হেলায় ক্ষতি বছরে ২৯ হাজার কোটি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কৃষকের ফলানো সোনার ফসল পৌঁছানোর কথা কোটি মানুষের পাতে। কিন্তু তার এক বিশাল অংশ শেষমেশ ঠাঁই পাচ্ছে ডাস্টবিনে। অথবা পচে-গলে নষ্ট হচ্ছে। প্রযুক্তি নেই, সংরক্ষণের ভালো ব্যবস্থা অধরা, পরিবহনেও চরম অব্যবস্থাপনা— আর তাতেই বছর বছর স্রেফ উধাও হয়ে যাচ্ছে অন্তত ১ কোটি ৬০ লাখ টন খাদ্যশস্য ও পচনশীল কৃষিপণ্য। বাজারদরের ছকে হিসাব করলে চোখ কপালে ওঠার দশা! ফসলের দাম যে ২৯ হাজার কোটি (২৮ হাজার ৮০০) টাকা!
ফসল তোলার মুহূর্ত থেকে শুরু করে পাইকারি ও খুচরা বাজার পর্যন্ত— পণ্য চলাচলের প্রতিটি ধাপে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) আন্তর্জাতিক পরিমাপ পদ্ধতিতে এই মাথা ঘোরানো হিসাব বের করেছে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি)। তাদের সদ্য তৈরি ‘ফাইভ ইয়ার স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্কে’ ফুটে উঠেছে দেশের ফসল হারিয়ে যাওয়ার ছবি।
কথায় বলে কৃষকের মাঠে ঘাম, পেটে টান। চাষির যে ঘাম জমিতে ঝরে, তা তো শুধু পানি নয়; তাতে মিশে থাকে ঋণের বোঝা, চড়া সুদের চিন্তা আর পুরো পরিবারের পেটের ভাত। কিন্তু শস্যের এই বিপুল ও অবিশ্বাস্য অপচয় দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তাকে খাদের শেষ কিনারে ঠেলে দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্ষতির এই বিষাদময় গলদ শুরু হয় একেবারে গোড়াতেই— অর্থাৎ জমি থেকে ফসল কাটার ঠিক সেই সংবেদনশীল সময়েই। মাড়াই, শুকানো, বস্তাবন্দি করা থেকে শুরু করে পরিবহনের সময়ে আধুনিক যন্ত্রের ছোঁয়া না লাগায় পথের ধুলোতেই মিশে যায় ফসলের একটা বড় অংশ।
ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. আবদুস সাত্তার মণ্ডলের গলায় ঝরে পড়ল চরম উদ্বেগের সুর। তিনি বলেছেন, ‘এমনিতেই আমাদের দেশে খাদ্যের টান। এর ওপর কোটি কোটি টাকা, অফুরান সময় আর মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কষ্ট করে ফসল ফলালাম আর তা প্রক্রিয়াজাত বা বাজারজাত করতেই এভাবে স্রেফ উবে যাবে? এটি চিন্তার কথা! ফসল কাটা, মাড়াই করা থেকে শুরু করে ঝাড়াই— সর্বত্র যান্ত্রিকীকরণ করা ছাড়া আমাদের সামনে আর দ্বিতীয় কোনো খোলা পথ নেই।’
ড. মণ্ডলের কথা, ‘আমরা মনে মনে চাই বা না-চাই, কম্বাইন্ড হারভেস্টরের দিকে আমাদের এগোতেই হবে। বড় আকারের সম্ভব না হলেও, অন্তত ছোট ও মাঝারি মাপের হারভেস্টর মাঠে নামাতে হবে। তার সঙ্গে চাই আধুনিক ড্রায়ার। এই পলিমাটির দেশে অতিবৃষ্টি বা আচমকা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল শুকাতে না পেরে মাঠের পর মাঠ শস্য পচে যায়। সেই ক্ষতি রুখতে ড্রায়ারের পাশাপাশি দরকার আধুনিক কোল্ড স্টোরেজের মজবুত পরিকাঠামো।’
জিইডির ২০২৪ সালের বিস্তারিত পরিসংখ্যানে চোখ বোলালে যে কারও শিউরে ওঠার দশা হবে। সনাতন উপায়ে মাড়াই, শুকানোর সেকেলে পদ্ধতি আর ভাঙাচোরা গুদামের খেসারতে প্রতি বছর উধাও হয়ে যায় চাষির ফলানো ১২ শতাংশ ধান। হিমাগারের চরম আকাল আর পরিবহনের তীব্র ধকল— দেশের মোট উৎপাদিত আলুর এক-চতুর্থাংশই পচে সাফ। ভুল উপায়ে নাড়াচাড়া (হ্যান্ডলিং) আর হিমঘরের অভাবে চার ভাগের এক ভাগ সবজি কোনোদিনও সাধারণ মানুষের বাজারেই পৌঁছাতে পারে না। আর্দ্রতার সঠিক নিয়ন্ত্রণ না থাকা আর আধুনিক গুদামের অভাবে উত্তোলনের পর তিন ভাগের এক ভাগের বেশি পেঁয়াজ পচে যায়। সঠিক প্যাকেজিং ও ‘কোল্ড-চেইন’ পরিবহনের অভাবে রাজশাহী-চাঁপাইয়ের বাগানের মতো সাধারণ বাগানের আম বাজারে আসার পথেই ৩৫ শতাংশ আধপচা হয়ে নষ্ট হয়।
পরিসংখ্যানের পাতার বাইরে গিয়ে মাঠের বাস্তব ছবিটাও তথ্যের চেয়ে কোনো অংশে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। প্রতিবেদক কথা বলেছেন কুড়িগ্রাম সদরের বেলগাছা ইউনিয়নের ডাইরপাড়ার কৃষক মির্জা মো. নিজাম উদ্দিনের সঙ্গে। কৃষির পাশাপাশি শিক্ষকতাও তার পেশা। আক্ষেপ আর ক্ষোভের মিশেলে তিনি বলেছেন, ‘জমি থেকে ধান, গম কিংবা কাউন কাটার সময়েই এক ঝুড়ি ধানের দানা মাটিতে পড়ে যায়। তারপর গাড়িতে করে বা শ্রমিকের কাঁধে করে আনার পথে পড়ে আরও কিছুটা। বাড়িতে এনে মাড়াই আর ঝাড়ার সময়ও উধাও হয় ফসল— যা আর কোনো দিন কুড়িয়ে তোলা সম্ভব হয় না। এর ওপর ধান সেদ্ধ করার পর আচমকা বৃষ্টি হয়ে ধান ভিজে যায়। সেই ভেজা ধান পচে দুর্গন্ধ ছড়ায়। তা থেকে আর চাল করা যায়নি।’
নিজাম উদ্দিন বলছিলেন, ‘করুণ বিষয় হলো, আমরা চাষিরা এই বিশাল ক্ষয়ক্ষতি কোনো দিন খেয়ালই করিনি! বংশপরম্পরায় আমরা ধরে নিই— এটাই নিয়ম, এটাই আমাদের অদৃষ্ট! তাই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা আমাদের মাথায় আসে না। সবজির ক্ষেত্রে তো আরও দুর্দশা। আলুর ভালো ফলন হলে বাজারে কোল্ড স্টোরেজে জায়গা মেলে না, আবার মিললেও বিদ্যুৎ সংকটে জেনারেটর না চলায় হিমাগারের ভেতরেই আলু পচে গন্ধ বের হয়।’
জিইডির নথিতে খুব স্পষ্টভাবেই উঠে এসেছে দেশ জুড়ে ছড়িয়ে থাকা হিমাগারগুলোর এই চরম সংকটের কথা। খাতা-কলমে দেশ জুড়ে সাড়ে চারশর মতো কোল্ড স্টোরেজ রয়েছে ঠিকই, কিন্তু অদ্ভুত বিষয় হলো— তার ৯৫ শতাংশই শুধু আলু রাখার কাজে সীমাবদ্ধ!
যে শাকসবজি, পেঁয়াজ কিংবা আমের পচনের কারণে দেশের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়, সেগুলোর জন্য দেশে প্রাতিষ্ঠানিক কোনো আধুনিক ‘কোল্ড-চেইন’ বা হিমঘরের সুবিধাই গড়ে ওঠেনি।
এই ঘাটতি মেটাতে এবার সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিআইপি) ভিত্তিতে গ্রামীণ হাটের কাছাকাছি ছোট ও মাঝারি মাপের ‘মাল্টি-চেম্বার’ হিমাগার, বিশেষায়িত হিম-পরিবহন বহর ও সংগ্রহ কেন্দ্র গড়ার খসড়া রোডম্যাপ হচ্ছে। গ্রামীণ বিদ্যুতায়নের খরচ কমাতে এর সঙ্গে যুক্ত করা হবে সৌরবিদ্যুৎচালিত মিনি-গ্রিড প্রযুক্তি।
পরিকল্পনা কমিশনের জিইডির সদস্য (সচিব) ড. মনজুর হোসেন বলেছেন, এই রাষ্ট্রীয় ক্ষতি ও অপচয় রুখতে সরকার এখন ‘ওয়ান ভিলেজ ওয়ান প্রোডাক্ট’ (এক গ্রাম, এক পণ্য) পদ্ধতি গ্রহণ করেছে।
এই কৌশলে স্থানীয় মাটি, আবহাওয়া, জলবায়ু ও বাজারের চাহিদা মেপে একটি নির্দিষ্ট গ্রাম বা এলাকা ধরে আম, আনারস, দুগ্ধজাত পণ্য, মাছ কিংবা মসলার মতো পণ্যে জোর দেওয়া হবে। প্রান্তিক কৃষকদের হাতে তুলে দেওয়া হবে ‘কৃষক কার্ড’, মিলবে বীমা সুবিধা ও প্রযুক্তির ছোঁয়া। গ্রামের বেকার তরুণ ও নারীদের প্যাকেজিং, স্যানিটেশন এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের ডিজিটাল তালিম দিয়ে উদ্যোক্তা বানানো এবং সহজ শর্তে ক্ষুদ্রঋণ দেওয়ারও মহাপরিকল্পনা আঁকা হয়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের রিসার্চ ফেলো ড. মেহরাব বখতিয়ার স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়ে বললেন, ‘আমাদের দীর্ঘ গবেষণায় দেখা গেছে, ফসল তোলা থেকে শুরু করে শেষ প্রক্রিয়াজাতকরণ পর্যন্ত বাংলাদেশে ২০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে— যা পুরো দক্ষিণ এশিয়ার খাদ্য নিরাপত্তার মূলে চরম কুঠারাঘাত। শুধু সস্তা পলিথিনের বস্তার বদলে হাওয়া চলাচলের সুবিধাযুক্ত প্লাস্টিকের ক্যানের মতো ছোট ছোট প্রযুক্তি আর পরিবহন পরিবর্তন করলেই এই ক্ষতির একটা বড় অংশ রাতারাতি রুখে দেওয়া সম্ভব।’
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) বৈশ্বিক সূচক বলছে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ধানে ক্ষতি ৫ শতাংশের নিচে, সবজিতে ১০-১৫ শতাংশ আর আলুর ক্ষেত্রে ৫-৭ শতাংশের মধ্যে সীমিত থাকাই বাঞ্ছনীয়। অথচ বাংলাদেশে সেই ক্ষতির হার বিশ্বমানের চেয়ে বহুগুণ বেশি!
২৯ হাজার কোটি টাকা অপচয়ের এই মহাকাব্য থামাতে সরকারের নতুন ফাইভ ইয়ার স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক শুধু আমলাতান্ত্রিক কাগজের ফাইলে আটকে থাকে, নাকি সত্যিই কোনো দিন মাঠের কৃষকের মুখে হাসি ফোটায়— এটাই এখন দেখার বিষয় বলে মন্তব্য বিশেষজ্ঞদের।



