাকে একটা কথা বলি, তুমি যখন আমাকে এই প্রশ্নটি করেছো তখন আমি বুঝেছি, আমি যখন আইওয়াতে গেলাম, তখন আমার কাছে ব্যাপারটি স্পষ্ট হলো। বিশেষ করে লাটিন আমেরিকা বা আফ্রিকা বা অন্যান্য দেশের লেখকদের সাথে আমার বন্ধুত্ব হলো। আমি বোঝালাম তাদের বললাম, তারাও জানতে আগ্রহী হলো, আমি তখন বুঝলাম, বাংলাদেশ সম্পর্কে তাদের এত উৎসাহ কেনো! আমরা সাধারণত বলে থাকি, আমাদের দেশে গ্যাস তেল পাওয়া যায়, এসব তাঁরা দখল করতে চায়। কথাটা কিছুটা হলেও সত্য। তুমি দেখো, পৃথিবীর এই যে মানচিত্র, এই মানচিত্র তৈরি করেছেন কারা?

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: ব্রিটিশরা

মোহাম্মদ রফিক: শুধু ব্রিটিশরাই নয়, পশ্চিমারাও। আমরা যাদের পশ্চিমা বলি, আমাদের দেশের সীমারেখা নিয়ে যাদের সমস্যা, আবার ভারতের সাথে চীনের, বা চীনের সাথে অন্যান্য দেশের। তেমনি লাতিন আমেরিকায়ও সীমান্ত সমস্যা আছে। তারা ইচ্ছাকৃতভাবে এ সমস্যা লাগিয়ে রেখেছে। এখানে শুধু বৃটিশরা একা না, টোটাল পশ্চিমা জগত। তার সাথে যুক্ত আমেরিকাও। এখন আমাদের এখানে কারা সমস্যা তৈরি করেছেন, লাইবেরিয়ায় কারা তৈরি করেছে, ওরা। আর বাংলাদেশ তৈরি করেছে কারা! স্বাধীন করেছে কারা?

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আমরা।

মোহাম্মদ রফিক: তবে এটা ঠিক যে আমরা ভারতের কাছ থেকে সাহায্য নিয়েছি, রাশিয়ার কাছে সাহায্য নিয়েছি। আর আমেরিকাও যখন স্বাধীন হয় তখন তারা ফ্রান্সের কাছে সাহায্য নেয়নি? পৃথিবীর প্রত্যেক দেশই তাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে অন্য দেশের সাহায্য নেয়। আমরাও নিয়েছি। তাতে এটাকে বড় করে দেখার কিচ্ছু নেই। কিন্তু আমাদেরকে স্বাধীন করেছি আমরা। এটা আমাদের আত্মশক্তির জায়গা। এবং এই জায়গাটার কথা ওরা জানে। এবং ওরা জানে, আমরা যদি দাঁড়াই মাথা তুলে, আমরা পৃথিবীটাকে কাঁপিয়ে দিতে পারি। শোন, তোমাকে আমি একটা কথা বলি, যে কথা আমি আমেরিকায় গিয়ে বক্তৃতায় বলেছি, নোবেল পুরস্কার যদি কোন সভ্যতার মাণদণ্ড হয় তবে আমরা বাঙালিরা তোমাদের চেয়ে তেইশ বছর এগিয়ে আছি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: কীভাবে?

মোহাম্মদ রফিক: আমরা বাংলাতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছি ১৯১৩সালে, আর তোমরা (আমেরিকানরা) পেয়েছো ১৯৩৬ সালে। সো, ডোন্ট ফরগেট ইট। এবং আমি বলি, আজ রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কারটি শুধু রবীন্দ্রনাথের জন্যই সৌভাগ্য বহন করে না, সমগ্র বাঙালী জাতীর জন্য এই সৌভাগ্য বহন করে নিয়ে এসেছে। এটা কেউ ভাবে না! রবীন্দ্রনাথকে নোবেল দেয়ার পেছনে বৃটিশ শক্তি কাজ করেছে। আর ওরা ভেবেছিল রবি দ্বারকানাথ ঠাকুরের বংশধর, জমিদার, আমরা ওকে পার্মানেন্টলি আমাদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারবো। কিন্তু সেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যার প্রতিবাদে নাইট উপাধী ত্যাগ করলো, এবং যখন চিঠিটি লিখলো, প্রত্যাখ্যানের, এক কথায় অসাধারণ। ওদের মুখের মধ্যে থুতু মেরে দিলো। তখন তারা বুঝলো, আরে, এটা কী হলো! তারপরের কাজটা করলো সুভাষ বসু। সুভাষ বসু যখন তাদের চাকরি লাথি মেরে চলে আসলো, তখন তারা বুঝলো, খবরদার, বাঙালিকে তো একসাথে রাখা যাবে না। রাখলে ওরা আমাদের উপরই খবরদারী করবে। সো, ডিভাইড এন্ড রুল। তুমি দেখবে ওরা একই ভাবে চেষ্টা করেছে রবীন্দ্রনাথ যেনো নাইট পায়, আবার জগদীশ চন্দ্র বসু যেনো নোবেল না পায়। তারা সাহিত্যে নোবেল পাওয়ার চেয়ে বিজ্ঞানে নোবেল পাওয়া অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সেদিন যদি জগদীশ চন্দ্র বসু নোবেল পেয়ে যেতেন, তাহলে এর প্রভাব বাঙালী জাতীর উপর অন্যরকমভাবে পড়তো। তখন হয়তো হিন্দু মুসলমান রায়ট বা ৬৫ এর ভারত পাকিস্তান যুদ্ধ সম্ভব হতো না। এবং ধরো, আমরা ই.ইউ বিরোধী বা ইহুদী বিরোধী, ইহুদীরা যে কাণ্ডকারখানা করেছে, তাতে আমরা তাদের বিরোধী না হয়ে পারি না। কিন্তু আমরা চাই ইহুদীরা তাদের অধিকার পাক। অবশ্যই পাক। সেটা কারো প্রতিশ্রুতির ভেতর দিয়ে না , তারা নিজেদের যোগ্যতায় সেটা পাক। তবে ইহুদীরা পৃথিবীতে চেতনার দিক দিয়ে বিরাট শক্তি। মানুষ শুধু অস্ত্র দিয়েই পৃথিবী শাসন করে না। এক অর্থে ইহুদীরাই পৃথিবী শাসন করছে। কারণ আমেরিকা যে খবরদারী করে সেটা তৈরি করেছে কারা!

বাংলা কবিতার ধ্রুপদি পথচলার সারথী ছিলেন কবি মোহাম্মদ রফিক

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: ইংরেজরা।

মোহাম্মদ রফিক: একটা কথা, আজ যদি বাংলা অবিভক্ত থাকতো, তাহলে দেখতে এ অঞ্চলের শুধু নয়, পৃথিবীর চিন্তা চেতনার সর্বক্ষেত্রে অধিকারটা বাঙালির ই থাকতো। এবং সেটাকে ভাঙার জন্য ১৯১৯ সাল থেকে ইংরেজরা উঠে পড়ে লেগেছে। সেটা তারা বাস্তবায়ন করেছে। তুমি তাকালে দেখবে ১৯৩৬ এর আগে হিন্দু মুসলমান মারামারি হয়েছে? মারামারি তো অন্য বিষয়, জমি নিয়ে মারামারি বা সীমানা নিয়ে মারামারি, কিন্তু যাকে বলে সাম্প্রদায়িক দাঙা, সেটা কিন্তু ৩৬এর আগে এ অঞ্চলে হয়নি। এবং এটা ইংরেজের একটা প্লান। শুধু ইংরেজরা বলবো না, সমস্ত ঊপনিবেশবাদীরা চক্রান্ত করেছে। এবং তারা বুঝাতে চেয়েছে আমরা অসভ্য, আমরা অমুক তমুক, আমরা এটা জানিনা, সেটা জানি না। তারা সব জানে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: স্যার, অরুণ সেনের মতো লোক আপনার কবিতা নিয়ে অসাধারণ দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখেছেন। সনৎ কুমার সাহা, গতবছর একুশে পুরস্কার পেলেন, নিয়মিতই লিখেছেন আপনার উপর। তথাপি, আমাদের সমালোচনা সাহিত্যে তো, আসলে সংকট আছে, তার মধ্যে এই পাওয়াগুলি কিভাবে দেখেন?

মোহাম্মদ রফিক: তখন তো তোমাকে বললাম, ইদানিং শুনছি যে সুধীর চক্রবর্তী লিখেছেন। আম লেখাটা হাতে পাইনি। হাতে পেলে তোমাকে বলতাম। সেখানে তিনি বলেছেন, আমি শুনেছি ঐ পত্রিকায়, আমার কপিলা উনার ভাললেগেছে। আমার কিন্তু ঐ ব্যাপারে কোন দুঃখ নেই। আমি বাংলা সাহিত্যের দুজন প্রধান লেখক, অরুণ মিত্র তারপর আবদুল কাদীর সাহেব তাদের প্রশংসা পেয়েছি। আমাকে মুখোমুখি বলেছেন, অন্যের সামনে বলেছেন।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: জ্বি স্যার। অন্য একটা প্রসঙ্গে যাই। সেটা হলো আপনিতো বললেনই স্যার, যে বাংলা কবিতায় আপনি হলেন রবীন্দ্রবাদী।

মোহাম্মদ রফিক: রবীন্দ্রবাদী মানে ঐ বলয়ের।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: ঐ বলয়টা স্যার কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

মোহাম্মদ রফিক: বৈষ্ণব পদাবলী বা গীতিকা বা আমার ইতিহাস হল বাঙলার সংস্কৃতি। বাঙলার যে আবহমান সংস্কৃতি লালন এবং যার ভিতরে এবং বিশেষ করে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের একটা বিরাট ভূমিকা আছে, তুমি দেখো, যে এই দক্ষিণাঞ্চলই কিন্তু সেই অর্থে, এক অর্থে বাঙলার সংস্কৃতিকে তৈরি করেছে। তুমি মাইকেল বলো, রবীন্দ্রনাথ বলো, লালন বলো এরা সবাই এখান থেকে উঠে এসেছেন। হাসন রাজা বলো, সবাই কিন্তু এখান থেকে উঠে আসছে। দক্ষিণবাংলা বাঙলার জল, মাটি হাওয়ার বাঙলা। এবং আমি চেয়েছি, আমি মনে করি, আর্টারী, এই রক্তনালী যাকে বলে। বাঙলার রক্তনালী হচ্ছে বাঙলার নদী, বাঙলার জল এবং আমি চেয়েছি যে আমার কবিতায় যেন শেষ পর্যন্ত জল কথা বলে, নদী কথা বলে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: হাওয়া কথা বলে!

মোহাম্মদ রফিক: হাওয়া কথা বলে, মাঝি কথা বলে, পাখি কথা বলে, পাখি কথা বলে। হ্যাঁ, আমি এটাই চেয়েছি এবং আমি এখনও যদ্দিন আমি বেঁচে থাকবো, এটাই চেষ্টা করে যাবো।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: সংলাপের কিছু ব্যবহার আপনি কবিতায় খুব সফলভাবে করেছেন এবং সেটা এমন একটা সময়, ষাটের দশক মানে হলো, ষাটের দশক থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কবি আমাদের সাহিত্যে দাঁড়িয়েছেন নিজেদের স্বাতন্ত্র নিয়ে। আপনি স্যার সংলাপের এক ধরণের মজার ব্যবহার করেছেন, যেমন কপিলা বা গাওদিয়া কিংবা রূপকথা কিংবদন্তী র মধ্য দিয়ে যেগুলো আছে। যেমন— প্রথম ও দ্বিতীয় বইয়ের মধ্যেও সেই জিনিসগুলো আছে। যেটা জানতে চাই স্যার, ষাটের দশকের পরে সত্তর, আশি, নব্বই , এই সময়ে আমরা আসলে সেইরকম শক্তিমান কবি আর সেভাবে পাচ্ছি না। ষাটের দশকের মধ্যে আসলে কি এমন জাদু ছিলো যে আপনারা এতগুলো মানুষ আলাদাভাবে দাঁড়ালেন।

মোহাম্মদ রফিক: সেই কথা বলতে গেলে তুমি সারা পৃথিবীর দিকে তাকাও। সারা পৃথিবীতে কিন্তু ষাটের দশক একটা সাড়াজাগানো সময়। তোমাকে যদি আমি জিজ্ঞেস করি যে তুমি গত পঞ্চাশ বছরে একজন দার্শনিকের নাম বলোতো, যার প্রভাব সারা পৃথিবীতে পড়েছে?

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: জাঁ জাঁক রুশো, জাঁ পল সার্ত্রে

মোহাম্মদ রফিক: না না, গত পঞ্চাশ বছরে তৈরি হয়েছে?

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: স্যার গত পঞ্চাশ বছরে তৈরি হয়েছেন এমন দার্শনিক তো স্যার ফ্যুকো, দেরিদা—

মোহাম্মদ রফিক: কিন্তু আজকে তুমি ভাবতে পারবে না, আমাদের সময়ে, তখনকার ইসে, এই ধরো সার্ত্রে, কামু প্রবল প্রতাপ নিয়ে এলেন। শুধু তাই না আমাদের অঞ্চলেও ধরো, এবং ষাটের দশকে সারা পৃথিবী তারা শাসন করেছে। যেমন সুয়েকার্নো, যেমন জওহর লাল নেহেরু, আজকের অমিতাভের মতো নায়ক আর আছে? হ্যাঁ, ষাটের দশকে ফ্রিদেল ক্যাস্ট্রো পৃথিবীতে এসেছে, আমাদের বঙ্গবন্ধুর উত্থান হয়েছে। এইসব ঘটনাতো সব মিলিয়ে ষাটের দশক তৈরি হয়েছে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: বটেই কিন্তু স্যার—

মোহাম্মদ রফিক: এবং তারপরে মুক্তিযুদ্ধের মতো একটা বড় ঘটনা ঘটে গেছে। এবং মনে রেখো কোনও কবি কিন্তু নিজে নিজে তৈরি হয় না, কবি হয়তো একটা ব্যক্তিগত প্রতিভার স্ফুরণ। কিন্তু সেই ব্যক্তিগত স্ফুরণটা কিন্তু নিজে নিজে খুব একটা ঘটে না। যতটা তার সমাজ বা আশপাশ তৈরি করে। একটা বলয় প্রয়োজন হয়, এই বলয়টা হারিয়ে যাচ্ছে ইদানিং। তা তুমি কি করে আশা করো যে, এখনও একজন লোক শুধুমাত্র নিজের ইসের বলে একটা বিরাট কাজ করে ফেলবে? সে সম্ভব না।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: স্যার আমি মনে করি আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার এবং আহসান হাবীব এদের একটা প্রভাব আপনাদের মধ্যে মানে ষাটের দশকের কবিদের মধ্যে ছিল।

মোহাম্মদ রফিক: না এই কথাটা আমি মোটেও মানতে রাজী না। ঐভাবে না।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: সম্পাদনার প্রভাব।

মোহাম্মদ রফিক: আমাদের সময় শ্রেষ্ঠ সম্পাদক ছিলেন সিকানদার আবু জাফর। তুমি এই নামটা বলতে ভুলে গেছ।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: হ্যাঁ আমি বলতে ভুলে গেছি। স্যরি স্যার।

মোহাম্মদ রফিক: হ্যাঁ এবং যদি লেখক তৈরি করে থাকেন সেইটা একমাত্র সিকানদার আবু জাফর ভাই। সায়ীদ সাহেব যেটা করেছেন, সায়ীদ সাহেব সম্পর্কে খুব একটা উচ্চ ধারণা আমার নেই। আমি সায়ীদ সাহেবের ছাত্র। এবং তিনি কিন্তু রাজনৈতিকভাবে খুব প্রতিক্রিয়াশীল লোক। এবং তিনি ছাত্র জীবনে মুসলিম লীগের ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং ওঁ যখন রাজশাহী কলেজের শিক্ষক হয়ে যায়, তখনও গিয়ে সরাসরিভাবে প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আঁতাত করেছেন। এবং তাঁকে, আমি যখন ভিপি ছাত্র ইউনিয়নের, তখন আমি তাঁকে কলেজ থেকে বিতাড়িত করেছি। সুতরাং...

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনার শিক্ষক হওয়া সত্ত্বেও?

মোহাম্মদ রফিক: শিক্ষক হওয়া সত্ত্বেও। এবং কারণ তখন আমরা জীবন মরণ সংগ্রামে আইয়ুব শাহীর শাসনের বিরুদ্ধে। তখন আমাকে মার্শাল ল-এ আটকে জেলে পাঠানো হয়। এবং তুমি একটা কথা মনে রেখ , এখানে যখন আমাকে আর্মি নিয়ে গিয়েছিল—

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এরশাদের আমলে?

মোহাম্মদ রফিক: হ্যাঁ, তখন আমি তাদেরকে বলেছি যে আমাকে জোর করে বা চোখ রাঙিয়ে ভয় দেখাতে পারবেন না। কারণ আপনি কাগজ খুলে দেখেন যে, আমি যখন ছাত্র, এই দেশে কিন্তু মার্শাল ল কোর্টে প্রথম যাদের বিচার হয়েছে তার প্রথম নাম্বার আসামী আমি। আমার মার্শাল ল কোর্টে দশ বছর সশ্রম কারাদণ্ড হয়েছে, ১৯৬২ সালে। হ্যাঁ। এবং আমার কোর্টে যিনি প্রিজাইডিং অফিসার ছিলেন সেটা পাকিস্তান আর্মির একজন বিগ্রেডিয়ার ছিল এবং আপনার প্রধান যিনি ওঁকে দেখলে ওঁর রুমেও ঢুকতে সাহস করতেন না। ওঁকে স্যার স্যার বলে মুখে ফ্যানা তুলে দিতে হত। এবং সেই লোক আমাকে যখন শেষে দশ বছর সশ্রম কারাদণ্ড দেয় তখন পুলিশ রিপোর্ট করা হয়। আমি হচ্ছি কমিউনিস্ট পার্টির মেম্বার। তিনি বোধহয় জীবনে কমিউনিস্ট দেখেন নি। তিনি বোধহয় ভাবতেন যে কমিউনিস্টরা সবসময় আন্ডারগ্রাইন্ডে থাকে। তিনি তাঁর এজলাস থেকে নেমে এসেছেন এবং আমার দিকে তাকাচ্ছেন। আমি হাফ প্যান্ট পড়ে দাঁড়িয়ে আছি। আমি তখন প্রথম বর্ষ অনার্সে ভর্তি হয়েছি। তখন রাজশাহী ইউনিভার্সিটিতে অনার্স ছিল না। অনার্সটা পড়ানো হত রাজশাহী কলেজে। আমি তখন হাফ প্যান্ট পড়ি। তিনি নেমে দেখছেন যে, হাফ প্যান্ট পড়া একটা ছেলে কমিউনিস্ট।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: হা হা হা।

মোহাম্মদ রফিক: হা হা। আমি এই কাহিনী কিন্তু ওদেরকে বলি।

কীর্তিনাশা, বাংলা সাহিত্যে মোহাম্মদ রফিকের অমর কীর্তিশিমুল সালাহ্উদ্দিন: এই কাহিনীটায় ই তো স্যার আসবো। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা আপনার জীবনে। খোলা কবিতা যখন লিখা হল, এরশাদের বিরুদ্ধে, স্বৈরাচার এরশাদের বিরুদ্ধে, আসলে এই বিশাল আন্দোলন এবং সেই আন্দোলনে খোলা কবিতা বিশাল ভূমিকা রেখেছিল। হাজার হাজার শ্রমিক জনতার সামনে আপনি কবিতা পড়েছেন। হাজার হাজার কপি বিক্রি হয়েছে। এটা বোধহয় আপনার জীবনের অন্যতম বড় ঘটনাগুলির মধ্যে একটি।

মোহাম্মদ রফিক: অবশ্যই। আমার খোলা কবিতা সম্ভবত আমার সর্বাধিক প্রচারিত কবিতা।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: সেই ঘটনাটা মানে ঐ দিনের ঘটনাটা আমি জানতে চাই, যেদিন আপনি প্রথম—

মোহাম্মদ রফিক: এখন প্রশ্ন হচ্ছে যে তোমার মনে নেই, এরশাদ যখন প্রথম ক্ষমতায় আসলো, ৮৩ সালের মনের হয় জুন, জুলাই, টুলাই হবে, আমি এখন ভুলে গেছি। তো তখন কিন্তু কোন দল ই, প্রথম এরশাদের বিরুদ্ধে মুখ খোলেনি বাংলাদেশে। হ্যাঁ বিএনপি বল, আওয়ামী লীগ বল, কমিউনিস্ট বল, কেউই না। আমি সেদিন খুলনা আজম খান কলেজে। ছাত্র ইউনিয়নের অনুষ্ঠানে গেছি তাদের প্রধান অতিথি হিসেবে সম্মেলনের বক্তৃতা দিতে। তো পরদিন আবার ঢাকায়, তখন আমার চুল বড় তো, দেখি যে, যশোর থেকে আর্মি যাচ্ছে। আমি একটু অবাক হলাম, আর্মি যায় কেন? তারপরে দেখি, ফরিদপুরে এসেছি, এসে ফরিদপুরে বাস থামিয়েছে, নেমে আমি একটু চা খেতে বসেছি। দেখি লোকজন আমার দিকে ইয়ে মানে খুব অন্যরকমভাবে তাকাচ্ছে। আমি খুব সংশয়ে পড়ে গেলাম। তো একজন বয়স্ক লোক উঠে এসে আমার পাশে বসে বসল, আমতা আমতা করে বললো, আপনি কোন পীরের মুরিদ? বললাম, না আমি কোন পীরের মুরিদ না। কিন্তু আপনাকেতো বলতে হবে যে আপনি অমুক পীরের মুরিদ। আমি বললাম, কেন? বললো, আপনার যে বড় বড় চুল। আমি বললাম কি হয়েছে?, বললো, আপনাকে তো ঘাট আর্মি এসে ধরবে, পুলিশ চুল কেটে দেবে। আমি বললাম- কেন? বলল, জানেন না যে, আর্মি, পুলিশ নেমেছে। মার্শাল ল জারী হচ্ছে এবং চুল কাটছে, তো আমি খুব লজ্জিত বোধ করলাম, মানে খুব খারাপ লাগলো যে, আমার চুল কাটবে? তো আমি , যাই হোক, আমি মনে খুব আতঙ্ক নিয়ে আমি এসে পৌছালাম। জাহাঙ্গীরনগর এসে পৌঁছালাম। তার কয়েকদিন পরে দেখি পত্রিকায়, মনে হয় দৈনিক বাংলায়, প্রথম পৃষ্ঠায় দেখি এরশাদ সাহেবের কবিতা। এবং ভালবাসা বিষয়ক। আর সেটি কিছু হয়নি, মানে কবিতার। এবং আমি ইন্টারোগেশনে সেই আর্মি অফিসারকে বলেছিলাম, এই কবিতা যদি আপনি লিখতেন, এই কাগজে ছাপা হত? উনি বললো- না। তাহলে আজকে কেন এই প্রথম পাতায় কেন ছাপা হল? যাই হোক তারপরে বলি, আমি খুব অবাক হয়ে গেলাম, যে বাঙালী ভালবাসায়, আমি মনে করি যে ভালবাসার চেতনায় বাঙালী খুব সমৃদ্ধ, সেটা নিয়ে হাসি তামাশা করা এবং সর্বত্র এরা আমাদের মূল্যবোধকে ধ্বংস করে দেয়ার প্রকল্প নিয়ে নেমেছে। মানে মার্শাল ল জারী হওয়া না। মূল্যবোধগুলোকে ধ্বংস করে দেয়ার ব্যবস্থা। এবং হঠাৎ একদিন আমি কেন জানি, জানি না, আমি রাতে কবিতা টা লিখতে বসে গেলাম।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: সব শালা কবি হবে পিঁপড়ে গো ধরেছে উড়বেই......

মোহাম্মদ রফিক: হ্যাঁ সে যাই হোক। ওর ভেতরে অনেক ব্যাপার আছে—

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: অবশ্যই, ঐ যে আপনি বলেছেন, যার মাথায় বুদ্ধি আছে সেত বুঝবেই।

মোহাম্মদ রফিক: ওর ভিতরে চুলের ঘটনাটাও কিছুটা আছে। বেআদব চুল রেখে রাস্তা ঘাটে বেরুবো না। তা যাই হোক আমি ঐ লিখে ভাবলাম যে এটাকে কি করা যায়? প্রথমেই ভাবলাম যে এটা প্রচার হওয়াটা দরকার। তো ছাত্র ইউনিয়নের এক ছেলেকে বললাম। তো যা হোক তখন আবিদ আজাদ কবি, ওঁর একটা প্রেস ছিল, তো আমি আবিদ আজাদের শরণাপন্ন হলাম, যে এটা ছেপে দেবে নাকি? তো আবিদ রাজী হল এই শর্তে যে আমি এটা চেপে রাখবো। তো যখন আর্মি দেখেছে , আমি বলেছি যে, এটা আমার লিখা, তো প্রত্যেকের ক্ষেত্রে যেটা আমি বলবো যে, একজন আন-উইলিং লোককে আমার উইলিং কাজের পার্টনার হতে দেয়া, তো, আপনাদের অনেক ইয়ে আছে, পারলে খুঁজে বার করবেন, কোত্থেকে। তো যাই হোক, আবিদ আজাদের ঐখান থেকে ছেপে ছাত্রদেরকে দিলাম বিলি করতে। তারপরে তো ওটা মহা ইয়ে পেয়ে গেল। কত লক্ষ কোটি ছাপা হয়েছে হিসেব নেই। তো রংপুরে গিয়েছিলাম এক অনুষ্ঠানে, তো এক ছেলে, লোক এসে আমাকে বললো যে, আপনাকে আমি মিষ্টি খাওয়াবো। বললাম- কেন? বললো, যে স্যার আপনার খোলা কবিতা না হলেতো আমি বিয়ে করতে পারতাম না।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: মানে?

মোহাম্মদ রফিক: তো সে বলে যে, আমি দীর্ঘদিন ধরে প্রেম করছিলাম কিন্তু টাকা পয়সার জন্যে বিয়ে করতে পারছিলাম না, তো আমি আপনার খোলা কবিতাটা হাতে পেলাম আর ওটা ফটোকপি করে ১০০ টাকা করে বেঁচে বিয়ে করে ফেললাম।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: (হাততালি) হা হা হা।

মোহাম্মদ রফিক: তো আমি এখন ঐ বিয়ের অনুষ্ঠানে তো আর নিতে পারবো না, তাই এখন আপনাকে মিষ্টি খাওয়াবো। তখন সে আমাকে রংপুরের প্রধান মার্কেটে নিয়ে গিয়ে মিষ্টি খাওয়ালো।

কবি মোহাম্মদ রফিকের গল্পসংগ্রহের প্রচ্ছদশিমুল সালাহ্উদ্দিন: এটা তো একটা অসাধারণ প্রাপ্তি হিসেবে রয়ে গেল।

মোহাম্মদ রফিক: আমি আরেকটা ঘটনা বলি, আমি কলকাতা যাব। তো বাসের টিকেট কাটতে গিয়েছি, ইসের, কলাবাগানের ঐখানে। তো তোমার বয়েসি একটা ছেলে লিখছে, টিকেট কাটছে, তো সে বলছে, একটা খাতায় নাম লিখতে হবে। নাম কি আপনার? আমি বললাম মোহাম্মদ রফিক। তো বলে যে আপনি খোলা কবিতার লেখক? আমি বললাম যে, হ্যাঁ কেন, কি হয়েছে? বললো যে আপনার কাছ থেকে আমি একশো টাকা কম নেবো। টিকিটের দাম তিনশো টাকা ছিল, সেটার একশো টাকা বোধহয় সে তার পকেট থেকে দিয়েছে। নিলই না। তো এইগুলো তো একটা ভালোবাসার প্রমাণ। ড. আখলাকুর রহমান একদিন আমাকে বলে যে, জানো? আমি তোমার খোলা কবিতার কত কপি বিক্রি করেছি! আচ্ছা, তারপরে তারেক আলী এবং লন্ডনে আলী তখন নিযুক্ত ছিল। ওরা আমাকে বলে যে ওদের বাড়িতে একদিন ইন্ডিয়ান অ্যাম্বেসির অফিসার কে গেছে, সে বলছে, যে এখানে আপনাদের মোহাম্মদ রফিক নামে একটা লোক কবিতা লিখেছে , এক ডলারে বিক্রি হচ্ছে। তো ও বলছে, ওটা এক ডলার নয় এক টাকা দাম যাতে সব লোকে পড়ে। তো বলে তাই নাকি? তো সে এর কিছুদিন পরে, এই সে আমাকে খবর দিল যে, এরকম এক ভদ্রলোক আপনার সঙ্গে দেখা করতে চায়। দেখা হত কি না আমি জানি না, অধ্যাপক সাঈদ, নাস্তা খেতে আসিস। ওঁ তো আমাকে তুই তুই করতো, আমরা একসঙ্গে পড়েছি। তুই যদি আসিস, তো আমরা একসঙ্গে দেখা করতে যেতে পারি, তো আমরা গেলাম সাঈদের বাসায়। গিয়ে দেখি যে এক ভদ্র লোক ইয়ে স্যুটট্যুট পড়া, বসে আছে তো তিনি বললেন যে, অনেক কথা টথা বললেন যে আমি হচ্ছি, ইন্ডিয়ান দিফেন্স সেক্রেটারি ইষ্ট জোনের। তো আমরা সবাই আপনাকে চিনি। আমাদের সবাই আপনার লেখা পড়েছি। আমাদের সেক্রেটারি মহলে প্রচুর আলোচিত আপনি। কিন্তু আপনি যে রাজনৈতিক দলের পক্ষে ঐ রাজনীতির পক্ষে এখন আমরা নই। সরাসরি সে বললো, কারণ আমাদের হিসেবে আপনারা যদি ক্ষমতায় যান, ছয় মাসের বেশি ক্ষমতায় থাকতে পারবেন না। কিন্তু আপনি যদি ব্যক্তিগতভাবে কখনও মনে করেন যে, অসুবিধায় আছেন তাহলে আপনি শুধু কোনও মতে বর্ডার ক্রস করে বিএসএফকে আপনার নাম বলবেন আর আমার নাম বলবেন, এরাই সব ব্যবস্থা করবে, মানে বোঝালো আর কি, বন্ধু বান্ধবেরা যদি ব্যবস্থা করতে পারে করবে, বর্ডার ক্রস করে যে কোন ক্যাম্পে গিয়ে আমার নাম বলবেন, তারপরের ব্যবস্থা, ভারত সরকারের অতিথি। আমি দৃঢ়কণ্ঠে বললাম যে, আশাকরি সে প্রয়োজন হবে না।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: হা হা হা। সে প্রয়োজন হবে না।

মোহাম্মদ রফিক: তো আপনাকে ধন্যবাদ। তো তুমি বুঝতেই পার যে, কি ধরণের আলোড়ন তৈরি করেছিল। আমি এই কথাগুলো মানে আমাদের ওখানে একটা রাজনৈতিক গ্রুপের সঙ্গে জড়িত ছিলাম। তারা এসে বললো যে আমরা এটাকে একটা অনুষ্ঠান করতে চাই। তো আমরা রিহারসাল শুরু করলাম। তো একদিন সেলিম এসে উপস্থিত হল, আমি এই একটা অংশের গান করে দেব। বললাম দাও। তো ওঁ ঐ অংশের গান করে দিল। তারপরে জমজমাট অনুষ্ঠান হল। এর পরে ঢাকা থেকে কবিরাও গেল। রুদ্র গেল, আরও কে কে গেল জানি। ও তুষার দা। জমজমাট অনুষ্ঠান হল। এর কয়েকদিন পরে ঢাকা থেকে ছাত্র লীগের নেতা, জাসদের নেতা, ছাত্র ইউনিয়নের নেতা সবাই আমার জাহাঙ্গীর নগরের বাসায় গিয়ে হাজির হল। বিএনপি, ছাত্রদলের নেতা ছিল কিনা, হয়তো ছিল। হয়তো ছিল না...। বলে আমরা এটা নিয়ে অপরাজেয় বাঙলার নিচে একটা অনুষ্ঠান করবো। তো আমি ছেলেমেয়েরা যারা অংশ নিয়েছিল, ওদের বললাম। ওরা খুব উৎসাহের সঙ্গে বললো যে হ্যাঁ। তারপরেতো অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে একটা অনুষ্ঠান হল। আমি বলবো একটা ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটল। এবং সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং তারা কিন্তু সাহস করে নিচে আসলো না। ঐ দোতালা, তিনতালায় দাঁড়িয়ে থাকলো। যা হোক অনুষ্ঠান টনুষ্ঠান হল। হওয়ার পর ঐ ছাত্ররা, ঐ নেতারা বললো, স্যার আমরা এরশাদ বিরোধী মিছিল করবো। তবে আমরা রাস্তায় যাব না। আমি বললাম যে আচ্ছা ঠিক আছে। এবং সেই হচ্ছে বাংলাদেশে প্রথম এরশাদ বিরোধী মিছিল এবং সর্বদলের ছাত্র ছাত্রী এবং নেতা নেত্রী অংশ নিল। ঐখানে—

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: স্যার আপনি কি ঐখানে খোলা কবিতাটা পড়লেন?

মোহাম্মদ রফিক: না আমি পড়িনি ঐ ছাত্রছাত্রীরা পাঠক্রম করলো। কেউ আবৃত্তি করলো। আমি উপস্থিত ছিলাম।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: বাহ।

মোহাম্মদ রফিক: এবং ঐখানে শিক্ষকদের মধ্য থেকে একজনই অংশ নিয়েছিল। সে হচ্ছে হুমায়ুন আজাদ। আর ছাত্রদের মধ্য থেকে অংশ নিয়েছিল, রুদ্র, কামাল। এরা।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: স্যার, হুমায়ুন আজাদ যেহেতু এলো-ই, একটা জরুরী বিষয় আমি অবতারণ করতে চাই, বাংলা একাডেমী পুরস্কার দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর আপনি এবং হুমায়ুন আজাদ নিলেন সেই পুরস্কার। এবং সেটা হল এরশাদ সাহেবের সময়!

মোহাম্মদ রফিক: হ্যাঁ, এরশাদ থাকতেই।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: স্বৈরাচারের কাছ থেকে পুরস্কার নিলেন! মানে ঐ পুরষ্কার নিয়েতো কিছু ঘটনাবলী ছিল। মানে সংক্ষেপে যদি বলা যায়।

মোহাম্মদ রফিক: না আমি এটা খুব বিব্রতবোধ করি। আমি লোক পরম্পরায় শুনেছি। এরশাদের বা এরশাদের লোকজনের জন্যই আমাকে পরপর তিন বছর পুরষ্কার দেয়া হয়নি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এবং বাংলা একাডেমী পুরষ্কার তিন বছর বন্ধ ছিল।

মোহাম্মদ রফিক: না এক বছর বন্ধ ছিল। এবং সে বছর লোক যে ছিল, মঞ্জুর-এ- মওলা, সে বলেছিল, লোক পাওয়া গেল না বলে দিলাম না। যাই হোক কিন্তু বিষয়টা হচ্ছে সে চেষ্টা করেও আমাকে দিতে পারেনি। ইমোশনালি প্রবলেমটা আমাকে বলতেও পারেনি। পরে বলেছে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আচ্ছা।

মোহাম্মদ রফিক: তারপরে যে ঘটনা ঘটলো, আমি যায় যায় দিনে লেখালেখি করলাম যে আমি চাই না, যে, এটা নিয়ে, এবং লিখলাম আমার নাম যেন আর না আসে প্রস্তাবে। চিঠি লিখলাম। তো পরের বছর আবার পুরষ্কার দেয়ার সময় আসলো। আমি তখন অনেক সময় নিজের বই নিজে বিক্রি করতাম। হঠাৎ দেখি ঐ দিন বিকেল বেলা আমার টেবিলের আশপাশে তখন কবিরা ঘুরঘুর করছে। নূরুল হুদারা। আবার আবু হেনা মোস্তফা কামাল। আমার বন্ধু বান্ধব চলে গেছে, আবু হেনা মোস্তফা কামাল খুব বড় রোল প্লে করেছে। তিনি আবার আমার স্যার একসময়কার রাজশাহীতে। যাই হোক তিনিও খুব চাইলেন আমি নিই। আমার সম্পর্ক আমার সম্পর্ক তখন উনার সাথে খুব একটা ভাল ছিল না। তিনি এটা তাঁর বক্তৃতায়ই বলেছেন। তখন পরবর্তী কালে আবার ওর সাথে আমার সম্পর্ক ভাল হয়ে যায়। তো ঐ দিন দেখি কি হঠাৎ বিকেলের দিকে, নুরুল হুদা, শওকত ওসমান, কবীর চৌধুরী ও আবুল হোসেন আমার টেবিলের চারদিকে ঘুর ঘুর করছে। আমি বুঝতে পারলাম না যে কি হচ্ছে। তো কে জানি, এদের মধ্যে একজন এসে আমাকে বললো যে আমরা এটাকে একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি এবং আমরা বলেছি যে তুমি যদি পুরষ্কার না নাও তাহলে আমরা অপমানিত হবো। আমরা কেউ এই কমিটিতে থাকবো না। তুমি এটাকে নাও।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এটাকে রিজেক্ট করো না।

মোহাম্মদ রফিক: শওকত ওসমান আমার নিজের শিক্ষক। দীর্ঘদিনের জন্য।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: একেবারে সরাসরি শিক্ষক।

মোহাম্মদ রফিক: তারপর আবুল হোসেন সাহেব। আমি দেখলাম যে ওদের অপমান করে আমার কোন লাভ নেই। এর পরে নুরুল হুদা আসলো, এসে বললো, আপনি চলেন আমরা কোথাও যাব চা খেতে। এই আর কি।

মোহাম্মদ রফিকের শেষ দিকের একটি কাব্যগ্রন্থের প্রচ্ছদশিমুল সালাহ্উদ্দিন: এবং হুমায়ুন আজাদের সাথে পাওয়া এতে বোধহয় আপনার খুব একটা তৃপ্তি কাজ করে না।

মোহাম্মদ রফিক: না খুব একটা যে করেছে, তা না। কারণ সেটা আমি বলবো না। হুমায়ুনের লেখাটেখা যাই হোক। হুমায়ুনের মানে সব কিছু মিলিয়ে নিয়ে আমি খুব একটা সন্তুষ্ট নই। যদিও হুমায়ুনের উপর আমি লেখাটেখা লিখেছি। মানে এখনও লিখবো। তবে হুমায়ুনের কিছু ব্যাপারে আমার আপত্তিও আছে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপত্তিও আছে!

মোহাম্মদ রফিক: এবং হুমায়ুনের সাথে আমার ছাত্র অবস্থায় যোগাযোগ হয় নি। যদিও আমি যখন ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ও তখন প্রথম বর্ষ কিন্তু ও যখন চিটগং বিশ্ববিদ্যালয়ে তখনই সে প্রথম আমার বাড়িতে আসে। এবং আমরা একটা চট্টগ্রামে একটা হোটেলের ছাদে একটা আড্ডায় বসতাম।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এবং সেখানে অনেক গল্প টল্প হয়েছে , পানাহার, খাওয়া দাওয়া হয়েছে।

মোহাম্মদ রফিক: এবং অনুপম সেন অনেক দিল দরিয়ার মানুষ, সে সবাইকে খাওয়াতো টাওয়াতো। সে ঢাকায় এসে এটা নিয়ে কিছু কটুক্তিপূর্ণ কথা ছড়ায়। তারপরে আমি যখন কলকাতা গেলাম, তখন দেখলাম যে ওর একটা কবিতা অনূদিত হয়েছে। তা আমি বইমেলায় ওর সঙ্গে দেখা হওয়ার পরে বললাম। তো ও এমন একটা ভাব নিল যে, সে খুব বড় এক কবি তা সে আগে থেকেই জানতো এবং আমরা কেন এটা বুঝিনি!

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: হা হা হা।

মোহাম্মদ রফিক: আমি তাঁর প্রতিক্রিয়ায় খুব অবাক হয়ে গেলাম। যে একজন লোকের একটা কবিতা ছাপা হয়েছে ভাল কথা, অনুবাদে, কিন্তু সেটা থেকেতো এত ইয়ে করার মানে গর্ববোধ করার কারণ নেই। আর আমি বাংলা একাডেমীর পুরস্কারের ব্যাপারে, আসলে আমি পুরস্কার, টুরস্কারকে অত বড় ভাবে দেখি না। আগের বছর যেদিন পুরস্কার ঘোষণা হবে, হল না। আর কি সবার প্রতিক্রিয়া! আমি তখনও বই বিক্রি করি আমার টেবিলে। সে (হুমায়ুন আজাদ) এসে আমার টেবিলে, তখন বাংলা একাডেমীতে নাসির আলি মামুনের ছবির প্রদর্শনী চলছে, লেখকদের পোট্রেইট নিয়ে প্রদর্শনী। সে এসে আমাকে প্রস্তাব দিল, “চলেন সব নামিয়ে ফেলি, ভেঙ্গে ফেলি। হ্যাঁ, কত বড় সাহস, এই লোক বললো পুরষ্কার দেবে, বলেছে দেবে, এখন বলছে দেবে না। নামিয়ে ফেলি চলেন”। আমিতো অবাক। আমি বললাম, সাবধান। মামুন না আপনারও ছবি তুলেছে, আর আপনি ওর প্রদর্শনী নামিয়ে ফেলবেন! আশ্চর্য। সুতরাং ওর কিছু ব্যাপারে আমার আপত্তি ছিল। এবং পরবর্তী কালে ওর কবিতার যে ভূমিকা তাও ঠিক কবিসুলভ বা সুবিবেচনা প্রসূত আমার মনে হয় না।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: একুশে পদক পেলেন ২০১০ সালে। আপনিতো বললেনই স্যার পদক বা পুরষ্কারের ব্যাপারে। পুরস্কারে কারও লেখার কোন মূল্যায়ন হয় না। কিন্তু স্যার ঐ যে টিকেটের দাম অর্ধেক রাখা, অজস্র কবিতাপাঠকের ভালোবাসা, শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা, ঐ রকম পুরষ্কার তো স্যার প্রচুর পেয়েছেন। মানুষের ভালোবাসার পুরষ্কার।

মোহাম্মদ রফিক: হ্যাঁ মানুষের ভালোবাসার পুরস্কার। রাইট।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: সেটার তো মূল্য দেন স্যার?

মোহাম্মদ রফিক: হ্যাঁ অবশ্যই। মানুষের ভালবাসাকে আমি মূল্য অতি অবশ্যই দেই।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: মানে যে কবির জনম আপনি কাটালেন স্যার, সেই কবি জনমের কোন অতৃপ্তি কি আছে?

মোহাম্মদ রফিক: না, আমি লিখছি প্রচুর। এমন আরেকটা কথা আমি তোমাকে বলতে চাই। একজন কবি সবসময় তাঁর সমস্ত লিখার জন্য জনগণের কাছে পরিচিত হয় না। যেমন, নজরুল, কাজী নজরুল ইসলামকেই ধরো, আমরা তাঁকে চিনি বিদ্রোহী কবিতার জন্য।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: জ্বি স্যার

মোহাম্মদ রফিক: হ্যাঁ সবাই কিন্তু এটাই কি তাঁর পরিচয়?

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: তাঁর আরও বহু ভাল লিখা আছে।

মোহাম্মদ রফিক: জীবনানন্দ দাশ বনলতা সেন বা রূপসী বাংলা। কিন্তু এটাই কি তাঁর পরিচয়?

মোহাম্মদ রফিকের শেষ দিকের একটি কাব্যগ্রন্থের প্রচ্ছদশিমুল সালাহ্উদ্দিন: কিন্তু এটা গুরুত্বপূর্ণ।

মোহাম্মদ রফিক: এটা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তাঁকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার বাহন। এখন খোলা কবিতা লোকের ভাল লেগেছিল, এটা আমার নিজের প্রাপ্য। কিন্তু মানে আমি নিজেও খোলা কবিতার সাথে খুব উৎসাহী ছিলাম না। আমি মনে করতাম যে, এতা আমার রাজনৈতিক কর্মেরই একটা অংশ। এটা ঠিক ইয়ে না। মানে কবিতা হিসেবে খুব উচ্চস্তরের নয়। এটা আমাকে প্রথম ইয়ে করলো মঞ্জুর-এ- মওলা। সে আমাকে একদিন কথায় কথায় বললো, এটা ঠিক না। এটা কবিতা হিসেবেও ভাল। তারপর অরুণ সেন, তাঁর প্রতিক্ষণ থেকে নির্বাচিত কবিতায় পুরো কবিতাটা ঢুকিয়ে দিল। আমি দেখে অবাক হয়ে বললাম যে, সে বললো ‘হ্যাঁ’। তারপর আমি আরও অবাক হলাম। আইওয়া ইউনিভার্সিটির একটা ওয়েব সাইট। ওখানে গেলে তুমি দেখবে, ওখানে ও পুরো কবিতাটির ইংরেজি অনুবাদ করেছে। এবং ওরা আমাকে বার বার বলেছে যে, তুমি এই প্রচারে এত বিমুখ কেন?

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনি একটু বেশিই প্রচারমাধ্যম অবান্ধব স্যার।

মোহাম্মদ রফিক: হ্যাঁ এত বিমুখ কেন? এটা তুমি প্রচার করে অনুবাদ করে করে অ্যামেরিকানদের বিস্মিত কর না কেন?

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: তো আপনার মধ্যে এই প্রচার বিমুখতাটা আছে।
মোহাম্মদ রফিক: না আমি মনে করি কবির প্রচার কবিতা দিয়ে হোক। তুমি আজকে ভাবো যে, রবীন্দ্রনাথ, মাইকেল, জীবনানন্দ দাশ, কতদিন টেলিভিশনে এসেছে?

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: হা হা হা।

মোহাম্মদ রফিক: এবং তোমাকে আমি একটা কথা বলি, তুমি যে সাহিত্যের জগতের অবক্ষয়ের কথা বললে এর মূল কারণ হচ্ছে মিডিয়া। তুমি একটা কবিতা, ধরো দীর্ঘকবিতা লিখলে, একটা গল্পের মত তিন চার পৃষ্ঠা কবিতা লিখো, কোন দৈনিক পত্রিকা এটা ছাপবে?

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: ছাপা সম্ভব নাতো। তারতো সংবাদ দরকার। একুশ লাইনের বাইরে কবিতা ছাপা যায় না স্যার।

মোহাম্মদ রফিক: তাহলে এরাই মূল ক্ষতি করছে। আমি মনে করি এখন কবিদের প্রথম উচিত, তোমাদের মত তরুণ কবিদের, এইসব পত্রিকা টত্রিকাতে লিখা বন্ধ করে দেয়া। নিজেদের প্রকাশ মাধ্যম তৈরি করা। তুমি পাঁচ টাকা পারো, দশটাকায় পারো বিকল্প মাধ্যম তৈরি করো। আমরা তখন সাঈদ সাহেবের সেই পত্রিকায় অনেকেই লিখেছিলাম। উনার সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব মতের অমিল থাকা সত্ত্বেও তিনি কিন্তু আমাদের একত্রিত করেছেন।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আমি এই কথাটাই বলছিলাম।

মোহাম্মদ রফিক: সে যে আমাদেরকে খুব একটা দিক নির্দেশনা দিয়েছে তা না। কারণ সে সব সময় আমাকে বলতো যে, তোমার তিনি হচ্ছেন পুরোপুরি রোম্যান্টিক। আর আমি হচ্ছি সেখানে ধ্রুপদী সাহিত্যের প্রতি নিবেদিত। পুরো এবং তিনি চট্টগ্রামে গিয়ে আমাকে একি কথা বলেছেন, যে তোমার সাথে আমার ইয়ে নেই। আবার সে কিন্তু আমার ক্লাসিক চর্চার প্রবন্ধ ছেপে কোলকাতায় নিয়ে গেছে পত্রিকা। এটাই হচ্ছে তাঁর গুণ। এবং আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করেছি, মুখোমুখি বলেছিও এসব। তবে এই ব্যপারটা ছিল, তিনি কিন্তু সবাইকে এক করেছিলেন।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এবং অন্য আরেকজনের মতামত সেটাকে তিনি গুরুত্ব দিতে জানেন।

মোহাম্মদ রফিক: হ্যাঁ জানেন তারপর সে যখন রাজশাহী কলেজ ছাড়তে বাধ্য হল, তারপর তার সাথে আমার রাজশাহী রেলে দেখা। তিনি দেখে আমাকে বললেন, তুমিই না সেই লোক যে বোদলেয়ার পড়েছে? সে কিন্তু ঐ বিষয়টা আর তুললো না। সে তখন, তুমি চিন্তা কর, এটা কিন্তু তাঁর বিশাল হৃদয়ের পরিচয়।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: স্যার সিকান্দার আবু জাফরের কথাতো বললেন না।

মোহাম্মদ রফিক: সিকান্দার আবু জাফরের সাথে আমার, সিকান্দার ভাই তখন, মানে আমরা যখন এসছি তখন তাঁর প্রায় শেষ দিনগুলি চলছে। কিন্তু ওতো অন্যের কথাটা, এই কথাটা বলে সবসময়, তাই আমি বলছি, হাসান আজীজুল হক বলে, শকুন গল্পটা সমকালে ছাপা হয়েছিল। এবং এটা খুব আলোচিত তখন। হাসান তখন কলেজের মাষ্টার। সে উৎসাহিত হয়ে আরেকটা গল্প লিখে পাঠালো। সিকান্দার আবু জাফর ঐ গল্পটা ছাপলেন না। এবং হাসান তখন দুঃখে কষ্টে ছিঁড়ে পানিতে ভাসিয়ে দিল। এবং হাসান বলেছিল, আমার এই গল্প যদি ছাপানো হত তবে আমার এই উন্নতি আর হত না। এই হচ্ছে সিকানদার আবু জাফর।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: গ্রেট

মোহাম্মদ রফিক: আহসান হাবীবের সাথে সম্পাদক হিসেবে আমার কোন যোগাযোগ নেই। ওঁর সম্পর্কে বরং নির্মলেন্দু গুণ রাই ভাল বলতে পারবেন। আবুল হাসান থাকলে বলতে পারতো। কারণ ওদের লিখাই বেশি ছাপা হয়েছে। আমি দৈনিক পত্রিকায় প্রথম লিখেছি সংবাদে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এবং সংবাদেই সবচেয়ে বেশি লিখেছেন।

মোহাম্মদ রফিক: এর কারণ হচ্ছে আবুল হাসনাত। তারপরে তুমি ধরো, আমি বহুদিন দৈনিক পত্রিকায় লিখিনি। কারণ মিডিয়ার প্রতি আমার আস্থা না থাকা। তারপরে ভোরের কাগজের জন্যে লিখেছি। আমার একটা লিখা নিয়ে ভোরের কাগজ ছাপালো। তারপর ভোরের কাগজের সাথে একটা সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেল। এবং ভোরের কাগজের সাথে সম্পর্ক দীর্ঘদিন ছিল এবং ঐ সময় সাবের (মইনুল আহসান) ও জাফর (আহমেদ রাশেদ) থাকা পর্যন্ত। তারপর কিছুদিন প্রথম আলোতেও লিখেছি। কিন্তু সংবাদের সাথে যোগাযোগ থাকতো আকারে ইঙ্গিতে ছিল। মানে হাসনাত থাকতে যেরকম ছিল ওরকম না।

কবি মোহাম্মদ রফিকের প্রয়াণে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আবৃত্তি সংগঠন ধ্বনি তার উৎসবের নামকরণ করেছিল 'কবি মোহাম্মদ রফিক আবৃত্তি উৎসব''শিমুল সালাহ্উদ্দিন: স্যার আপনার এখন যে জীবন যাপন, আপনি প্রচণ্ড উজ্জীবনের মধ্যে আছেন। এখন আপনার যাপনটা কেমন স্যার? আপনি এখন সারাদিন একাই থাকেন!

মোহাম্মদ রফিক: আমি প্রথম রাত থেকে শুরু করি, রাত নয়টায় বিছানায় যাই, ভোর সাড়ে তিনটা থেকে সাড়ে চারটার মধ্যে উঠি। উঠে এক ঘণ্টার মধ্যে মুখটুখ ঠিক করা বা এই ঘর সব ঠিকঠাক করে আবার, ঔষধ পত্র সব গোছগাছ করে, আমি ঠিক পাঁচটার সময় বই খাতা নিয়ে লিখতে বসে যাই। এবং একভাবে আমি সাড়ে সাতটা পর্যন্ত লিখি। তারপর আড়মোড়াটোড়া ভেঙ্গে পৌনে আটটায় উঠে যাই। আটটায় নাস্তা করি। নাস্তা করে একটু রেস্ট টেস্ট নিয়ে তারপর হাঁটতে যাই। হেঁটে ফিরে আসি, এসে স্নান করি, স্নান করে ধরো একটু হাল্কা নাস্তাটাস্তা করি আবার। করে আবার একটু বই পত্রটত্র ই করি, করে দৈনিক কাগজটা দেখি, দেখে, তারপর আর সারাদিন ঐভাবে কাটাই, বসে থাকি। তারপরে যদি ইচ্ছে করে লিখি মানে লিখাটা এখন আমার মূল কাজ। তাগিদ বোধ করলাম তো লিখতে বসে গেলাম। এই আর কি, সন্ধ্যার পর আর সেভাবে কাজ করতে চাই না। সন্ধ্যার পর আমি বসে থাকি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আমরাতো স্যার অনেক কথা বার্তা বললাম। মোটামুটি যে জায়গাটা স্যার বাদ রইলো, এই সময়ে যারা লিখছে স্যার, তাদের যেসব প্রবণতা গুলো আপনার ভালো লাগে, সেটা কিভাবে চিহ্নিত করেন?

মোহাম্মদ রফিক: কিন্তু প্রশ্নটা হচ্ছে, যে প্রবণতাটা আমার ভালো লাগলে, মানে আমি অবশ্যই চাই, মানে আমার স্বপ্ন আরেকজনের ভেতর সফল হচ্ছে। এবং হ্যাঁ সেটা আমি চাই। কিন্তু আমি মনে করি না যে, এটা ঠিক দৃষ্টি। আমার স্বপ্নতো আরেকজন পূরণ করবে না। তাকে তার স্বপ্ন পূরণ করতে হবে। সুতরাং তাকে তার মত করে লিখতে হবে। তবে আমি যেন, এটা অবশ্যই ইয়ে করব যে, তার লিখা পড়ে যেন মনে হয় যে সে বিষয়টা জানে। এটাই তার ভুবন। এবং এই ভুবনটাকে সে তুলে আনছে। এবং এই ভুবনটা তাকে এক জায়গায় পৌঁছে দেবে।

মোহাম্মদ রফিক রচনাবলী ৩ খন্ডে প্রকাশ করেছে ঐতিহ্যশিমুল সালাহ্উদ্দিন: অনেক ধন্যবাদ স্যার।

মোহাম্মদ রফিক: হ্যাঁ এটাই হচ্ছে আমার মূল কথা এবং আমি তোমাকে আবারও বলি যে, আমি মনে করি, কাব্যের মুক্তি এবং মানুষের মুক্তি দুটো এক কথা নয়। সর্বমানুষের মুক্তি না হলে কাব্যেরও মুক্তি হবে না। সুতরাং ঐ চিন্তা আমাদের আপাতত করে যাওয়া, সাধনা করে যাওয়া। মানুষকে উজ্জীবিত করে যাওয়া। যদি কোনদিন সেই বিস্ময়কর ঘটনাটা ঘটে, হয়তো আরেকজন বঙ্গবন্ধু , হয়তো আরেকজনের নেতৃত্বের মধ্যে, বঙ্গবন্ধুর মত সেই ঘটবে। সেই দিনের আশায় বসে দিন গুণছি।

(শ্রুতিলিখন সহায়তা: জব্বার আল নাঈম ও আমেনা তাওসিরাত; প্রথম প্রকাশ কালের কণ্ঠ ঈদসংখ্যা ২০২৫)

    আগামীর সময় ইপেপার
    শেয়ার করুন:
    সরকারি সফরের নামে স্ত্রীকে নিয়ে ‘ভ্রমণ’ রেল সচিবের

    সরকারি সফরের নামে স্ত্রীকে নিয়ে ‘ভ্রমণ’ রেল সচিবের

    কবি ও অনুবাদক রথো রাফি মারা গেছেন

    কবি ও অনুবাদক রথো রাফি মারা গেছেন

    খেলাপি আদায়ে চমক কৃষি ব্যাংকের

    খেলাপি আদায়ে চমক কৃষি ব্যাংকের

    চুয়েটে অচলাবস্থার এক মাস:  বাতিল ৩৩ পরীক্ষা ও ৮৬৪ ক্লাস

    চুয়েটে অচলাবস্থার এক মাস: বাতিল ৩৩ পরীক্ষা ও ৮৬৪ ক্লাস

    সাজেকে সেনাবাহিনীর সঙ্গে সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের গোলাগুলি

    সাজেকে সেনাবাহিনীর সঙ্গে সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের গোলাগুলি

    পুলিশের বাড়িতে নিজেদের দ্বন্দ্বেই পুলিশের অভিযান

    পুলিশের বাড়িতে নিজেদের দ্বন্দ্বেই পুলিশের অভিযান

    ওসির সঙ্গে বাদানুবাদ, ‘আপনি বিরাট আওয়ামী লীগ ছিলেন’ বললেন রুমিন ফারহানা

    ওসির সঙ্গে বাদানুবাদ, ‘আপনি বিরাট আওয়ামী লীগ ছিলেন’ বললেন রুমিন ফারহানা

    প্রধানমন্ত্রীর রাজশাহী সফরে ফেসবুকে ‘হুমকি’, বাবা-ছেলে ডিবি হেফাজতে

    প্রধানমন্ত্রীর রাজশাহী সফরে ফেসবুকে ‘হুমকি’, বাবা-ছেলে ডিবি হেফাজতে

    গ্লোব শপিং সেন্টারের দোকানে হামলা ও দখলের অভিযোগ ঢাকা কলেজ ছাত্রদল নেতাদের বিরুদ্ধে

    গ্লোব শপিং সেন্টারের দোকানে হামলা ও দখলের অভিযোগ ঢাকা কলেজ ছাত্রদল নেতাদের বিরুদ্ধে

    হেফাজতের উদ্যোগে নতুন প্ল্যাটফর্ম, ভিড়েছে জামায়াত জোটের দুটি দল

    হেফাজতের উদ্যোগে নতুন প্ল্যাটফর্ম, ভিড়েছে জামায়াত জোটের দুটি দল

    কালীগঞ্জে শিশুকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, আটক ৩ প্রতিবেশী

    কালীগঞ্জে শিশুকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, আটক ৩ প্রতিবেশী

    সেতু নেই ডাকাতিয়া নদীতে, স্বেচ্ছাশ্রমে ২৬০ ফুট বাঁশের সাঁকো

    সেতু নেই ডাকাতিয়া নদীতে, স্বেচ্ছাশ্রমে ২৬০ ফুট বাঁশের সাঁকো

    জীবনানন্দ হয়ে সংসারে আজও আমি...

    জীবনানন্দ হয়ে সংসারে আজও আমি...

    পঞ্চগড়ে দেড় লাখ টাকাসহ উপসহকারী প্রকৌশলীকে আটকালেন স্থানীয়রা

    পঞ্চগড়ে দেড় লাখ টাকাসহ উপসহকারী প্রকৌশলীকে আটকালেন স্থানীয়রা

    সড়কে মৃত্যুতে বিশ্বে দ্বিতীয় বাংলাদেশ

    সড়কে মৃত্যুতে বিশ্বে দ্বিতীয় বাংলাদেশ