আইইএ প্রধানের সতর্কবার্তা
আগামী দুই বছর কঠিন হবে ইউরোপের জীবন

সাধারণত শীতের আগে ইউরোপের দেশগুলো পর্যাপ্ত গ্যাস মজুদ করে। কিন্তু এবার শীত শুরু হওয়ার সময় মজুদ ঐতিহাসিক গড়ের চেয়ে অনেক কম। ছবি: রয়টার্স
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ব জুড়ে বিঘ্ন ঘটছে জ্বালানি সরবরাহে। এর মধ্যে শীত মৌসুমে প্রবেশ করছে ইউরোপ। রেকর্ড সর্বনিম্ন গ্যাস রিজার্ভ নিয়ে শীতে প্রবেশ করছে অঞ্চলটি।
এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হবে বলে সতর্ক করেছেন আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) প্রধান ফাতিহ বিরোল।
তার আশঙ্কা, উপসাগরীয় অঞ্চলে যদি আজই শান্তি ফেরে, তবুও আগামী কয়েক মাসে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম বাড়তে পারে।
গত বুধবার বার্লিনে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের মধ্যে আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিরোল বলেছেন, হরমুজ প্রণালিতে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্নের প্রভাব বিশ্বের সব অঞ্চলেই পড়ছে। তবে ইউরোপ বিশেষভাবে ঝুঁকির মুখে। পরিস্থিতি এমন থাকলে এ বছর এবং আগামী বছরও ইউরোপের জন্য কঠিন হবে।
তিনি বলেন, ‘যুদ্ধবিরতির সবচেয়ে ভালো সময় ছিল গতকালই।’
সাধারণত শীতের আগে ইউরোপের দেশগুলো পর্যাপ্ত গ্যাস মজুদ করে। কিন্তু এবার শীত শুরু হওয়ার সময় মজুদ ঐতিহাসিক গড়ের চেয়ে অনেক কম। এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গেও গ্যাস কেনার প্রতিযোগিতায় নামতে হচ্ছে ইউরোপকে। মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর এশিয়ার নির্ভরতা আরও বেশি।
বিরোলের আশঙ্কা, শীত তীব্র হলে ইউরোপে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম আরও বাড়তে পারে। জ্বালানি খাত ক্রমেই রাজনৈতিক বিবেচনার অংশ হয়ে ওঠায় অনিশ্চয়তাও বাড়ছে।
ইউরোপের দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা চালানো এবং শীতের সময় ঘর গরম রাখতে আমদানি করা গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। যুদ্ধ শুরুর আগে ইউরোপে ব্যবহৃত মোট এলএনজির প্রায় ১০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসত। কিন্তু ইরানের জাহাজে হামলার কারণে এই পথে আমদানি ব্যাপকভাবে কমে গেছে।
শীতের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) গ্যাস সংরক্ষণাগারগুলো এখন মাত্র ৭২ শতাংশ পূর্ণ। সাধারণত এ সময়ে মজুদ থাকে প্রায় ৯০ শতাংশ। বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘাটতি ১ কোটি থেকে ১ কোটি ২০ লাখ বাড়িতে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানির সমান।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, গ্যাসের সংকট মোকাবিলায় পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে জ্বালানি ব্যবহার কমানোর আহ্বান জানানো হবে কি না, তা নিয়ে আলোচনা করছেন ইইউর জ্বালানিমন্ত্রীরা।
বিরোল জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকি নিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে চিন্তিত ছিলেন। তার সংস্থায় চাকরির জন্য আসা প্রার্থীদেরও প্রায়ই প্রশ্ন করতেন, হরমুজ প্রণালি আজ বন্ধ হয়ে গেলে তারা কী করবেন?
তার মতে, বর্তমান সংকট অপ্রত্যাশিত নয়। বিকল্প নৌপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালিকে ঘিরেও অস্থিরতা পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে।
হরমুজ প্রণালিতে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্নের প্রভাব বিশ্বের সব অঞ্চলেই পড়ছে। তবে ইউরোপ বিশেষভাবে ঝুঁকির মুখে। পরিস্থিতি এমন থাকলে এ বছর এবং আগামী বছরও ইউরোপের জন্য কঠিন হবে।
—ফাতিহ বিরোল, প্রধান, আইইএ।
বিরোল বলেছেন, দেশগুলোর সরকারপ্রধানরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা আগে থেকে নেয়নি। এতে আমি সত্যিই হতাশ।
‘এখন সবাই দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে জ্বালানি পরিবহনের জন্য নতুন পাইপলাইন তৈরি করছে। পুরনো পাইপলাইনের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে’, বলেছেন আইইএ প্রধান।
তার মতে, এসব উদ্যোগ আরও আগেই নেওয়া উচিত ছিল।
ইউরোপে জ্বালানিসংকটের আরেকটি দিক হলো পরিশোধিত জ্বালানির ঘাটতি। পুরনো শোধনাগারগুলোয় সাম্প্রতিক বছরগুলোয় অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাতের পরিমাণ কমেছে। ফলে ডিজেলের মতো পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির ওপর চাপ বাড়ছে।
বিরোলের মতে, রাশিয়ার তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের হামলাও ডিজেলের সম্ভাব্য সংকটে ভূমিকা রাখছে। তার হিসাব অনুযায়ী, রাশিয়া থেকে ডিজেল সরবরাহের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বন্ধ হয়ে গেছে।
গত মার্চে জি-৭ জোটের দেশগুলো কৌশলগত মজুদ থেকে ৪০ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও ডিজেল বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়। জরুরি এ মজুদ কীভাবে বিশ্ববাজারে পৌঁছাবে, তা সমন্বয় করেন বিরোলের সংস্থা।
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর পর এটি ছিল জরুরি মজুদ ছাড়ের তৃতীয় ঘটনা, যার তদারকি করতে হয়েছে তাকে।
বিরোল বলেছেন, তার সংস্থা বহু বছর ধরে ইউরোপকে রাশিয়ার জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা সম্পর্কে সতর্ক করে আসছিল। একই সঙ্গে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে ইউরোপের সরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছিল।
‘পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশগুলোর নিজস্ব জ্বালানি উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়াতে পারত’, মত বিরোলের।
ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার পর নিষেধাজ্ঞার জবাবে মস্কো গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দিলে; সেই সতর্কতার বাস্তব প্রভাব দেখা যায়। ইইউ রাশিয়ার গ্যাস পুরোপুরি বন্ধ করার পরিকল্পনা নিয়েছে।
তবে উপসাগরীয় সংকটের মধ্যে ফ্রান্সের মতো কয়েকটি দেশ আবার রাশিয়া থেকে গ্যাস আমদানি বাড়িয়েছে।
জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে জরুরি মজুদ বাজারে ছাড়ার উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে শিল্প খাতের বিশেষজ্ঞদের। তাদের কেউ কেউ মনে করছেন, এ মজুদ দিয়ে কয়েক মাসের বেশি পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হবে না।
তবে বিরোলের দাবি, জরুরি মজুদ বাজারে ছাড়ার বাস্তব প্রভাব দেখা গেছে। চলতি মাসের শুরুতে জি-৭ দেশগুলো ১০০ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও ডিজেল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর তেলের দাম প্রায় ২০ ডলার কমেছিল।
তবে দাম আবারও বাড়ছে। ফেব্রুয়ারি থেকে গ্যাসের দামও ১৪০ শতাংশ বেড়েছে। ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দামও ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের অনেক ওপরে রয়েছে।
বিরোলের মতে, এখন যুদ্ধ থেমে গেলেও এর প্রভাব পরবর্তী কয়েক মাস ধরে ভুগতে হবে। জ্বালানি পরিবহনের বৈশ্বিক ব্যবস্থাও এ যুদ্ধের কারণে স্থায়ীভাবে বদলে গেছে।
তিনি বলেছেন, জ্বালানিসংকট ইউরোপের রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলছে। রাশিয়া অতীতে গ্যাস সরবরাহকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে।
অন্যদিকে ফ্রান্স ও জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশে জনজীবনের দুর্ভোগ নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে। এ ক্ষোভ কাজে লাগিয়ে জনতুষ্টিবাদী দলগুলো প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে প্রচার চালাচ্ছে। তাদের অভিযোগ, মূলধারার সরকারগুলো পরিস্থিতি সামলাতে ব্যর্থ।
বিরোল পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে বলেছেন, ‘জ্বালানি খাতে ভূরাজনীতির এত দীর্ঘ ও গভীর ছায়া আগে কখনো দেখিনি।’
তার মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি আর শুধু ব্যবসার বিষয় নয়, বরং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
ইইউর হাতে এখনো জরুরি জ্বালানির প্রায় ৮০ শতাংশ মজুদ রয়েছে। বিরোল আশা করছেন, এ মজুদ চতুর্থবারের মতো বাজারে ছাড়ার প্রয়োজন হবে না। তবে তার সতর্কতা, বিশ্ব জুড়ে জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা আর বড় ধরনের ধাক্কা সামলানোর অবস্থায় নেই।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব দুই প্রণালিই দ্রুত ও নিঃশর্তভাবে খুলে দেওয়া হবে। তা না হলে জ্বালানির দাম বর্তমান পর্যায়ে ধরে রাখার মতো সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা বিশ্ববাজারে আর সম্ভব হবে না।
সূত্র : আল জাজিরা






