ঝাপ নামছে মমতার ৫ টাকার ভাতের হোটেলের
- ‘খেয়ে নিন’— এ কথাটাই ছিল বহু নিরন্ন মানুষের বেঁচে থাকার শেষ আলোর মতো
- রাজনীতি বদলায়। মন্ত্রী বদলায়। পতাকার রঙ বদলায়। কিন্তু খিদের রঙ বদলায় না
- সস্তার অন্ন হারিয়ে দিশাহারা ফুটপাতের নিরন্ন মানুষ

সংগৃহীত ছবি
দুপুর নামার আগেই লাইন পড়ে যেত— কারও গায়ে মলিন শার্ট, কারও হাতে ছেঁড়া থলে, কেউ আবার স্টেশন থেকে হেঁটে আসা ভবঘুরে। কলকাতার পৌরসভা চত্বর থেকে উত্তরবঙ্গের আলিপুরদুয়ার, ফালাকাটাসহ রাজ্যের নানা প্রান্তে এক থালা গরম ভাতের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকতেন হাজার হাজার মানুষ।
কারণ তারা জানতেন, সেখানে অন্তত ক্ষুধার্ত মানুষকে ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। মাত্র ৫ টাকার বিনিময়ে মিলত ভাত, ডাল, সবজি আর ডিম। আর কারও কাছে সেই ৫ টাকাটুকুও না থাকলে, তাকেও খেতে দেওয়া হতো। ‘খেয়ে নিন’— এ কথাটাই ছিল বহু নিরন্ন মানুষের বেঁচে থাকার শেষ আলোর মতো।
কিন্তু আজ সেই ‘মা ক্যানটিন’-এর বহু উনুন নিভে গেছে। রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর একের পর এক জায়গায় মা ক্যানটিন বন্ধ হওয়ার খবর সামনে এসেছে। সরকারি
সূত্রের দাবি, অন্তত ৩৯২টি মা ক্যানটিনে রান্না বন্ধ হয়ে রয়েছে। শুধু কলকাতাতেই বন্ধ হয়েছে ৫২টি ক্যানটিন। উত্তরবঙ্গের আলিপুরদুয়ার পৌরসভার দুটি মা ক্যানটিনও বন্ধের মুখে। ফালাকাটা পৌরসভার দুটি ক্যানটিন এরই মধ্যে বন্ধ হয়ে গিয়েছে। সেখানে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ গরিব মানুষ খাবার পেতেন। শিলিগুড়িতেও একই ছবি।
আলিপুরদুয়ারে প্রায় ৪৫০ মানুষ নির্ভর করতেন এই প্রকল্পের ওপর। কেউ ছিলেন রিকশাচালক, কেউ দিনমজুর, কেউ স্টেশনে রাত কাটানো বৃদ্ধ। তাদের কাছে ‘মা ক্যানটিন’ কোনো রাজনৈতিক প্রকল্প ছিল না— ওটাই ছিল দুপুরের নিশ্চিত খাবার ঘর। যেখানে রাজনীতির রঙ দেখে খাবার দেওয়া হতো না। বরং অন্নহীন মানুষকে একবেলা ভরপেট খাওয়ানোই ছিল মূল উদ্দেশ্য।
২০২১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি কভিড অতিমারীর সময় মানুষের পাশে দাঁড়াতে এই প্রকল্প চালু করেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কলকাতা পৌরসভাসহ বিভিন্ন পৌর এলাকায় পরীক্ষামূলক শুরু হয়েছিল এই উদ্যোগ। পরে তা ছড়িয়ে পড়ে পুরো রাজ্যে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, প্রতিটি থালার খাবারে ১৫ টাকা ভর্তুকি দিত রাজ্য সরকার। স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলো রান্নার দায়িত্ব সামলাত। দুপুর ১টা থেকে ৩টা পর্যন্ত চলত খাবার বিতরণ।
কলকাতার ফুটপাতবাসী বললেন, ‘এই ক্যানটিন না থাকলে না খেয়েই থাকতে হতো।’ উত্তরবঙ্গে বহু বৃদ্ধা, শ্রমিক, গৃহহীন মানুষ প্রতিদিন দুপুরে ওই লাইনে দাঁড়াতেন।’
ফালাকাটার ক্যানটিনে খাওয়া এক বৃদ্ধ শ্রমিক বললেন, ‘৫ টাকায় পেট ভরে যেত, তাই অন্তত দুপুরটা না খেয়ে কাটাতে হয়নি।’
কিন্তু এখন ছবিটা বদলে গিয়েছে। কলকাতায়ও পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। সূত্রের খবর, এসএসকেএম হাসপাতাল চত্বরের দুটি ক্যানটিন, কালীঘাট সেতুর কাছে একটি, ভবানীপুরের পূর্ণ সিনেমা হলের সামনে এবং প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোডের লর্ডস মোড়ের ক্যানটিনেও আর ধোঁয়া উঠছে না উনুনে।
যে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলো এত দিন রান্নার দায়িত্ব সামলাত, তাদের একাংশ জানিয়েছে— নতুন সরকারের তরফে অর্থ বরাদ্দ বা বিল অনুমোদন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়াতেই সমস্যা শুরু হয়েছে। প্রতিদিন প্রায় আট হাজার মানুষের জন্য রান্না করা হয় এক সংস্থার কর্তার কথায়, ‘চাল, ডাল, ডিমের নতুন সরবরাহই আসছে না।’
এই পরিস্থিতিতে কোথাও চাল নেই, কোথাও ডাল আসেনি, কোথাও আবার স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলো আশঙ্কা করছে খরচের টাকা আর ফেরত মিলবে না। তাই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে রান্না। যদিও বিজেপি সরকার দাবি করেছে, আগের সরকারের জনকল্যাণমূলক প্রকল্প বন্ধ করা হবে না।
ফালাকাটার বিজেপি বিধায়ক দীপক বর্মণও বলেছেন, ‘কোনো মূল্যেই মা ক্যানটিন বন্ধ করতে দেওয়া হবে না।’ কিন্তু বাস্তবে বহু জায়গায় এখনো ঝুলছে তালা।
রাজনীতি বদলায়। মন্ত্রী বদলায়। পতাকার রঙ বদলায়। কিন্তু খিদের রঙ বদলায় না। আর তাই আজও দুপুর হলে বহু মানুষ পুরনো অভ্যাসবশত মা ক্যানটিনের সামনে এসে দাঁড়ান।
তারপর বন্ধ দরজা দেখে ধীরে ধীরে ফিরে যান। কারও হাতে কাজ নেই, কারও পকেটে টাকা নেই, কারও বাড়িও নেই। ছিল শুধু ওই ৫ টাকার ভাত। সেই ভাতের ধোঁয়া আজ আর উঠছে না। উনুন নিভে গেছে ক্ষমতা বদলের সঙ্গে সঙ্গে। আর ছবিটা যেন মিলে যাচ্ছে রফিক আজাদের কবিতার সঙ্গে—
‘উড্ডীন পতাকাসহ খাদ্যমন্ত্রী ও মন্ত্রীর গাড়ী
আমার ক্ষুধার কাছে কিছুই ফেলনা নয় আজ
ভাত দে হারামজাদা, তা না হলে মানচিত্র খাবো।’




