গবেষণা
মানুষের ডিএনএতে লুকিয়ে দুই অজানা ‘ভূত’ মানবের ছাপ!

প্রতীকী ছবি- এআই
মানুষের শরীরের ভেতরেই যেন লুকিয়ে আছে পৃথিবীর হারিয়ে যাওয়া দুই মানবগোষ্ঠীর গল্প। তাদের কোনো পূর্ণাঙ্গ ডিএনএ নমুনা নেই, পরিচয়ও নিশ্চিত নয়। এমনকি তারা ঠিক কোথায় বাস করত, সেটিও অজানা। অথচ তাদের অস্তিত্বের ক্ষীণ ছাপ আজও বহন করে চলেছে আধুনিক মানুষ। আমাদের জিনোমের গভীরে লুকিয়ে থাকা সেই রহস্যময় উত্তরাধিকার খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
সায়েন্স সাময়িকীতে প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলির গবেষকদের নতুন এক গবেষণায় বলা হয়েছে, নিয়ানডারথাল ও ডেনিসোভানদের মতো পরিচিত প্রাচীন মানবগোষ্ঠীর পাশাপাশি অন্তত দুটি অজানা ও বিলুপ্ত মানবগোষ্ঠীর জিনগত ছাপ আধুনিক মানুষের মধ্যে রয়ে গেছে। গবেষকেরা একটি গোষ্ঠীকে বলেছেন ‘ঘোস্ট’ বা ‘ভূত’ মানবগোষ্ঠী। আর অন্যটি আরও প্রাচীন—‘সুপার-আর্কাইক’ বা অতিপ্রাচীন মানবগোষ্ঠী।
৩০ জুলাই প্রকাশিত গবেষণাটির সবচেয়ে বড় চমক প্রথম গোষ্ঠীটিকে ঘিরে। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, আধুনিক মানুষের পূর্বপুরুষেরা আফ্রিকা থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ার আগেই এই অজানা মানবগোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের জিনগত মিশ্রণ ঘটেছিল। অর্থাৎ, হাজার হাজার প্রজন্ম পেরিয়ে গেলেও সেই ‘অচেনা আত্মীয়ের’ কিছু জিন এখনো আমাদের শরীরে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
বিশ্বের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর জিনোম বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখেছেন, গড়ে ০.৫ থেকে ১.১ শতাংশ জিনগত উপাদান এই ‘ঘোস্ট’ মানবগোষ্ঠী থেকে এসেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এর ছাপ শুধু আফ্রিকার মানুষের মধ্যে নয়, আফ্রিকার বাইরের জনগোষ্ঠীর মধ্যেও পাওয়া গেছে। অর্থাৎ, এই জিনগত মিশ্রণ সম্ভবত আধুনিক মানুষের বৈশ্বিক বিস্তারের আগেই ঘটেছিল।
এই রহস্য খুঁজে বের করতে গবেষকেরা তৈরি করেছেন নতুন একটি পদ্ধতি—ট্রেস। প্রচলিত পদ্ধতিতে প্রাচীন মানুষের ডিএনএ নমুনা দরকার হলেও ট্রেসের ক্ষেত্রে তা প্রয়োজন হয় না। আধুনিক মানুষের জিনোমের বংশগতির জটিল ‘ট্রি’ বিশ্লেষণ করেই পদ্ধতিটি বহু দূরের প্রাচীন মানবগোষ্ঠীর রেখে যাওয়া অস্বাভাবিক জিনগত চিহ্ন শনাক্ত করতে পারে।
তবে এখানেই শেষ নয়। গবেষণায় আরও গভীর এক অতীতের দরজা খুলেছে ওশেনিয়ার মানুষের ডিএনএতে।
ওশেনিয়ার মানুষের ডেনিসোভান-উত্তরাধিকার বহনকারী জিনের মধ্যে গবেষকেরা এমন কিছু অংশ পেয়েছেন, যেগুলোর বংশগত ইতিহাস আরও গভীরে গিয়ে পৌঁছায়। এগুলোকে তারা ‘সুপার-আর্কাইক’ মানবগোষ্ঠীর সম্ভাব্য ছাপ হিসেবে শনাক্ত করেছেন। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, এই অজানা গোষ্ঠীটি আধুনিক মানুষের বংশধারা থেকে প্রায় ১৭ লাখ ৭০ হাজার বছর আগে আলাদা হয়ে গিয়েছিল।
এই অতিপ্রাচীন গোষ্ঠীর জিন সরাসরি আধুনিক মানুষের পূর্বপুরুষদের মধ্যে ঢুকেছিল, নাকি প্রথমে ডেনিসোভানদের মধ্যে প্রবেশ করে পরে ডেনিসোভানদের মাধ্যমে আধুনিক মানুষের শরীরে পৌঁছায়—তা এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। তবে গবেষকেরা সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে হোমো ইরেক্টাসের কথা উল্লেখ করেছেন।
অর্থাৎ, মানুষের বিবর্তনের গল্পটা হয়তো এত সরল নয় যে আমরা শুধু নিয়ানডারথাল ও ডেনিসোভানদের উত্তরসূরি। আমাদের জিনোম যেন এক বিশাল পুরোনো শহর—যেখানে পরিচিত সভ্যতার পাশাপাশি হারিয়ে যাওয়া আরও অন্তত দুই মানবগোষ্ঠীর রেখে যাওয়া চিহ্ন এখনো টিকে আছে।
আর সেই অচেনা পূর্বপুরুষদের পরিচয় খুঁজে বের করার কাজই এখন বিজ্ঞানীদের সামনে নতুন রহস্য।




