১০ ডাউনিং স্ট্রিটের স্থায়ী বাসিন্দা
প্রধানমন্ত্রী আসে প্রধানমন্ত্রী যায়, থেকে যায় ল্যারি
- ক্ষমতার অস্থির এই দরজা দিয়ে নতুন নতুন মুখ প্রবেশ করে, মন্ত্রিসভা বদলায়, রাজনৈতিক স্লোগান বদলায়; কিন্তু ডাউনিং স্ট্রিটের করিডরে ঘুরে বেড়ানো ল্যারি থেকে যায় আগের মতোই

১০ ডাউনিং স্ট্রিটের স্থায়ী বাসিন্দা ল্যারি
ব্রিটেনের রাজনীতিতে গত দেড় দশকে কম পরিবর্তন হয়নি। প্রধানমন্ত্রী বদলেছে, সরকার বদলেছে, নীতির পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু লন্ডনের ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের একটি পরিচিত মুখের কোনো পরিবর্তন হয়নি। সে হলো ব্রিটেনের সবচেয়ে আলোচিত বিড়াল ‘ল্যারি’। ল্যারি ক্যাট-- ব্রিটিশ সীমানা ছাড়িয়ে এখন গোটা বিশ্বের মুখে।
সোমবার নতুন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম ডাউনিং স্ট্রিটে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে ল্যারি স্বাগত জানিয়েছে তার সপ্তম ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীকে। কিয়ার স্টারমারের বিদায়ের পর নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের শুরু হলেও, ডাউনিং স্ট্রিটের এই ধূসর-সাদা বিড়ালটি আগের মতোই নিজের জায়গায় রয়েছে।
ল্যারিকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও শুরু হয়েছে নানা রসিকতা। তার নামে পরিচালিত অনানুষ্ঠানিক অ্যাকাউন্টে প্রায়ই ব্রিটিশ রাজনীতি নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য প্রকাশ করা হয়। নতুন প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে এমনই এক রসিকতায় বলা হয়েছে, “রাজনীতিকেরা আসেন, যান; কিন্তু ল্যারি থেকে যায়।”
২০১১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের সময়ে ডাউনিং স্ট্রিটে আসে ল্যারি। লন্ডনের একটি প্রাণী আশ্রয়কেন্দ্র থেকে তাকে নিয়ে আসা হয়েছিল মূলত ইঁদুর নিয়ন্ত্রণে সহায়তার জন্য। পরে ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘চিফ মাউজার টু দ্য ক্যাবিনেট অফিস’ বা মন্ত্রিসভা দপ্তরের প্রধান ইঁদুর ধরার বিড়ালের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
তবে সময়ের সঙ্গে ল্যারির ভূমিকা শুধু ইঁদুর ধরার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ব্রিটিশ রাজনীতির একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের নীরব সাক্ষী হয়ে উঠেছে সে। ডেভিড ক্যামেরন, থেরেসা মে, বরিস জনসন, লিজ ট্রাস, ঋষি সুনাক, কিয়ার স্টারমার এবং এখন অ্যান্ডি বার্নহ্যাম–সাত প্রধানমন্ত্রীর আমল দেখেছে এই বিড়াল।
ব্রেক্সিট গণভোটের পর যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক অস্থিরতা, থেরেসা মে সরকারের সংকট, বরিস জনসনের নেতৃত্বে করোনা মহামারি, লিজ ট্রাসের মাত্র ৪৫ দিনের প্রধানমন্ত্রিত্ব, ঋষি সুনাকের ডাউনিং স্ট্রিটে প্রবেশ এবং স্টারমারের লেবার সরকারের সূচনা–সবকিছুর সময়ই ডাউনিং স্ট্রিটে ছিল ল্যারি।
ল্যারি কোনো প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত পোষা প্রাণী নয়। সরকারি দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রাণী হিসেবে সে ডাউনিং স্ট্রিটেই থাকে। নতুন প্রধানমন্ত্রী এলেও সাধারণত ল্যারি তার জায়গা ধরে রাখে। ফলে ব্রিটিশ রাজনীতিতে সে এক ধরনের ধারাবাহিকতার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
রাজনীতির বাইরে সাধারণ মানুষের কাছেও ল্যারির জনপ্রিয়তা কম নয়। ডাউনিং স্ট্রিটের দরজা, জানালা কিংবা বাইরে সাংবাদিকদের ক্যামেরার সামনে প্রায়ই দেখা যায় তাকে। কখনো রোদ পোহাতে, কখনো নিরাপত্তাকর্মীদের পাশ দিয়ে হাঁটতে, আবার কখনো সাংবাদিকদের সামনে নিশ্চিন্তে বসে থাকতে দেখা গেছে ল্যারিকে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমে ল্যারিকে নিয়ে নানা মজার গল্পও রয়েছে। কোনো কোনো সময় নতুন প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়েও রসিকতা করা হয়েছে। যদিও বাস্তবে ল্যারি কোনো রাজনৈতিক অবস্থান নেয় না, তবু ব্রিটিশদের কাছে সে যেন ডাউনিং স্ট্রিটের অনানুষ্ঠানিক এক চরিত্র।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিনেই অ্যান্ডি বার্নহ্যাম যখন গৃহহীনদের আশ্রয়কেন্দ্র থেকে বাকিংহাম প্যালেস এবং পরে ডাউনিং স্ট্রিটে পৌঁছেছেন, তখন সেই পুরোনো ঠিকানার বাসিন্দা ল্যারি আবারও দেখেছে ক্ষমতার পালাবদল।
ব্রিটেনের রাজনীতিতে যেখানে প্রধানমন্ত্রিত্বের স্থায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে, সেখানে ল্যারির উপস্থিতি এক ভিন্ন গল্প বলে। ক্ষমতার অস্থির এই দরজা দিয়ে নতুন নতুন মুখ প্রবেশ করে, মন্ত্রিসভা বদলায়, রাজনৈতিক স্লোগান বদলায়; কিন্তু ডাউনিং স্ট্রিটের করিডরে ঘুরে বেড়ানো ল্যারি থেকে যায় আগের মতোই। প্রধানমন্ত্রীদের আগমন-বিদায়ের এই দীর্ঘ ইতিহাসে ল্যারি এখন শুধু একটি বিড়াল নয়, বরং ব্রিটিশ রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক পরিচিত প্রতীক। আর অ্যান্ডি বার্নহ্যামের আগমনে সে যোগ করল নিজের দীর্ঘ তালিকায় আরেকটি।






