আরডের মৃত্যুতে কেমব্রিজকে চিঠি ৪০ শিক্ষাবিদের
- মৃত্যুর আগে কী জানত কেমব্রিজ, কঠিন প্রশ্ন জ্যেষ্ঠ শিক্ষাবিদদের
- তদন্তে এবার ‘কে দায়ী’ তা চিহ্নিত করার অঙ্গীকার, সংরক্ষণ করা হচ্ছে ইমেল-হোয়াটসঅ্যাপসহ নথি

কেমব্রিজের শতাব্দীপ্রাচীন প্রাচীরের ভেতর এখন মৃত্যুর কারণের চেয়েও বড় হয়ে উঠছে আরেক সেট প্রশ্ন। জেসন আরডের শেষ দিনগুলোর আগে বিশ্ববিদ্যালয় কী জানত? কী করেছিল? কোথায় সিদ্ধান্ত বদলেছিল? আর যদি কোনো গুরুতর ব্যর্থতা ঘটে থাকে, তার দায় নেবে কে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর চেয়ে সরব হয়েছেন কেমব্রিজেরই ৪০ জনের বেশি জ্যেষ্ঠ শিক্ষাবিদ। তাঁদের চাপের মধ্যেই স্বাধীন তদন্তের প্রথম ধাপের শর্তে আরও স্পষ্ট হয়েছে জবাবদিহির বিষয়টি।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক ও ফেলোদের একটি দল কেমব্রিজের চ্যান্সেলর ক্রিস স্মিথকে চিঠি দিয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, ভাইস-চ্যান্সেলর ডেবোরাহ প্রেন্টিস প্রথমে যে “পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ” পর্যালোচনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, বর্তমান দুই ধাপের কাঠামো সেই প্রত্যাশার তুলনায় সংকুচিত। কঠিন প্রশ্নগুলোর উত্তর কীভাবে পাওয়া যাবে, সেটিও যথেষ্ট স্পষ্ট নয় বলে তাঁদের দাবি।
তবে বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) পর্যন্ত প্রকাশিত বিশ্ববিদ্যালয়ের নথি দেখাচ্ছে, প্রথম ধাপের তদন্তে দায় নির্ধারণ একেবারে বাদ দেওয়া হচ্ছে না।
এই অংশের নেতৃত্বে থাকা ইংল্যান্ডের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সাবেক প্রধান ক্রাউন প্রসিকিউটর নাজির আফজালের কার্যপরিধিতে বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো সিদ্ধান্ত বা ব্যবস্থায় ভুল পাওয়া গেলে পর্যালোচনা স্পষ্ট করে বলবে “কী ভুল হয়েছিল, কখন হয়েছিল এবং কে তার জন্য দায়ী”। আফজালের ভাষায়, দায় নির্দিষ্ট না করা পর্যালোচনা প্রায়ই এমন সুপারিশ তৈরি করে, যার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত কারও ওপরই থাকে না।
প্রথম ধাপে একটি মূল প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হবে। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের হাতে যে তথ্য ছিল বা থাকা উচিত ছিল, তার ভিত্তিতে আরডেকে রক্ষায় বাস্তবসম্মত এমন কোনো পদক্ষেপ কি নেওয়া যেত, যা নেওয়া হয়নি?
এই তদন্তের সময়সীমাও বিস্তৃত। আরডের গবেষণা, যোগ্যতা বা ব্যক্তিগত জীবনবৃত্তান্ত নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম অভিযোগ, প্রশ্ন বা সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধান পাওয়ার সময় থেকে শুরু করে ১৪ আগস্ট তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত ঘটনাপ্রবাহ দেখা হবে।
আফজাল আরেকটি বিষয়ও সরাসরি অন্তর্ভুক্ত করেছেন। আরডে কৃষ্ণাঙ্গ ছিলেন, অটিস্টিক ছিলেন এবং দীর্ঘ সময় ধরে তীব্র জনসমালোচনা ও ব্যক্তিগত বিদ্রূপের মুখে ছিলেন। তাঁর মতে, বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে কীভাবে সহায়তা করেছে, তা বিচার করতে এই তিনটি বাস্তবতাকে শুধু পটভূমি হিসেবে দেখলে চলবে না।
২০২৩ সালে কেমব্রিজে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন আরডে। ৩৭ বছর বয়সে তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়টির ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যাপক হিসেবে ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়েছিল। পরে তাঁর বিরুদ্ধে লেখাচুরি এবং শিক্ষাগত ও কর্মজীবনের কিছু দাবি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন। ৫ আগস্ট কেমব্রিজ তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে তদন্তের ঘোষণা দেয়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পদত্যাগ করেন আরডে। নয় দিন পর লন্ডনের বাড়িতে তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর কারণ নির্ধারণের বিষয়টি করোনারের ইনকোয়েস্টের অধীন, বিশ্ববিদ্যালয়ের পর্যালোচনার নয়।
আরডের পরিবারের দাবি, তিন বছরের বেশি সময় তিনি ধারাবাহিক অপমান ও আক্রমণের শিকার হয়েছিলেন। জ্যেষ্ঠ শিক্ষাবিদদের চিঠিতে তাই আরও বিস্তৃত প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তাঁকে এত ব্যাপকভাবে জনসমক্ষে তুলে ধরার সিদ্ধান্ত কে নিয়েছিলেন? সম্ভাব্য ঝুঁকি কি মূল্যায়ন করা হয়েছিল? তাঁকে নিয়ে অনুসন্ধানকারী সাংবাদিকদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনি বা অন্য যোগাযোগ কে অনুমোদন করেছিলেন? বর্ণবাদী ও প্রতিবন্ধীবিদ্বেষী আক্রমণ বাড়ার সময় কর্তৃপক্ষ কী জানত? আর তাঁকে রক্ষার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত কার ছিল?
চিঠিতে বলা হয়েছে, শুধু “কী শিক্ষা নেওয়া যায়” তা খুঁজলে হবে না। সিদ্ধান্তের একটি স্পষ্ট দায়শৃঙ্খলও বের করতে হবে। “নেতৃত্বের গুরুতর ব্যর্থতা” ধরা পড়লে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা দপ্তরের জন্য তার পরিণতি থাকা উচিত বলেও মত দিয়েছেন স্বাক্ষরকারীরা। তবে ব্যক্তিগত দায়ের আড়ালে যেন প্রাতিষ্ঠানিক বা কাঠামোগত ব্যর্থতা চাপা না পড়ে, সেই সতর্কতাও রয়েছে।
তদন্তের জন্য নথি সংরক্ষণের পরিধিও বড় করা হয়েছে। কেমব্রিজের আইনি বিভাগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাগজপত্রের পাশাপাশি ইমেল, ক্যালেন্ডার, মুঠোফোনের বার্তা, হোয়াটসঅ্যাপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভয়েসমেইল এবং দলগত যোগাযোগমাধ্যমের বার্তাও সংরক্ষণ করতে বলেছে।
কেমব্রিজের তদন্ত দুই ভাগে চলছে। আফজালের প্রথম ধাপ তিন মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার কথা। দ্বিতীয় ধাপে নিয়োগ, জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের পরামর্শ ও সহায়তা, প্রাতিষ্ঠানিক তদারকি, গবেষণা-অসদাচরণের অভিযোগ মোকাবিলা এবং তীব্র জন ও সংবাদমাধ্যমের চাপের মুখে শিক্ষাবিদদের সহায়তার ব্যবস্থা পরীক্ষা করা হবে।
কিন্তু এখন পর্যন্ত দ্বিতীয় ধাপের স্বাধীন চেয়ারম্যানের নাম ঘোষণা হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশিত সর্বশেষ কাঠামোতে এখনও বলা হচ্ছে, চেয়ারম্যান ও ছয় থেকে আট সদস্যের বিশেষজ্ঞ প্যানেল নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। প্যানেল গঠনের পর ছয় মাসের মধ্যে এই অংশ শেষ করার লক্ষ্য।
এখন তাই প্রশ্ন আর শুধু একটি পর্যালোচনা হবে কি না, সেটি নয়। প্রশ্ন হলো, পর্যালোচনাটি কত দূর যেতে সাহস করবে।
কারণ কেমব্রিজের সামনে এবার আয়নাটি শুধু জেসন আরডের শেষ কয়েক সপ্তাহ ধরে নেই। সেখানে প্রতিফলিত হচ্ছে তাঁর নিয়োগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচার, অভিযোগ মোকাবিলা, সংবাদমাধ্যমের চাপ, সুরক্ষার ব্যবস্থা এবং প্রতিষ্ঠানের নিজের সিদ্ধান্ত।
বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে পরীক্ষাটি তাই কঠিন। আয়নায় তাকানো সহজ। যা দেখা যাবে, তার দায় নেওয়াটাই আসল পরীক্ষা।



