পরমাণু কর্মসূচিতে ছাড় না দিলে যুদ্ধ থামবে না, ইরানকে কড়া বার্তা জেডি ভ্যান্সের

একদিকে যুদ্ধ থামানোর আলোচনা, অন্যদিকে বিমানবন্দরের রানওয়ের পাশে আছড়ে পড়ছে ক্ষেপণাস্ত্র। সাত মাস ধরে চলা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের মধ্যে শান্তির দরজা খুলতে একটি শর্ত সামনে আনল ওয়াশিংটন। কিন্তু সেই সম্ভাবনার বিপরীতেই মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে ক্রমেই ছড়িয়ে পড়ছে যুদ্ধের আগুন। ইয়েমেনের আডেন থেকে সৌদি আরবের রিয়াদ পর্যন্ত নতুন হামলায় আরও জটিল হয়ে উঠেছে পরিস্থিতি।
বুধবার (৭ অক্টোবর) দ্য ইনডিপেনডেন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানিয়েছেন, যুদ্ধ বন্ধ করতে ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে হবে। একই সময়ে ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা একাধিক বিমানবন্দর ও সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে।
সোমবার আলাস্কায় রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ভ্যান্স বলেছেন, ‘আপনারা যদি পরমাণু অস্ত্র না চান, তাহলে ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের প্রয়োজন কী? পরমাণু অস্ত্র তৈরির ইচ্ছা নেই, সেটি প্রমাণ করতে চাইলে উচ্চমাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করুন।’
তাঁর ভাষায়, এটি ‘একেবারেই মৌলিক শর্ত’। শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, ইরানের কাছ থেকে বাস্তব পদক্ষেপ চায় যুক্তরাষ্ট্র। ভ্যান্স স্পষ্ট করেছেন, কথার বিনিময়ে পদক্ষেপের দাবি থেকে সরে আসবে না ওয়াশিংটন।
গত কয়েক সপ্তাহে যুদ্ধ বন্ধ এবং বিশ্ব জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর লক্ষ্যে প্রস্তাব বিনিময় করেছে দুই দেশ। তবে তেহরানের সর্বশেষ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর সামরিক অভিযান আরও জোরদারের হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তিনি।
ভ্যান্সের দাবি, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে ওয়াশিংটনের। কিন্তু ইরানে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কার হাতে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। জবাবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, সমস্যাটি আসলে মার্কিন কর্মকর্তাদের ‘পরস্পরবিরোধী অবস্থান ও বিভ্রান্তিকর বার্তায়’।
এর মধ্যেই বুধবার ভোরে ইয়েমেনের আডেন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র ও বিস্ফোরকবাহী চালকবিহীন আকাশযান দিয়ে হামলার অভিযোগ উঠেছে হুতিদের বিরুদ্ধে। ইয়েমেনের পরিবহন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কায়রো থেকে আসা একটি উড়োজাহাজ অবতরণের কয়েক মিনিট আগে রানওয়ের কাছে ক্ষেপণাস্ত্র পড়ে। উড়োজাহাজটিকে সৌদি আরবের জেদ্দায় পাঠানো হয়।
মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য, হামলায় ‘যাত্রী ও বিমানকর্মীদের জীবন সরাসরি বিপন্ন হয়েছে’। তাদের ভাষায়, ‘আদেন বিমানবন্দর যাত্রী ও কর্মীদের নিরাপদ স্থান হওয়া উচিত, ভয় ও হুমকির ক্ষেত্র নয়।’
অন্যদিকে, রিয়াদের উত্তরে হুতিদের একটি ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসের দাবি করেছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি জানিয়েছেন, সানায় ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণস্থল শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
হুতিরা রিয়াদের কিং খালিদ এবং আভা বিমানবন্দরে হামলার দাবিও করেছে। তবে এসব দাবির সবগুলো সৌদি কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেনি। এর আগে জাজান ও নাজরানের বিমানবন্দরে হামলায় তিনজন সামান্য আহত হওয়ার তথ্য জানিয়েছিল সৌদি কর্তৃপক্ষ।
সংঘাতের প্রভাব পড়েছে বিশ্ববাজারেও। বুধবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০১ দশমিক ৫১ ডলারে পৌঁছায়। মধ্যপ্রাচ্যে সরবরাহঝুঁকির পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় অঞ্চলে সম্ভাব্য ঝড়ও মূল্যবৃদ্ধির পেছনে ভূমিকা রেখেছে।
কূটনীতির টেবিলে এখনও যুদ্ধ থামানোর সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা, ইয়েমেনে নতুন সংঘর্ষ আর সৌদি আকাশে ক্ষেপণাস্ত্রের উপস্থিতি মনে করিয়ে দিচ্ছে অন্য বাস্তবতা। শান্তির শর্ত ঘোষণা করা যত সহজ, যুদ্ধের বিস্তার থামানো তত সহজ নয়। মধ্যপ্রাচ্য এখন সেই কঠিন পরীক্ষার সামনে।



