ব্রিটিশ হওয়ার দাম আকাশছোঁয়া
- জি-৭ দেশগুলোকেও পেছনে ফেলল যুক্তরাজ্য
- নাগরিক হতে খরচ ১,৮৩৯ পাউন্ড
- সমালোচকদের দাবি, দীর্ঘদিনের বাসিন্দাদের জন্য তৈরি হচ্ছে আর্থিক বাধা

বিশ্বের ধনী দেশগুলোর জোট জি-৭-এর মধ্যে নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য সবচেয়ে বেশি অর্থ দিতে হচ্ছে যুক্তরাজ্যে।
ব্রিটিশ নাগরিক হওয়ার স্বপ্নের সামনে এবার বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াল খরচ। বিশ্বের ধনী দেশগুলোর জোট জি-৭-এর মধ্যে নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য সবচেয়ে বেশি অর্থ দিতে হচ্ছে যুক্তরাজ্যে। শুধু যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় নয়, অন্য সব জি-৭ দেশের চেয়েও ব্রিটেনের নাগরিকত্ব ফি কয়েক গুণ বেশি।
বৃহস্পতিবার ফিন্যান্সিয়াল টাইমস-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্রিটিশ নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে মোট খরচ পড়ে ১,৮৩৯ পাউন্ড। এর মধ্যে প্রাকৃতিকীকরণ বা ন্যাচারালাইজেশনের ফি ১,৭০৯ পাউন্ড এবং নাগরিকত্ব অনুষ্ঠানের জন্য দিতে হয় আরও ১৩০ পাউন্ড। অথচ যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, একটি আবেদন প্রক্রিয়াকরণের প্রকৃত খরচ মাত্র প্রায় ৩২৪ পাউন্ড।
তুলনায় জি-৭-এর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ফি যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে নাগরিকত্বের জন্য খরচ প্রায় ৫৬২ পাউন্ড সমপরিমাণ। অর্থাৎ ব্রিটেনে নাগরিকত্ব নিতে একজন আবেদনকারীকে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও প্রায় তিন গুণ বেশি অর্থ দিতে হচ্ছে।
অভিবাসন নীতি নিয়ে কাজ করা গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর পাবলিক পলিসি রিসার্চ (আইপিপিআর) সতর্ক করেছে, এই উচ্চ ফি দীর্ঘদিন ধরে ব্রিটেনে বসবাস করা বহু মানুষের জন্য নাগরিকত্বের পথে বড় বাধা তৈরি করছে। তাদের মতে, খরচ ও জটিল প্রক্রিয়া “অন্তর্ভুক্তির পথে মৌলিক বাধা” হয়ে উঠছে।
বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের দেশের নাগরিক, অভিবাসী পরিবার এবং ব্রিটেনে জন্ম নেওয়া এমন অনেক শিশুর পরিবার যাদের বাবা-মায়ের স্থায়ী বসবাসের অনুমতি থাকলেও নাগরিকত্ব নেই, তাঁদের ওপর এই আর্থিক চাপ বেশি পড়ছে বলে জানিয়েছে আইপিপিআর।
তবে নাগরিকত্বের আবেদন কমেনি। বরং চলতি বছরের জুন পর্যন্ত এক বছরে ব্রিটিশ নাগরিকত্বের আবেদন সংখ্যা রেকর্ড ৩ লাখ ১৫ হাজারে পৌঁছেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে অভিবাসন বৃদ্ধির পাশাপাশি ভবিষ্যতে নাগরিক অধিকার সীমিত হওয়ার আশঙ্কাও কাজ করছে।
আইপিপিআর আরও বলেছে, নাগরিকত্বের সুযোগ কঠিন হয়ে গেলে ব্রিটেনে এমন একটি শ্রেণি তৈরি হতে পারে, যারা দীর্ঘদিন দেশটিতে থেকেও পূর্ণ রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকবে। তাদের মতে, নাগরিকত্ব শুধু একটি পাসপোর্ট নয়; এটি একটি দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে অংশগ্রহণের সুযোগ।
সংস্থাটি নাগরিকত্ব প্রক্রিয়া সহজ করা, স্থায়ী বসবাসের (ইনডেফিনিট লিভ টু রিমেইন) অপেক্ষার সময় কমানো এবং “লাইফ ইন দ্য ইউকে” পরীক্ষাকে আরও বাস্তবভিত্তিক করার সুপারিশ করেছে। তাদের দাবি, নাগরিকত্বের পথ হওয়া উচিত এমন, যেখানে দীর্ঘদিনের বাসিন্দারা সমাজের অংশ হতে পারেন, শুধু আর্থিক সক্ষমতার পরীক্ষায় আটকে না যান।
অভিবাসী সম্প্রদায়ের কাছে এই বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ব্রিটেনে স্থায়ীভাবে বসবাসকারী বহু বাংলাদেশি, ভারতীয়, পাকিস্তানি ও অন্যান্য দেশের নাগরিকের জন্য নাগরিকত্ব শুধু আইনি পরিচয় নয়–এটি ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা, ভোটাধিকার এবং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার সঙ্গেও যুক্ত।
ব্রিটিশ সরকারের যুক্তি, নাগরিকত্ব আবেদন প্রক্রিয়ার খরচের একটি অংশ আবেদনকারীদের কাছ থেকেই নেওয়া হয়। কিন্তু সমালোচকদের প্রশ্ন, প্রকৃত প্রশাসনিক খরচের তুলনায় এত বেশি ফি রাখা কি নাগরিকত্বকে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে ঠেলে দিচ্ছে না?
জি-৭-এর অন্যতম ধনী দেশ হয়েও নাগরিকত্বের ক্ষেত্রে ব্রিটেনের এই উচ্চ মূল্য এখন নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে, নাগরিকত্ব কি একটি অধিকার নাকি ক্রমে ব্যয়বহুল পরিষেবায় পরিণত হচ্ছে?



