মহাকাশে হুমকি ঠেকাতে ব্রিটেনের নতুন প্রহরী 'টাইটানিয়া'
- ৩০০ কোটি পাউন্ডের মহাকাশ প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা, উপগ্রহের নিরাপত্তায় তিন দেশে নজরদারি

পৃথিবীর বুকে যুদ্ধের প্রস্তুতি। আর তার নতুন প্রহরা মহাকাশে। মাথার ওপর নিঃশব্দে ঘুরছে হাজারো উপগ্রহ। গুরুত্বপূর্ণ কোনো উপগ্রহের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলেই বিপাকে পড়তে পারে যোগাযোগ, নৌচলাচল, এমনকি ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কব্যবস্থা। এমন অনিশ্চয়তার মধ্যেই মহাকাশে নতুন সামরিক উপগ্রহ পাঠিয়েছে ব্রিটেন। নাম ‘টাইটানিয়া’। কক্ষপথে এবার দেশটির ‘নতুন একজোড়া চোখ’।
শনিবার (০৭ নভেম্বর) ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত ঘোষণায় বলা হয়েছে, দেশেই তৈরি টাইটানিয়া গত অক্টোবরে উৎক্ষেপণ করা হয়। এখন এটি পৃথিবীর কক্ষপথে রয়েছে। মহাকাশ থেকে ভূপৃষ্ঠের সামরিক তৎপরতা পর্যবেক্ষণ এবং বাহিনীগুলোর সমন্বয়ে সহায়তা করাই এর উদ্দেশ্য।
ওজন প্রায় ১০০ কিলোগ্রাম, আকারে কাপড় ধোয়ার যন্ত্রের কাছাকাছি। ঘণ্টায় ২৭ হাজার কিলোমিটার বেগে ছুটে উপগ্রহটি মাত্র ৯০ মিনিটে পৃথিবী একবার প্রদক্ষিণ করে। ক্যালিফোর্নিয়া থেকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেটে এটি উৎক্ষেপণ করা হয়েছে।
ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর মহাকাশ কমান্ড ‘ইস্তারি’ কর্মসূচির আওতায় টাইটানিয়া পরিচালনা করবে। ২০২৪ সালের আগস্টে উৎক্ষেপিত ‘টাইকি’র পর এটি তাদের দ্বিতীয় উপগ্রহ। ভবিষ্যতে যুক্ত হবে ‘জুনো’ ও ‘ওবেরন’। লক্ষ্য, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও নজরদারিতে বিদেশি ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমানো।
টাইটানিয়া নির্মাণে হ্যাম্পশায়ারে প্রতিরক্ষা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি পরীক্ষাগারের সঙ্গে কাজ করেছে বিএই সিস্টেমস। চুক্তির মূল্য ৯৫ লাখ পাউন্ড। তবে আলোচিত ৩০০ কোটি পাউন্ড শুধু এই উপগ্রহের ব্যয় নয়। আগামী চার বছরে বৃহত্তর মহাকাশ প্রতিরক্ষায় বিনিয়োগের পরিকল্পনা এটি।
পাশাপাশি শুরু হচ্ছে ‘ইনারোস’ প্রকল্পের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম। যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও সাইপ্রাসে ব্রিটিশ স্থাপনায় বসবে তিনটি ভূমিভিত্তিক সংবেদক। আলোর পরিবর্তন শনাক্ত করে উপগ্রহের কাছে অস্বাভাবিক চলাচল বা সম্ভাব্য হুমকির আগাম সতর্কবার্তা দেওয়াই পরিকল্পনা। প্রযুক্তিটি এখনো পরীক্ষাধীন।
ইনারোসের তথ্য ব্যবহার করবে মহাকাশ অভিযানের দায়িত্বে থাকা বিশেষ সামরিক দলগুলো। গুরুত্বপূর্ণ উপগ্রহগুলোর ওপর নজর থাকবে। এসব উপগ্রহের ওপর নির্ভর করে জাহাজের দিকনির্দেশনা, মুঠোফোন সেবা এবং ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সতর্কতা।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং বলেছেন, ‘নতুন মহাকাশযুগ এসে গেছে।’ তাঁর মতে, আবহাওয়ার পূর্বাভাস থেকে আর্থিক লেনদেন ও মুঠোফোনের যোগাযোগ, সবকিছুর সঙ্গেই মহাকাশের যোগ। নতুন ব্যবস্থা ‘হুমকি আরও আগে শনাক্ত’ করতে সাহায্য করবে।
বিমানবাহিনীর প্রধান স্যার হার্ভ স্মিথ বলেছেন, মহাকাশ থেকে পৃথিবী পর্যবেক্ষণ ‘জাতীয় স্থিতিশীলতা ও সামরিক সুবিধার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’। নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা আন্দ্রেয়া থম্পসন একে দেশীয় মহাকাশ সক্ষমতার অগ্রগতি বলেছেন। সংশ্লিষ্ট গবেষণাগারের প্রধান পল হলিনশেডের মতে, এটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় বিনিয়োগের ফল।
ইউক্রেন যুদ্ধ দেখিয়েছে, আধুনিক সংঘাতে মহাকাশের গুরুত্ব কতটা। গত সেপ্টেম্বরে ব্রিটিশ বিমানবাহিনীর প্রধানও মহাকাশে প্রতিপক্ষের বাড়তে থাকা তৎপরতা নিয়ে সতর্ক করেছিলেন। তাই আকাশের ওপরে নজরদারি বাড়াচ্ছে লন্ডন। কিন্তু সুরক্ষার জন্য যে উপগ্রহের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে, সেই উপগ্রহই যদি হামলার লক্ষ্য হয়, তবে পৃথিবীর নিরাপত্তার শেষ প্রহরী কে?



