অ্যান্ডি বার্নহ্যাম
ব্রেক্সিটে রাশিয়ার হস্তক্ষেপ ছিল
- ২০১৬ সালে ব্রিটেনের ইইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ভোটে রুশ-যোগ ছিল, বললেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী
- পুতিনের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা ব্যর্থ, গণভোটের ফল বদলায়নি, দাবি ব্রিটিশ মন্ত্রীর

২০১৬ সালের সেই ভোট ব্রিটেনকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাইরে নিয়ে গিয়েছিল। এক দশক পর সেই গণভোটের ওপর পড়ল মস্কোর ছায়া। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম বলেছেন, ব্রেক্সিট গণভোটে রাশিয়া হস্তক্ষেপ করেছিল। দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি বিষয়টি জানতে চেয়েছিলেন। উত্তর ছিল স্পষ্ট, ‘হ্যাঁ, হয়েছিল।’
তবে প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পরেই ব্রিটিশ সরকারের তরফে জানানো হয়েছে, রাশিয়া হস্তক্ষেপের চেষ্টা করলেও গণভোটের ফল বদলাতে পারেনি। সোমবার (১২ অক্টোবর) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য টেলিগ্রাফ’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী স্টিফেন ডাউটি দাবি করেছেন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বিভ্রান্তিমূলক প্রচারের মাধ্যমে ব্রেক্সিট গণভোটকে প্রভাবিত করার চেষ্টা সফল হয়নি।
একই দিন স্কাই নিউজকে ডাউটি বলেছেন, ব্রিটেনের নিরাপত্তা প্রতিমন্ত্রী ড্যান জার্ভিস আগেই স্পষ্ট করেছেন, রাশিয়া হস্তক্ষেপের চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সফল হয়নি। গণভোটের ফলের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ডাউটির জবাব, ‘না, ফল যা হয়েছে, তা-ই হয়েছে।’
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম এলবিসি-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও একই অবস্থান তুলে ধরেছেন তিনি। ডাউটির কথায়, ‘ফল যা হয়েছে, তা-ই হয়েছে। আমার মনে হয় না, তারা নিজেদের চেষ্টায় সফল হয়েছে। আমাদের নির্বাচনকে দুর্বল করার প্রচেষ্টাতেও তারা সফল হয়নি।’
তবে রাশিয়ার হস্তক্ষেপের চেষ্টাকে হালকা করে দেখতে নারাজ ডাউটি। তার দাবি, বিভ্রান্তিকর তথ্য ও অপপ্রচার ছড়াতে বছরে প্রায় ১৫০ কোটি পাউন্ড ব্যয় করছে মস্কো। তিনি বলেছেন, ‘এটি তথ্যযুদ্ধ। তারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থনীতি ও সমাজকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। এর মোকাবিলায় আমাদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।’
এর আগে রবিবার (১১ অক্টোবর) বিবিসিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘দ্য রেস্ট ইজ পলিটিকস’ কথোপকথন অনুষ্ঠানে ব্রেক্সিট গণভোটে রুশ হস্তক্ষেপের কথা স্বীকার করেছেন প্রধানমন্ত্রী বার্নহ্যাম।
বার্নহ্যাম জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর ‘১০ ডাউনিং স্ট্রিট’-এ দায়িত্ব নেওয়ার পর তার প্রশ্ন ছিল, ২০১৬ সালের গণভোটে রাশিয়ার হস্তক্ষেপ ছিল কি না। তার ভাষায়, ‘আমি স্পষ্ট উত্তর পেয়েছি, হ্যাঁ, ছিল।’ তবে মস্কো ঠিক কীভাবে, কতটা বা কোন মাধ্যমে হস্তক্ষেপ করেছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য বা প্রমাণ প্রকাশ করেননি তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর অভিযোগ, বিদেশ থেকে ব্রিটেনের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ব্যাহত করার চেষ্টা সম্পর্কে জনগণকে যথেষ্ট জানানো হয়নি। এ বিষয়ে সরকার দীর্ঘদিন ‘পিছিয়ে’ ছিল বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
বার্নহ্যামের বক্তব্য তাৎপর্যপূর্ণ। কোনো ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এই প্রথম প্রকাশ্যে বলেছেন, ব্রেক্সিট গণভোটে রুশ হস্তক্ষেপ হয়েছিল। তবে তার বক্তব্য থেকে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই, সেই হস্তক্ষেপই গণভোটের ফল নির্ধারণ করেছিল। এখন ডাউটির বক্তব্যেও স্পষ্ট, ব্রিটিশ সরকার হস্তক্ষেপের চেষ্টা এবং ভোটের ফল প্রভাবিত হওয়ার মধ্যে পার্থক্য টানছে।
ব্রেক্সিটপন্থী প্রচারগোষ্ঠী ‘ব্রিটেন আনবাউন্ড’ অভিযোগটি প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের ভাষায়, এটি ২০১৬ সালে ব্রিটিশ জনগণের নেওয়া সিদ্ধান্তের বৈধতা খাটো করার ‘আর একটি স্থূল চেষ্টা’। বিদেশি হস্তক্ষেপ অগ্রহণযোগ্য বলে স্বীকার করলেও সংগঠনটির বক্তব্য, রুশ তৎপরতায় গণভোটের ফল বদলেছিল বলে বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ নেই। ভোটারদের এত সহজে বিভ্রান্ত করা গিয়েছিল, এমন ধারণাও ‘অপমানজনক’।
বিতর্কটি অবশ্য নতুন নয়। ২০২০ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা কমিটি রুশ হস্তক্ষেপ নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। সেখানে ব্রেক্সিট গণভোটের ফল প্রভাবিত করার চেষ্টা কতটা সফল হয়েছিল, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়নি; বরং সম্ভাব্য হুমকি যথাযথভাবে খতিয়ে না দেখায় পরপর কয়েকটি সরকারের সমালোচনা করা হয়।
একই বছর তৎকালীন কনজারভেটিভ সরকার জানিয়েছিল, ২০১৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে রুশ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা হস্তক্ষেপের চেষ্টা করেছিলেন বলে তারা ‘প্রায় নিশ্চিত’। মস্কো অবশ্য বরাবরই অন্য দেশের নির্বাচন বা গণভোটে হস্তক্ষেপের অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে। ২০২০ সালের ব্রিটিশ প্রতিবেদনকে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ‘রুশবিদ্বেষ’ বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন।
বার্নহ্যাম জানিয়েছেন, সম্প্রতি জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসের সঙ্গে বৈঠকেও বিষয়টি উঠেছিল। তার দাবি, জার্মান রাজনীতিতে রাশিয়া থেকে ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। ফ্রান্সেও একই ঝুঁকি রয়েছে বলে সতর্ক করেছেন তিনি। বিদেশি প্রভাব সম্পর্কে ইউরোপীয় ভোটারদের আরও সচেতন ও অবহিত করা জরুরি বলেও মন্তব্য করেছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী।
১০ বছর আগে ব্রেক্সিটের ব্যালট বাক্স বন্ধ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু সেই ভোটকে ঘিরে বিদেশি প্রভাবের বিতর্ক এখনো থামেনি। প্রধানমন্ত্রীর দাবি, রাশিয়া হস্তক্ষেপ করেছিল। তারই সরকারের প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য, সেই চেষ্টা সফল হয়নি। ফলে নতুন করে সামনে এসেছে পুরনো প্রশ্ন, মস্কোর তৎপরতার প্রকৃত মাত্রা কতটা ছিল এবং তার প্রভাব সম্পর্কে ব্রিটিশ জনগণকে কতটা জানানো হয়েছে?



