আফগানিস্তানে তালেবান শাসনের পাঁচ বছর
মুক্ত আকাশ অবরুদ্ধ ডানা
- দেশ জুড়ে নিরাপত্তায় স্বস্তি, তবে মেয়েদের জন্য বন্ধ শিক্ষার দরজা, কাজের সুযোগ চেয়ে আফগানদের আকুতি

কাবুলে পথচারীকে তল্লাশি করছেন তালেবান নিরাপত্তাকর্মী -এপি
পাঁচ বছর আগে যে কাবুলের বিমানবন্দরে দেশ ছাড়ার মরিয়া ভিড়, গুলির শব্দ আর অনিশ্চয়তা ছিল প্রতিদিনের দৃশ্য— আজ সেই শহরের রাস্তায় তুলনামূলক শান্তি। বোমা হামলা ও বড় সংঘাত অনেকটাই কমেছে। কিন্তু তালেবান শাসনের পাঁচ বছরপূর্তির মুহূর্তে সাধারণ আফগানদের কণ্ঠে অন্য এক আকুতি: কাজ চাই, শিক্ষা চাই, স্বাভাবিক ভবিষ্যৎ চাই। ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট কাবুল দখল করে দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় ফিরেছিল তালেবান। সে দিনটিকেই তারা ‘বিজয় দিবস’ হিসেবে পালন করে। কাবুলের দেয়ালে এখন ইসলামি শাসন ও তালেবানের বিজয়ের স্লোগান, রাস্তায় উড়ছে সাদা পতাকা। কিন্তু উৎসবের আবহের আড়ালে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা স্পষ্ট। ৩০ বছর বয়সী কাবুলবাসী মোহাম্মদ কাসিম অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেছেন, নিরাপত্তা অবশ্যই বেড়েছে, তবে এখন সরকারের প্রধান কাজ হওয়া উচিত তরুণদের জন্য চাকরি সৃষ্টি এবং শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো। আরেক বাসিন্দা দোস্ত মোহাম্মদ খানও চিকিৎসক, প্রকৌশলী ও দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে শিক্ষার দরজা খোলা রাখার দাবি জানিয়েছেন।
তালেবান প্রশাসন নিরাপত্তাকেই পাঁচ বছরের সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে তুলে ধরেছে। তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী মাওলভি হায়াতুল্লাহ মাহাজার ফারাহির দাবি, নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা, মুদ্রার স্থিতিশীলতা, অবকাঠামো উন্নয়ন ও শিল্পাঞ্চল তৈরিতে অগ্রগতি হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, দীর্ঘ সংকোচনের পর আফগান অর্থনীতিও কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে, ২০২৪ সালে ২ দশমিক ৫ এবং ২০২৫ সালে ৪ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। কিন্তু দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, বেকারত্ব, দারিদ্র্য, খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা এবং নারীর সীমিত অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ সেই পুনরুদ্ধারকে নাজুক করে রেখেছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন নারীদের শিক্ষা ও স্বাধীনতা নিয়ে। ক্ষমতায় ফেরার আগে তালেবান বলেছিল, তাদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী ইসলামি বিধানের মধ্যে নারীরা শিক্ষা ও কাজে অংশ নিতে পারবেন। কিন্তু ২০২২ সালের মার্চ থেকে ষষ্ঠ শ্রেণির পর মেয়েদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ। একই বছরের ডিসেম্বরে নারীদের বিশ্ববিদ্যালয়েও নিষেধাজ্ঞা আসে। পার্ক, জিম ও গণস্নানাগারে প্রবেশ, খেলাধুলা এবং পুরুষ অভিভাবক ছাড়া দূরপাল্লার ভ্রমণেও রয়েছে কড়াকড়ি।
ইউনেসকোর হিসাবে, তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে ২৪ লাখ আফগান মেয়ে মাধ্যমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছে, যা এক বছর আগের তুলনায় ২ লাখ বেশি। আফগানিস্তান এখন বিশ্বের একমাত্র দেশ, যেখানে মেয়েদের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ। শুধু মেয়েরাই নয়, সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থাও সংকটে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাওয়ার বয়সী শিশুদের ৫৩ শতাংশ স্কুলের বাইরে; বহু প্রতিষ্ঠানে পানি, স্যানিটেশন ও শীত মোকাবিলার মৌলিক ব্যবস্থাও নেই।
জাতিসংঘ নারী সংস্থা পরিস্থিতিকে আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে গুরুতর নারী-অধিকার সংকটগুলোর একটি হিসেবে দেখছে। কাবুলের নারী উদ্যোক্তা ফাজিলা সোরুশ বলেছেন, ‘পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত’ স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রাখার অবস্থান থেকে তালেবান নেতৃত্বকে এখন স্পষ্ট সিদ্ধান্তে আসতে হবে। তালেবান বলেছে, শরিয়াহসম্মত পরিবেশ সৃষ্টি হলে মেয়েদের শিক্ষায় ফেরানোর পথ খোঁজা হবে; কিন্তু পাঁচ বছর পরও সে দরজা খোলেনি।
অর্থনীতির পাশাপাশি মানবিক পরিস্থিতিও কঠিন। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির হিসাবে, দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ প্রদেশে শিশু অপুষ্টি সংকটজনক পর্যায়ে। আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় শত শত স্বাস্থ্যকেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে। ২০২৩ সাল থেকে ইরান, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের প্রায় ৬০ লাখ আফগান দেশে ফিরেছেন, যা দুর্বল কর্মবাজার, আবাসন ও জনসেবার ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে।
কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতায় অবশ্য কিছুটা ফাটল ধরেছে। তালেবানের দাবি, প্রায় ৪০টি দেশের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ রয়েছে। কিন্তু সরকারটিকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছে এখন পর্যন্ত শুধু রাশিয়া, ২০২৫ সালে। ভারতসহ একাধিক দেশ তালেবানের সঙ্গে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ বাড়ালেও আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি। আন্তর্জাতিক মহলের প্রধান আপত্তি নারী-অধিকার, মৌলিক স্বাধীনতা, অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার এবং সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা নিয়ে।
তালেবান নেতৃত্বের দাবি, তারা যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্রে শৃঙ্খলা ফিরিয়েছে এবং দুর্নীতি কমিয়েছে। সমালোচকদের পাল্টা বক্তব্য, শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্র থেকে নারীদের সরিয়ে রেখে সেই স্থিতিশীলতার মূল্য আজ অত্যন্ত ভারী হয়ে উঠেছে। পাঁচ বছর পর আফগানিস্তানের ছবিটি তাই দ্বিমুখী। রাস্তায় বন্দুকের শব্দ কমেছে; কিন্তু লাখো মেয়ের শ্রেণিকক্ষ নিঃশব্দ; আকাশ তুলনামূলক মুক্ত অথচ তাদের ডানা অবরুদ্ধ। নিরাপত্তার স্বস্তির পর সাধারণ আফগানদের দাবি এখন আরও মৌলিক: কাজ, শিক্ষা এবং এমন এক ভবিষ্যৎ, যেখানে শান্তির অর্থ শুধু যুদ্ধ না থাকা নয়— বেঁচে থাকার সুযোগও থাকা।






