এআইয়ের চাবি আমেরিকা-চীনের হাতে, ইউরোপকে সতর্ক করল কেন্দ্রীয় ব্যাংক
- বিশ্বের এআই কম্পিউটিং সক্ষমতার মাত্র ৫ শতাংশ ইউরোপে
- বিদেশি প্রযুক্তিনির্ভরতা বাণিজ্য আলোচনায়ও হয়ে উঠতে পারে চাপের অস্ত্র

বিশ্বের প্রায় ৭৫ শতাংশ এআই কম্পিউটিং সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রে, ইউরোপে মাত্র ৫ শতাংশ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দরজা যদি একদিন ওয়াশিংটন বা বেইজিং বন্ধ করে দেয়, ইউরোপ তখন কী করবে? সীমান্তে পণ্য পরীক্ষা থেকে হাসপাতালের রোগী পর্যবেক্ষণ, ব্যাংকের অর্থ পরিশোধ থেকে রেল চলাচল... সবখানেই এআই ঢুকে পড়ার মুখে। ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ক্রিস্টিন লাগার্দ তাই সতর্ক করেছেন, নিজস্ব এআই সক্ষমতা না গড়লে ইউরোপ এমন নির্ভরতার ফাঁদে পড়তে পারে, যা ভবিষ্যৎ বাণিজ্য আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র বা চীনকে অভূতপূর্ব প্রভাব দেবে।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) ভিয়েনায় ‘হফবুর্গ ইম ডায়ালগ–ইকোনমি, ইউরোপ, রেজিলিয়েন্স’ অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে লাগার্দ বলেছেন, ইউরোপকে এআই দ্রুত গ্রহণ করতে হবে, কিন্তু শুধু বিদেশ থেকে প্রযুক্তি কিনে চললে হবে না; এর একটি অংশ ইউরোপেই তৈরি করতে হবে। একই দিন দ্য গার্ডিয়ান ও রয়টার্স তাঁর বক্তব্যের বিস্তারিত প্রকাশ করে।
সংখ্যাগুলো ইউরোপের পিছিয়ে থাকার ছবিটা স্পষ্ট করেছে। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র ৫৯টি উল্লেখযোগ্য এআই মডেল তৈরি করেছে, চীন ৩৫টি; ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য করেছে একটি করে। বিশ্বের প্রায় ৭৫ শতাংশ এআই কম্পিউটিং সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রে, ইউরোপে মাত্র ৫ শতাংশ। এদিকে ইউরো অঞ্চলের পরিবারগুলোর প্রায় ৪৪০ বিলিয়ন ইউরো বিনিয়োগ রয়েছে মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিতে।
লাগার্দের মতে, এআই কয়েক বছরের মধ্যেই সীমান্তে পণ্য স্ক্রিনিং, কর রিটার্ন বাছাই, ট্রেন নিয়ন্ত্রণ, হাসপাতালের রোগী নজরদারি এবং ব্যাংক পেমেন্টে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। তখন প্রযুক্তির প্রবেশাধিকার প্রত্যাহার বা শর্ত বদলে দেওয়া হলে তার প্রভাব একসঙ্গে প্রায় সব খাতে পড়বে। তাঁর ভাষায়, এটি এমন “প্রভাব, যা আগে কোনও বাণিজ্য অংশীদারের হাতে ছিল না”।
তবে তার বক্তব্য শুধু সতর্কবার্তা নয়, সুযোগের কথাও বলেছে। ইউরো অঞ্চলের প্রতিষ্ঠানগুলো ২০২৬ সালে মোট বিনিয়োগের প্রায় ১০ শতাংশ এআইয়ে ব্যয় করবে। কর্মক্ষেত্রে এআই ব্যবহারকারী কর্মীর হার দুই বছরে দ্বিগুণ হয়ে ৫০ শতাংশ ছাড়িয়েছে। ইসিবির হিসাব, দ্রুত এআই গ্রহণ করলে এক দশকে উৎপাদনশীলতা সর্বোচ্চ প্রায় ৪ শতাংশ বাড়তে পারে।
সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ডেটা সেন্টার। বর্তমান প্রবণতা চললে আগামী দশকে ইউরোপের প্রয়োজন ও বিদ্যমান ডেটা সেন্টার সক্ষমতার ব্যবধান ছয় গুণের বেশি বাড়তে পারে। এই ঘাটতি পূরণে চিপসহ প্রায় ৬০০ বিলিয়ন ইউরো লাগতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিকল্পিত ‘এআই গিগাফ্যাক্টরি’ শুরু হলেও লাগার্দের মতে, তা প্রয়োজনের কেবল সামান্য অংশ পূরণ করবে।
তিনি ইউরোপীয় অবকাঠামোয় চলতে পারে এমন নিজস্ব মডেল তৈরির ওপর জোর দিয়েছেন। ফ্রান্সের মিস্ত্রালকে সম্ভাবনার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে তিনি বলেছেন, চীনের ডিপসিক বা কিমির মতো ওপেন-ওয়েট মডেল এখন কার্যকর হলেও ভবিষ্যতে সেগুলোর লাইসেন্স বা উন্মুক্ততা বদলে যেতে পারে। তাই নির্ভরতা বদলে শুধু এক বিদেশি উৎস থেকে আরেকটিতে যাওয়া সমাধান নয়।
লাগার্দ আরও মনে করিয়ে দেন, এআই সরবরাহ শৃঙ্খলে কোনও দেশই এককভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। বিরল খনিজে চীন, চিপে তাইওয়ান, লিথোগ্রাফিতে ইউরোপ এবং উন্নত মডেলে যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপের শক্তি হিসেবে তিনি নেদারল্যান্ডসের এএসএমএলকে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, প্রযুক্তির এই কৌশলগত সংযোগগুলো ধরে রাখতে উদ্ভাবন ও পুঁজিবাজার দুটোকেই আরও দ্রুত এবং শক্তিশালী করতে হবে ইউরোপে এখনই।
লাগার্দের বার্তা তাই সরল, এআইয়ের দৌড়ে ইউরোপ পিছিয়ে থাকলে শুধু প্রযুক্তিগত সুযোগ হারাবে না, নিজের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতাও দুর্বল হতে পারে। নতুন যুগে ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব রক্ষার লড়াই তাই ডেটা, মডেল ও ডেটা সেন্টার–তিন ক্ষেত্রেই একসঙ্গে শুরু করতে হবে।



