বনমালী

রংপুর মহানগরীর কেন্দ্রবিন্দু থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার দক্ষিণে মিঠাপুকুর উপজেলার প্রত্যন্ত একটি গ্রাম পায়রাবন্দে সপ্তাহের পাঁচ দিন অফিস করতে আসি। উন্নয়নের ছোঁয়া এখানে যে লাগেনি একমাত্র উদাহরণ, ভালো খাবারের কোনো হোটেল নেই।
অটোতে করেই আসা-যাওয়া করি। নজর রাখি আর সিংহভাগ সময়ে মুগ্ধ হই গাছের শাখা, লতাপাতা, তৃণ, গুল্ম থেকে শুরু করে নানান ঝোপঝাড় দেখে।
একদিন পায়রাবন্দ বেগম রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্রের সহকর্মী আবেদা সুলতানা বলছিলেন, ‘স্যার, আপনার জন্য একটা নতুন ফুলের খবর আছে।’ বললাম, ‘বিলম্ব করছেন কেন; কোথায় দেখলেন, তাড়াতাড়ি বলে ফেলুন।’
রংপুর-ঢাকা মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীত করায় দুদিক থেকেই অনেক বসতি হয়ে গেছে বিলীন। যাওবা চোখে পড়ে সবকিছুই ওইসব ভেঙে ফেলা বাড়িঘরগুলোর পেছনের অংশ, কারও হয়তো সামনের অংশ। ভাগ্যক্রমে সামনের অংশ যারা পেয়ে গেছেন, তাদের কপাল আরও খানিকটা প্রসারিত হয়েছে। এমনিতেই রংপুর বিভাগ ঘোষণার পর ৩ হাজার টাকায় কেনা জমি এখন কমপক্ষে ১৫ লাখ টাকা শোনা যায় কোথাও কোথাও।
অফিস শেষ করে যাওয়ার সময় অটো থামিয়ে আরেক সহকর্মী হযরত আলীকে নিয়ে ছবি তুলতে নামলাম। প্রথম দর্শনেই মনে হলো ননিগাছের ফুল!
কৃষিবিদ, প্রকৃতিবিজ্ঞানী এবং বিশিষ্ট লেখক মৃত্যুঞ্জয় রায়ের দ্বারস্থ হলাম। ছবি পাঠালে বললেন, এটা ননি নয় মুন্না, বনমালী। জায়গাটি ছিল বারো আউলিয়া এলাকা পেরিয়ে তালুক ধর্মদাস অর্থাৎ রংপুরের প্রবেশপথ মডার্নের খুব কাছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট রংপুর কেন্দ্রের প্রায় উলটো দিকে।
আরেক দিন আবেদা সুলতানা বললেন, ‘খোদ পায়রাবন্দেই জয়রামপুর আনোয়ার এলাকায় দেখেছি আরেকটি বনমালী গাছে ফুল।’ বিস্ময়ের সীমা কাটে না। ছুটে গিয়ে দেখি আরে তাইতো।
বনমালীকে নিয়ে কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন, ‘বনে চলে বনমালী বনমালা দুলায়ে!/তমালে কাজল-মেঘে শ্যাম-তুলি বুলায়ে।’ আরেকটি গান— ‘বনমালী তুমি পরজনমে হইয়ো রাধা’ গানটির গীতিকার ও সুরকার দীন শরৎ (১৮৮৭-১৯৪১)। ভক্তিমূলক এ গানে শ্রীকৃষ্ণকে সম্বোধন করা হয়েছে ‘বনমালী’ বলে। বিরহিণী রাধা বিলাপ করে শ্রীকৃষ্ণকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, শ্রীকৃষ্ণ যেন পরজনমে রাধা হয়ে জন্ম নেন। আর রাধা জন্ম নেন শ্রীকৃষ্ণ হয়ে। তাহলে তিনি উপলব্ধি করতে পারবেন রাধার মনোবেদনা। এ বনমালী শ্রীকৃষ্ণ না, বনের ফুল।ইংরেজি নাম Narrwo leaf morinda উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Morinda angustifolia পরিবার Rubiaceae. ননিফলের সহোদর সুগন্ধি এই ফুলটির অনেক স্থানীয় নাম শোনা যায়— বনমালী, জংলি বনশাক, বনহরিদ্রা, দারুহরিদ্রা, হরিনার ফুল, রঙ গাছ, পানদোগি, পানদুসি, হলদিরুক, পানডোগী, পান্দুকি, শালিমরিচা ইত্যাদি। চাকমা নাম কোবা বেনা, ত্রিপুরা ভাষায় বটতিতা আর মগ ভাষায় লিঙবা। চায়নিজরা ডাকে ‘হুয়াং মু বা জি’ নামে।
বুনো পরিবেশে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো বনমালী বহুবর্ষজীবী চিরসবুজ গুল্ম বা ছোট আকারের চিরসবুজ গাছ। পাতা গভীরভাবে শিরাযুক্ত, কিনারা মসৃণ, অগ্রভাগ সুচালো। ফুল দেখতে দুধসাদা। প্রথম দেখাতে কারও কাছে মনে হবে কুন্দ, টগর বা জুঁই ফুল। তারার মতো দেখতে। গ্রীষ্ম-বর্ষায় ফোটে পাঁচটি পাপড়িসহ। ফুলের মধু খেতে বেশ কিছু পিঁপড়া ঘুর ঘুর করে পুষ্পমঞ্জরির ওপর। ফল লাটিমাকার। পাকলে সবুজ ফলগুলোর রঙ বদলে হয়ে যাবে নীলচে-সাদা, শেষে কালো।
জন্ডিস, মূত্রনালির প্রদাহ, মাথাব্যথা, জ্বর, বদহজম, ডায়রিয়া ও সংক্রমণের চিকিৎসায় এ গাছের বিভিন্ন অংশ ব্যবহার করা হয়। ওষুধি গুণের জন্য এর ফল কখনো কখনো রান্নার সঙ্গে ব্যবহার করা হয়। পাতাও সেদ্ধ করে খাওয়া হয়।
গাছের কাষ্ঠল শিকড় থেকে হলুদ রঙ তৈরি করা যায়। সেই রঙ দিয়ে বৌদ্ধ সন্ন্যাসী ও পুরোহিতরা প্রাচীনকালে কাপড় রঙ করে গেরুয়া বসন বানাতেন। কোনো কোনো দেশে তিন থেকে পাঁচ বছর বয়সী গাছের বাকল থেকে লাল, চকলেট ও বেগুনি রঙ তৈরি করা হয়। সেসব রঙ দিয়ে সুতি, রেশম ও পশমি বস্ত্র রাঙানো যায়।
গাছের মূল থেকে এক ধরনের রঙ তৈরি হয়। কাণ্ড ও মূলের রস চাকমা আদিবাসীরা মূত্রজনিত সমস্যায় ব্যবহার করেন। বাংলাদেশ ছাড়া ভারত, মিয়ানমার, চীন, ভুটান ও থাইল্যান্ডে গাছ সহজলভ্য হলেও বাংলাদেশে হয়তো হুমকির মুখে পড়তে চলেছে। বীজের মাধ্যমে বংশবিস্তার হয়ে থাকলেও অঙ্গজ বা কলম পদ্ধতিতেও হতে পারে।
লেখক : কৃষিবিদ ও গবেষক




