যন্ত্র থেমে হাত চলছে ভেনেজুয়েলায়
- ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো প্রাণের আশা

ভেনেজুয়েলার লা গুয়াইরা প্রদেশের কারাবালেদায় ভূমিকম্পে ধসে পড়া একটি ভবনে জীবিতদের সন্ধানে তৎপরতা চালাচ্ছেন উদ্ধারকারী ও স্বজনরা। ছবি: রয়টার্স
একসময়ের ব্যস্ত উপকূলীয় শহর লা গুয়াইরা এখন ধুলো, কংক্রিট, ভাঙা লোহার রড আর অপেক্ষার অন্য নাম। ধ্বংসস্তূপের পাশে দাঁড়িয়ে কেউ খুঁজছেন সন্তানকে, কেউ মা-বাবাকে, কেউবা স্বামী-স্ত্রীকে। আর সে খোঁজে ভরসা এখন যন্ত্র নয়, মানুষের হাত। ভয়াবহ ভূমিকম্পের প্রায় এক সপ্তাহ পরও ভেনেজুয়েলার লা গুয়াইরায় বহু মানুষ খালি হাতে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে স্বজনদের খুঁজে চলেছেন। পাশে রয়েছে সরকারি খননযন্ত্র; কিন্তু তাতে জ্বালানি নেই। সিএনএন।
গত মঙ্গলবারও লা গুয়াইরার বিভিন্ন এলাকায় ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ চলেছে। এক জায়গায় কংক্রিট ও বাঁকানো লোহার রডের স্তূপের পাশে একটি সরকারি খননযন্ত্র পড়ে ছিল; কিন্তু সেটি চলছিল না। কারণ যন্ত্রে দেওয়ার মতো পেট্রল নেই। ঘটনাটি আরও বিস্ময়কর এ কারণে যে, বিশ্বের বৃহত্তম তেল মজুদের দেশগুলোর অন্যতম ভেনেজুয়েলা। অথচ এক শতাব্দীর বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ভূমিকম্পগুলোর একটির পর বহু মানুষ জ্বালানির অভাবে হাত দিয়েই ধ্বংসস্তূপ খুঁড়তে বাধ্য হয়েছেন। এ পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে সরকারের ভূমিকা নিয়ে ক্রমেই সমালোচনা বাড়ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং ডেটাস্ট্র্যাটেজিয়া সংস্থার প্রধান কারমেন বিয়াত্রিস ফার্নান্দেজ বলেছেন, মানুষ ক্ষুব্ধ। এই ট্র্যাজেডি আসলে আরেক ট্র্যাজেডির প্রতিফলন। রাষ্ট্রের ক্ষমতাকে শুধু দমন এবং প্রচারের কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে মানুষের মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর সক্ষমতাই ভেঙে পড়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো জানিয়েছেন, এ বিপর্যয় তাকে দেশে ফেরার বিষয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। তিনি বললেন, ‘আমাদের একসঙ্গে থাকতে হবে। এ সময় ভেনেজুয়েলাবাসীর পাশে থাকা প্রয়োজন।’
অন্যদিকে, সরকার তাদের ত্রাণ ও উদ্ধার তৎপরতার পক্ষে সওয়াল করেছে। প্রাথমিক বিশৃঙ্খলার কথা স্বীকার করলেও শীর্ষ আইনপ্রণেতা হোর্হে রদ্রিগেস জানিয়েছেন, নতুন একটি কর্মসূচি চালু হয়েছে, যেখানে প্রয়োজন অনুযায়ী স্বেচ্ছাসেবকদের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিয়োসদাদো কাবেলোও নাগরিকদের সরকারের ওপর আস্থা রাখার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তার বক্তব্য, নিখোঁজদের সঠিক তথ্য সংগ্রহ করে আরও নিখুঁতভাবে উদ্ধারকাজ চালানো সম্ভব হবে।
কিন্তু বাস্তব চিত্র অন্য কথা বলছে। দেশের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলগুলোর একটি লা গুয়াইরার বাতাসে এখন মৃত্যু আর ধ্বংসের গন্ধ। বহু জায়গায় দেখা যাচ্ছে, মানুষ কোদাল, গাঁইতি এবং খালি হাত দিয়ে বহুতল আবাসনের ধ্বংসস্তূপ সরানোর চেষ্টা করছেন।
ট্যাম্পা থেকে উড়ে আসা প্রকৌশলী হাসেল মেন্দোজা নিজের মা, বোন, ভগ্নিপতি এবং ভাগ্নেকে খুঁজছেন একটি নয়তলা আবাসনের ধ্বংসস্তূপে। গত দুটি রাত তিনি মাটিতেই কাটিয়েছেন। তার অভিযোগ, প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাবে উদ্ধারকাজ ভয়াবহভাবে ধীর হয়ে পড়েছে। তার দাবি, প্রতিবেশী আরাগুয়া প্রদেশ থেকে আসা সিভিল ডিফেন্স দলের কাছেও দ্রুত ধ্বংসস্তূপ সরানোর মতো যন্ত্রপাতি ছিল না।
এদিকে সরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। মঙ্গলবার জাতীয় পরিষদের সভাপতি হোর্হে রামিরেস জানিয়েছেন, অন্তত ১ হাজার ৯৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। আগের দিনের তুলনায় সংখ্যাটি প্রায় ২০০ বেশি। তবে আশঙ্কা, প্রকৃত সংখ্যা অনেক বেশি হতে পারে। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা অনুমান করেছে, মৃতের সংখ্যা ১০ হাজারেও পৌঁছতে পারে। সোমবার ভেনেজুয়েলায় জাতিসংঘের আবাসিক ও মানবিক সমন্বয়কারী জিয়ানলুকা রামপোলা জানালেন, আরও মৃত্যুর আশঙ্কায় সরকার এবং জাতিসংঘ যৌথভাবে ১০ হাজার মরদেহ সংরক্ষণের ব্যাগ সংগ্রহ করেছে।
কিন্তু এতকিছুর পরও অনেকেই আশা ছাড়তে রাজি নন। হাসেল মেন্দোজা বললেন, ‘আমার পরিবার বেঁচে আছে— এখনো সে সামান্য আশাটুকু আছে। মরদেহ না পাওয়া পর্যন্ত কেউ নিশ্চিত হতে পারে না।’
এই আশার পেছনে কারণও আছে। তিন দিনের তথাকথিত ‘সোনালি সময়সীমা’ পেরিয়ে যাওয়ার পরও ভেনেজুয়েলার বিভিন্ন জায়গায় অলৌকিক উদ্ধার কাহিনি সামনে এসেছে। নর্থ ক্যারোলাইনা থেকে সোমবার আসা রিসোর্স রেসকিউ ইন্টারন্যাশনালের মার্কিন স্বেচ্ছাসেবক জ্যাক থর্প বললেন, ‘অনেক সময় ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মানুষ বেঁচে থাকার এক বিশেষ অবস্থায় চলে যান এবং দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে সক্ষম হন। তার কথায়, আমরা জীবিতদেরও খুঁজছি, আবার মৃতদেরও। এখনো জীবিত মানুষ পাওয়া যাচ্ছে। তাই আমি এখনো হাল ছাড়তে রাজি নই।’




