ব্রিটেনে রাজনৈতিক আশ্রয়: আগে সবাই ছিল বিএনপি-জামায়াত, এখন আ.লীগ!

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
স্বদেশ কিংবা বিদেশ; অদ্ভুত এক নাটকীয় মিল রয়েছে বাঙালির! দেশের মাটিতে ক্ষমতার মসনদ বদলাতেই পাল্টে যায় বিদেশ-বিভুঁইয়ে রাজনৈতিক আশ্রয়ের সেই চেনা সমীকরণটিও। পটপরিবর্তন। রঙ্গমঞ্চে নতুন দৃশ্য। যে টেমস নদীর তীরে বসে একদিন নির্বাসনের প্রহর গুনতেন বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীরা, সময়ের আবর্তে আজ সেখানেই আশ্রয় খুঁজছেন আওয়ামী লীগের শীর্ষ থেকে তৃণমূলের বহু কর্মী। রাজনীতির ভাগ্যাকাশে যে মেঘ গতকাল একজনকে তাড়িয়েছে, আজ তা অন্যজনকে। যে হাত সেদিন ক্ষমতার রাজদণ্ড ধরেছিল, আজ সেই হাতই অসহায়। ভোল পাল্টে দূর পরবাসে মাঙছে আশ্রয়ের আকুতি— রাজনীতির এক চিরন্তন ট্র্যাজেডি! আগে বিএনপি-জামায়াত; সেই তারাই এখন ঘোর আওয়ামী লীগ! দলের নিপীড়িত নায়ক!
২০০৮-২৪ সাল। টানা ১৬ বছর। ব্রিটেনে অ্যাসাইলাম সিকারদের (আশ্রয় প্রার্থী) কাছে জনপ্রিয় ছিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। অথবা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দলের কর্মী। লন্ডনের ‘সোনার হরিণ’ বগলদাবা করতেই (স্থায়ী হওয়া) অনেক ছাত্রলীগ-আওয়ামী লীগ কর্মীও সে স্রোতে বৈধ ভিসায় এসে অ্যাসাইলাম (রিফিউজি স্ট্যাটাস) নিয়েছেন বিএনপি বা জামায়াত কর্মীর মুখোশে। এমন অভিযোগও ঢের। ব্রিটেনের বাঙালি কমিউনিটির অলিগলিতে আজও মুড়ি-মুড়কির মতো ফুটছে সেসব গুঞ্জন। ক্ষমতার গাড়ির চাকা ঘুরতেই ঘুরেফিরে সেই একই পুনরাবৃত্তি সমকালেও।
সেই একই ধারা। চেনা তরিকা। দেশের মাটিতে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ানো বিএনপি-জামায়াত ঘরানার সেই নেতাকর্মীরাই এখন নির্যাতিত আওয়ামী লীগ। কাগজপত্র জোগাড় করে অ্যাসাইলামও নিয়েছেন ছাত্রলীগ বা আওয়ামী লীগের ব্যানারে। ২০২৪ সালের আগস্টের পটপরিবর্তনের পর থেকেই টেমস তীরে আছড়ে পড়ছে এই নতুন বাঁকবদলের ঢেউ। নতুন মোড়কে পুরনো সওদা।
স্থানীয় আইনজীবীদের বক্তব্য, ২০২৪ সালের আগস্টের পর যারা ব্রিটেনে এসেছেন তারা তো বটেই, ২০২২-২৩ সালে যারা স্টুডেন্ট বা ওয়ার্ক পারমিটে ব্রিটেনে ঘাঁটি গেড়েছেন, তারাও এখন ছাত্রলীগ। অ্যাসাইলাম চাচ্ছেন আওয়ামী লীগের ব্যানারে।
কথা হয় লন্ডনের টেম্পল সলিসিটরের ল (আইনি ফার্ম) ইমিগ্রেশন বিশেষজ্ঞ মো. মিজানুর রহমানের সঙ্গে। আগামীর সময়কে তিনি জানিয়েছেন, স্টুডেন্ট ভিসা, ওয়ার্ক পারমিটে এসে বিভিন্ন পরিস্থিতির কারণে অথবা ভিজিটে এসে অনেকেই ব্রিটেনে থেকে যাওয়ার পরিকল্পনা থেকে অ্যাসাইলাম ফাইল করেন। এমন অনেক ক্লায়েন্ট আমরা পাই, যারা কখনোই রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না অথচ এখন রিফিউজি স্ট্যাটাস দাবি করছেন আওয়ামী ব্যানারে। দেশে জামায়াত বা বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন; কিন্তু এখন রাজনৈতিক পরিচয় পাল্টে আওয়ামী লীগ বা নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ব্যানারে অ্যাসাইলাম নিচ্ছেন— এমন ক্লায়েন্টও অহরহ।
অভিজ্ঞ এ আইনজীবী আরও জানিয়েছেন, ১৯৫১ সালের রিফিউজি কনভেনশন অনুযায়ী ৫ গ্রাউন্ডে অ্যাসাইলাম দেয় ব্রিটেন। জাতিগত পরিচয় বা বর্ণ, ধর্ম, জাতীয়তা, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও নির্দিষ্ট সামাজিক গোষ্ঠীর সদস্য হওয়া। বাংলাদেশিদের মধ্যে সবচেয়ে পপুলার হচ্ছে লিঙ্গ পরিবর্তন ও রাজনৈতিক আশ্রয়!
কথা হয় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অ্যাসাইলাম সিকারের সঙ্গেও। আগামীর সময়কে তিনি বলেছেন, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর সেশনে লন্ডনের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্টুডেন্ট ভিসায় আসেন। ২০২৪ সালের শেষের দিকে আর্থিক সমস্যার কারণে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। একজন আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনিই তাকে ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে অ্যাসাইলাম নেওয়ার পরামর্শ দেন। এ প্রতিবেদককে অকপটেই তিনি জানিয়েছেন, বাংলাদেশে বিএনপি আদর্শের রাজনীতি করতেন। এখন ওই সময়ের মিছিলের কিছু ছবি ছাত্রলীগের বলে প্রমাণাদি তৈরি করছেন।
মুরাদ নামে আরেকজন অ্যাসাইলাম সিকার জানিয়েছেন, বাংলাদেশ থেকে কাগজপত্র তৈরি করা, এখানে নিয়মিত ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া, বর্তমান সরকারবিরোধী নানা সমালোচনা করা— সবই করছেন তার আইনজীবীর পরামর্শে।
তবে কপালপোড়াদের সংখ্যাও একেবারে কম নয়। হঠাৎ সরকার পরিবর্তনে মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে উন্নত জীবনের আশায় আসা অনেক আশ্রয় প্রার্থীরও। আগামীর সময়ের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে সে তথ্যও। দল ক্ষমতায় আসায় বিপদে পড়ে গেছেন আওয়ামী আমলে ব্রিটেনে অ্যাসাইলাম চাওয়া অনেক বিএনপির নেতাকর্মী। পরিস্থিতি অনুকূলে ফেরায় তাদের ফাইল এখন রিফিউজ করছে ব্রিটেন। লন্ডনের এক আইন ফার্মে দেখা হওয়া রায়হান কবির তাদের একজন। কথায় কথায় তিনি জানিয়েছেন, অরিজিনালি আমি ছাত্রলীগের কর্মী ছিলাম! ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে আইনজীবীর পরামর্শে আমি বিএনপির সক্রিয় সদস্য হিসেবে অ্যাসাইলাম আবেদন করেছিলাম। আমার ফাইনাল ইন্টারভিউ হয় কিছুদিন আগে। কিন্তু হোম অফিস আমাকে রিফিউজ করেছে। কারণ, বিএনপি এখন বাংলাদেশ সরকারে! ক্লায়েন্টকে অ্যাসাইলাম পাইয়ে দেওয়ার এই অতি উৎসাহ সম্পর্কে সলিসিটর মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, কোনো আইনজীবী কাউকেই পরামর্শ দিয়ে তার পলিটিক্যাল বা জেন্ডার আইডেন্টিটি পরিবর্তন করতে পারেন না, এটি আইন পেশার শর্তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক!
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় বাংলাদেশকে ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় নেওয়া হলেও ২০২৫ সালের শুরুতে ‘কান্ট্রি গাইডলাইন’-এ বাংলাদেশকে নিরাপদ দেশ হিসেবে তালিকাভুক্ত করে ব্রিটেন। তার পর থেকেই দেশটিতে অ্যাসাইলাম পাওয়ার হার কমেছে বাংলাদেশিদের। ব্রিটিশ মাইগ্রেশন অভজারভেটরির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জুলাই ২০২৪-জুলাই ২০২৫ পর্যন্ত মোট ১ লাখ ১ হাজার মানুষ ব্রিটেনে অ্যাসাইলাম চেয়েছে। এর মধ্যে পাকিস্তান ও ভারতের পরই বাংলাদেশের অবস্থান।



