ফ্রান্সে দাঙ্গা
ক্যামেরায় দেখলেন লুট হচ্ছে দোকান, কিছুই করতে পারলেন না হাসান

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্যবসায়ী হাসান
দোকানের মেঝেতে পড়ে আছে ভাঙা কাচের টুকরা, ভাঙা মোবাইল ফোন ও পার্সেলের খালি বাক্স। প্যারিসের সাম্প্রতিক সময়ের দাঙ্গায় লুটপাটের চিত্র এটি। দোকানটি রিপাবলিক চত্বরের কাছেই। এর মালিকদের একজন হাসান, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত। কিন্তু চাইলেও এসব ধ্বংসাবশেষ সরাতে পারছেন না তিনি। দোকানটি বীমার আওতায় ছিল। তবে ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন এখনো শেষ হয়নি। ফলে বিক্ষোভ-পরবর্তী দাঙ্গার দগদগে প্রমাণ থেকে গেছে এখনো। যদিও এর মধ্যেই হাসানকে দোকানের ভাড়া, বিল ও কর্মীদের বেতন দিতে হচ্ছে।
সম্প্রতি ইউরোনিউজের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে প্যারিসে বসবাসরত বাংলাদেশি ব্যবসায়ী হাসানের বর্তমান জীবন। প্রায় ১০ বছরের হাড়ভাঙা পরিশ্রমে প্রযুক্তিপণ্য ও কুরিয়ার সেবার দোকানটি গড়ে তুলেছিলেন। ঘটনার পর তিন দিন নির্ঘুম ছিলেন এই ব্যবসায়ী। তার ভাষ্য, হামলাকারীরা তাকে শারীরিকভাবে আক্রমণ করেছে। মাথায় মদের বোতল ভাঙার হুমকিও দেয়। একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে তিনি দোকান ছেড়ে চলে যান।
তিন সন্তানের বাবা হাসান ২০১০ সালে গিয়েছিলেন ফ্রান্সে। কয়েক বছর হোটেল ও সেবা খাতে কাজ করেছেন। সব সঞ্চয় এক করে আরেকজন সঙ্গী নিয়ে ২০১৬ সালে দোকানটি চালু করেছিলেন। বিধ্বস্ত দোকানের কাউন্টারের পেছনে দাঁড়িয়ে হাসান বলছিলেন, ‘আমরা একটু একটু করে দোকানটি গড়ে তুলেছিলাম। একসময় এটাই ছিল কাজের জায়গা। এখন কিছুই নেই। ঘটনার পর থেকে আমি ঘুমাতে পারিনি।’
গত ১৭ অক্টোবর প্যারিসের যেসব এলাকায় সবচেয়ে বেশি সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে দোকানটি সেই এলাকার একটিতে। ওই দিন অনেক বিক্ষোভকারী শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল করলেও বিভিন্ন এলাকায় পরিস্থিতি সহিংস হয়ে ওঠে। দুর্বৃত্তরা ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে বড় প্রতিষ্ঠানের দোকানেও হামলা চালায়।
গত শনিবার বিকালে কর্তৃপক্ষের পরামর্শে দোকানে তালা লাগিয়েছিলেন হাসান। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পর মোবাইল ফোনে সিকিউরিটি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে তিনি বাকরুদ্ধ হয়ে যান। তার দোকানের ভেতর প্রায় ৩০ জন লোক, যাদের অনেকেই কিশোর-কিশোরী। কারও বয়স ১৫ বছর বলে মনে হয়েছে হাসানের। তিনি বলেন, ‘আমি ভাবছিলাম, এটা কীভাবে সম্ভব?’
তাৎক্ষণিক দোকানে ছুটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন হাসান। কিন্তু সহিংস পরিস্থিতির কারণে পুলিশ প্রথমে তাকে নিরাপত্তাবেষ্টিত এলাকায় ঢুকতে দেয়নি। পরে দোকান লুটের দৃশ্য দেখিয়ে ঘটনাস্থলে যান। কিন্তু সেখানে পৌঁছে তিনি বুঝতে পারেন, তার আর কিছুই করার নেই। আশপাশে কোনো পুলিশ সদস্যও ছিল না।
ইউরোনিউজ বলছে, দুর্বৃত্তরা পাশের একটি আবাসিক ভবনের মধ্য দিয়ে দোকানে ঢুকে ভাঙচুর চালায়। আশপাশের বাসিন্দারা তাদের থামাতে চেয়েছিল। কিন্তু নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা থাকায় বেশি কিছু করতে পারেননি।
হাসানের ভাষ্য, ‘একদল লুটপাট করে চলে যায়, আরেক দল এসে হাজির হয়। দোকান থেকে সবকিছু নিয়ে যায় তারা। কেউ কেউ ভাঙা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। অন্যরা তাদের হাতে পণ্য তুলে দিচ্ছিল। এমনকি নিচতলার গুদামও লুট করা হয়।’
স্থানীয় এক ডেলিভারিম্যান বলেন, ‘কয়েকটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অবস্থা আরও খারাপ। আমরা সততার সঙ্গে জীবিকা নির্বাহ করতে চাইলেও অন্যরা সবকিছু ধ্বংস করতে চায়।’
রাস্তার উল্টো দিকে ফ্রান্সের অন্যতম বড় সুপারমার্কেট চেইন ইন্টারমার্শের একটি ব্রাঞ্চ। লুটপাটের পর থেকে সেটি বন্ধ আছে। কয়েক দিন ধরে কর্মীরা দোকান পরিষ্কার করছেন, ভাঙা কাচ সরাচ্ছেন এবং তাকগুলোয় নতুন পণ্য তুলছেন।
যদিও কিছু কট্টর বামপন্থী কর্মী ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। তবে বড় সুপারমার্কেট ও প্রতিষ্ঠানে লুটপাটের বিষয়ে নিয়েছেন বিপরীত অবস্থান। তাদের কেউ কেউ এসব প্রতিষ্ঠানকে পুঁজিবাদের প্রতীক হিসেবে দেখেন। তবে ওই ডেলিভারিম্যান এমন যুক্তি মানতে নারাজ। তার কথায়, ‘এটা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। সবকিছু একইভাবে ধ্বংস হয়েছে।’
লুটপাটের পর ব্যবসায়ী হাসানকে সহায়তা করতে অনলাইনে অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছেন স্থানীয় কর্মী নোয়াম। এরই মধ্যে হাজারো মানুষ সেখানে অনুদান দিয়েছেন। নোয়াম বলেন, ‘হাসানকে আমরা চিনি। তিনি আমাদের নানা কাজে সাহায্য করেন। আমরা তার সঙ্গে কাজ করতে অভ্যস্ত। যতটা সম্ভব সাহায্য করার চেষ্টা করছি। অনেক কাজ বাকি, তবে সবাই মিলে এই পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে চাই।’
সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত দোকানগুলোর পাশে আছে ফরাসি সরকারও। চালু হয়েছে জরুরি আর্থিক সহায়তা ও পুনরুদ্ধার কর্মসূচি। গত সোমবার প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু এই কর্মসূচির কথা জানান।




