বড় ভূমিকম্প আসবেই, কীভাবে প্রস্তুত হবে বিশ্ব?
- ভেনেজুয়েলার ভয়াবহ বিপর্যয় আবারও সামনে আনল প্রস্তুতির ঘাটতি

সংগৃহীত ছবি
২৪ জুন ২০২৬। কয়েক মিনিটের ব্যবধানে দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে ভেনেজুয়েলায়। মুহূর্তেই ধসে পড়ে অসংখ্য ভবন। ক্ষতিগ্রস্ত হয় হাসপাতাল। হাজারো মানুষ চাপা পড়েন ধ্বংসস্তূপের নিচে। কয়েক হাজার মানুষ নিখোঁজ হন। লাখো মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটতে বাধ্য হন।
ভূমিকম্পবিদদের ভাষায়, এটি ছিল একটি বিরল ‘আর্থকোয়েক ডাবলেট’। অর্থাৎ অল্প সময়ের ব্যবধানে দুটি বড় ভূমিকম্প। ১৯০০ সালের পর এটিই ছিল ভেনেজুয়েলার সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প।
এ পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার ৯৫০ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হয়েছে। আহত হয়েছেন ১১ হাজারের বেশি মানুষ। নিখোঁজ আরও হাজারো মানুষ। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) আশঙ্কা করছে, মৃতের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
দাবানল নয়, এবার ধসে পড়েছে ভবন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অন্তত ৮৫৫টি স্থাপনা। এর মধ্যে ১৮৯টি পুরোপুরি ধসে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৩টি হাসপাতাল। জাতিসংঘের হিসাবে, এই দুর্যোগে সরাসরি আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৬৭০ কোটি ডলার। যা দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৬ শতাংশ।
কেন এত ভয়াবহ হলো বিপর্যয়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ভূমিকম্প নয়, সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল প্রস্তুতির অভাব। দেশটিতে কোনো জাতীয় ভূমিকম্প সতর্কীকরণ ব্যবস্থা ছিল না। ফলে মানুষ নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার সময়ই পায়নি। উদ্ধার সরঞ্জামেরও ছিল তীব্র সংকট। ভারী যন্ত্রপাতি না থাকায় স্বেচ্ছাসেবীরা খালি হাতেই ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে জীবিত মানুষ খুঁজেছেন।
আন্তর্জাতিক রেসকিউ কমিটি বলছে, ক্ষয়ক্ষতির তুলনায় উদ্ধার কার্যক্রম ছিল অপ্রতুল। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার ভাষায়, ‘মৃতের সংখ্যা বাড়ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে মানুষের প্রয়োজনও।’
ইস্তাম্বুলে সতর্কবার্তা
ভেনেজুয়েলার বিপর্যয় চলাকালেই তুরস্কের ইস্তাম্বুলে বসে আন্তর্জাতিক সম্মেলন। সেখানে জড়ো হন বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রী, বিজ্ঞানী এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞরা।
ইস্তাম্বুল নিজেও ভূমিকম্পের বড় ঝুঁকিতে থাকা একটি শহর। প্রায় দেড় কোটি মানুষের এই নগরীর পাশ দিয়েই গেছে উত্তর আনাতোলিয়ান ফল্ট।
২০২৫ সালের গবেষণায় দেখা গেছে, মারমারা সাগরের নিচের ফল্টলাইন থেকে ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হতে পারে। আগামী কয়েক দশকের মধ্যে এমন ভূমিকম্পের সম্ভাবনা ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ। সম্মেলনে অংশ নেন প্রায় ২০০ প্রতিনিধি। ছিলেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার চারটি অঞ্চলের আটজন স্বাস্থ্যমন্ত্রীও।
তাদের আলোচনার বিষয় ছিল একটাই, পরবর্তী বড় ভূমিকম্পের আগে কীভাবে প্রস্তুতি নেওয়া যায়। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, শুধু হাসপাতাল তৈরি করলেই হবে না। নগর পরিকল্পনা, নিরাপদ পানি, বিদ্যুৎ, সিভিল ডিফেন্স এবং আন্তঃসীমান্ত সমন্বয়ও নিশ্চিত করতে হবে। সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে বয়স্ক মানুষ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীকে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ইউরোপ অঞ্চলের পরিচালক ড. হ্যান্স হেনরি ক্লুগে জানালেন, ধ্বংসস্তূপের নিচে নয়, প্রস্তুতি নিতে হবে শান্ত সময়েই।
ইউরোপও ঝুঁকিমুক্ত নয়
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ইউরোপীয় অঞ্চলের ৫৩টি দেশের বড় অংশই ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় অবস্থিত। গ্রিস, ইতালি, রোমানিয়া ও তুরস্কে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি রয়েছে। প্রতি বছর ইউরোপে ভূমিকম্পে গড়ে প্রায় ৭০০ কোটি ইউরো অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়।
মধ্য এশিয়ার কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তান, কাজাখস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও উজবেকিস্তানের বিস্তীর্ণ এলাকাও উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। তবু সচেতনতার ঘাটতি রয়ে গেছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রায় ৩৫ শতাংশ মানুষ ভূমিকম্প ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাস করেন। অথচ মাত্র ১৩ শতাংশ মানুষ নিজেদের ঝুঁকিতে মনে করেন।
কী করতে হবে?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো ভূমিকম্প-সহনশীল ভবন নির্মাণ। নতুন হাসপাতালগুলো ভূমিকম্প সহনশীল করে গড়ে তুলতে হবে। পুরনো হাসপাতালও সংস্কার করতে হবে। বিকল্প বিদ্যুৎ, পানি ও জরুরি সরঞ্জামের ব্যবস্থা রাখতে হবে। প্রশিক্ষিত জরুরি চিকিৎসা দল প্রস্তুত রাখতে হবে। নিয়মিত চালাতে হবে মহড়া। মানুষকে সঠিক তথ্য জানাতে হবে।
জাতিসংঘ বলছে, একটি নতুন হাসপাতালে ভূমিকম্প প্রতিরোধী নকশা যুক্ত করতে মোট নির্মাণ ব্যয়ের ৪ শতাংশেরও কম অতিরিক্ত খরচ হয়। আর গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি সুরক্ষিত করতে লাগে মাত্র ১ শতাংশ ব্যয়।
তুরস্কের শিক্ষা
২০২৩ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি তুরস্ক ও সিরিয়ায় ভয়াবহ ভূমিকম্পে প্রাণ হারান ৫৩ হাজার ৬৯৭ জন। আহত হন এক লাখ সাত হাজারের বেশি মানুষ। ক্ষতিগ্রস্ত হয় অন্তত ১৫টি হাসপাতাল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূমিকম্পের সময় হাসপাতাল ধসে পড়া সবচেয়ে বড় বিপর্যয় তৈরি করে। কারণ আহতের সংখ্যা বাড়ে, কিন্তু চিকিৎসার সক্ষমতা কমে যায়।
এ ছাড়া ভূমিকম্পের পর দীর্ঘ সময় ধরে বাড়তে থাকে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা। বিষণ্নতা, উদ্বেগ ও দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের প্রয়োজনও বেড়ে যায়।
এখনই প্রস্তুতির সময়
তুরস্কের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বললেন, ‘আমরা বড় মূল্য দিয়ে শিখেছি, ভূমিকম্পের সময় স্বাস্থ্যব্যবস্থা সচল রাখতে কী প্রয়োজন। দ্রুত মোতায়েনযোগ্য দল, টিকে থাকার মতো হাসপাতাল এবং আগেভাগে পরীক্ষিত পরিকল্পনার কোনো বিকল্প নেই।’
‘পরবর্তী বড় ভূমিকম্প হবেই। তাই প্রস্তুতি নেওয়ার সময় এখনই।’—যোগ করলেন তিনি।







